
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ভোর চারটার নিস্তব্ধতা। উপকূলবর্তী এলাকার শিক্ষক রফিক রেডিওর বার্তার দিকে মনোযোগ দিয়ে আছেন। একটি ঘূর্ণিঝড় ধেয়ে আসছে, অথচ এর সুনির্দিষ্ট আঘাত হানার স্থান এবং তীব্রতা সম্পর্কে জানার উপায় কী? এই সংকটময় মুহূর্তে প্রতিটি ক্ষণ বিলম্ব হওয়া মানেই অগণিত মানুষের জীবন চরম ঝুঁকির মুখে পড়া।
এই জটিল পরিস্থিতিতেই প্রথাগত ব্যবস্থার পরিপূরক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক আবহাওয়া মডেল। ২০২৬ সালের আগস্ট মাসে গুগল ডিপমাইন্ড ঘোষণা দেয় যে, তাদের উদ্ভাবিত ‘ওয়েদারনেক্সট’ মডেলটি ক্রান্তীয় ঝড়ের গতিপথ, শক্তিমত্তা এবং বায়ুপ্রবাহের কাঠামো নির্ধারণের ক্ষেত্রে অত্যন্ত নিখুঁত ফলাফল প্রদানে সক্ষম হয়েছে।
প্রায় পাঁচ হাজার প্রাচীন ও ঐতিহাসিক ঝড়ের সংরক্ষিত উপাত্ত বিশ্লেষণ করে এই বিশেষ মডেলটি প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। কোনো একটি নির্দিষ্ট বা একক ফলাফলের ওপর নির্ভর না করে এটি সম্ভাব্য পরিস্থিতির একটি গুচ্ছ বা ইনসেম্বল তৈরি করে, যার মাধ্যমে ঝড়ের গতির অনিশ্চয়তা পরিষ্কারভাবে অনুধাবন করা যায় এবং আবহাওয়াবিদেরা এসব তথ্য সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করেন।
গুগল কর্তৃপক্ষ নিজেই স্পষ্ট করে জানিয়েছে যে, যেকোনো সরকারি পূর্বাভাস এবং দুর্যোগের সতর্কবার্তার ক্ষেত্রে স্থানীয় আবহাওয়া অফিসের ওপরই প্রধান ভরসা রাখতে হবে। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগরের উপকূলবর্তী দেশের নাগরিকদের জন্য এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতি অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক এক বার্তা বয়ে এনেছে।
তবে এই আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের ক্ষেত্রেও কিছু নির্দিষ্ট ঝুঁকি এবং সীমাবদ্ধতা রয়ে গেছে। যেহেতু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মূলত অতীত ঘটনার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে শেখে, তাই কোনো বিরল বা সম্পূর্ণ অপরিচিত প্রকৃতির ঝড়ের ক্ষেত্রে এটি সঠিক পূর্বাভাস প্রদানে ব্যর্থ বা দুর্বল হতে পারে।
অন্যদিকে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার করে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে ভুয়া পূর্বাভাস বা তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টির সম্ভাবনাকেও পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। এই বাস্তবতায় কিছু মৌলিক সতর্কতা মেনে চলা আবশ্যক, যার মধ্যে প্রথমত সরকারি আবহাওয়া অধিদপ্তর ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা দপ্তরের দেওয়া সতর্কসংকেতগুলোই চূড়ান্ত হিসেবে গ্রহণ করতে হবে এবং তা যথাসময়ে যথাযথভাবে পালন করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, যেকোনো অপরিচিত বা সন্দেহজনক সূত্র থেকে আসা ভাইরাল ঝড়ের ছবি যাচাই না করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো থেকে বিরত থাকতে হবে। সবার আগে তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার অন্ধ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত না হয়ে, বরং তথ্য সত্য কি না তা যাচাই করার পর তবেই শেয়ার করার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। দিনশেষে যন্ত্র বনাম আবহাওয়াবিদের কোনো দ্বন্দ্ব নয়, বরং দুর্যোগ মোকাবিলায় উভয়ের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।