
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বেতন বাড়ানোর আন্দোলন ঘিরে মঙ্গলবার সকালে গাজীপুরের নাওজোড় ও ভোগড়া অঞ্চলে শ্রমিকদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দফায় দফায় পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রাতঃকাল থেকে মধ্যাহ্ন পর্যন্ত চলমান এই সংঘর্ষে উভয় পক্ষের অন্তত ত্রিশজন ব্যক্তি আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। এই ব্যাপক শ্রমিক বিক্ষোভ ও অস্থিরতার জেরে সংশ্লিষ্ট এলাকার প্রায় ষাটটি শিল্পকারখানায় আকস্মিক ছুটি ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছে কতৃর্পক্ষ।
ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে গাজীপুর শিল্প পুলিশের পুলিশ সুপার আমজাদ হোসাইন গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে, আন্দোলনরত শ্রমিকদের ভিড়ে মিশে থাকা বহিরাগত সাতজন নাশকতাকারীকে ইতোমধ্যে আটক করা হয়েছে। শ্রমিকদের তীব্র আন্দোলন এবং ব্যস্ত মহাসড়ক অবরোধের কারণে সকাল থেকেই ঢাকা-টাঙ্গাইল ও ঢাকা-ময়মনসিংহ রুটে সকল প্রকার যানবাহন চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ থাকে। এর ফলে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কে যাতায়াতকারী সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তির শিকার হন।
তথ্যসূত্র অনুযায়ী, সকাল সাড়ে নয়টার দিকে মহানগরের নাওজোড় এলাকায় প্যানিসিয়া লিমিটেড কারখানার কর্মীরা ভবন থেকে বেরিয়ে ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের উড়ালসড়কের পশ্চিম অংশে সমবেত হন। সেখানে তারা বাঁশ ফেলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে মহাসড়ক পুরোপুরি আটকে দেন, যার ফলে সড়কের দুই দিকেই যান চলাচল স্তব্ধ হয়ে যায়। ঠিক একই সময়ে কোনাবাড়ীর বে ফুটওয়্যার, মৌচাকের পূর্বাণী এবং তেলিচালার লগোস অ্যাপারেলস ও এটিএস অ্যাপারেলস প্রতিষ্ঠানের কর্মীরাও কাজ বর্জন করে রাস্তায় নেমে আসেন।
অন্যদিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের ভোগড়া অংশেও বেশ কিছু কারখানার শ্রমিকেরা রাস্তায় টায়ার জ্বেলে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন। এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে বিজিবি, শিল্প পুলিশ এবং থানা থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে শ্রমিকদের শান্ত করার চেষ্টা চালায়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ কর্মীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে শুরু করলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একাধিক সদস্য আঘাতপ্রাপ্ত হন।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় পুলিশ বাধ্য হয়ে কাঁদানে গ্যাসের শেল ও লাঠিপেটা চালিয়ে আন্দোলনকারীদের সড়ক থেকে ছত্রভঙ্গ করে দেয়। একই সময়ে ভোগড়া বাইপাস অঞ্চলেও কর্মীরা টায়ার প্রজ্বলন করে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক আটকে দেন এবং সেখানেও পুলিশ কাঁদানে গ্যাসের শেল ও লাঠিপেটার মাধ্যমে তাদের হটিয়ে দেয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে পুলিশ ও অন্যান্য বাহিনী কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে।
গত কয়েক দিন ধরেই মূলত মজুরি বৃদ্ধির জোর দাবি জানিয়ে গাজীপুরের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিকদের আন্দোলন, মহাসড়ক অবরোধ, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেই চলেছে। এসব অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনায় পুলিশ ও সাংবাদিকসহ বহু মানুষ আহত হয়েছেন এবং বিভিন্ন যানবাহনের পাশাপাশি কারখানার গুদামেও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। দুপুরের দিকে কালিয়াকৈর উপজেলার চন্দ্রা পল্লী বিদ্যুৎ অঞ্চলেও কর্মীরা বিক্ষোভ শুরু করলে পুলিশ ও বিজিবি যৌথভাবে কাঁদানে গ্যাস ও সাউন্ড গ্রেনেড ছুড়ে পরিস্থিতি শান্ত করে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে শিল্পাঞ্চলের অতি গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলোতে অতিরিক্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জসহ সংলগ্ন শিল্পাঞ্চলে শ্রমিক অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে শান্তি বজায় রাখতে মোট ১২ প্লাটুন বিজিবি সদস্য দায়িত্ব পালন করছেন। বর্তমান পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের জন্য ড্রোন এবং বডি ওর্ন ক্যামেরার মাধ্যমে সরাসরি নজরদারিও চালানো হচ্ছে বলে বিজিবির পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে।
দুপুরে প্রেরিত ওই বিজ্ঞপ্তিতে আরও জানানো হয় যে, গাজীপুরের সফিপুর, কালিয়াকৈর এবং কোনাবাড়ী অঞ্চলে দশ প্লাটুন এবং নারায়ণগঞ্জের চাষাঢ়া অঞ্চলে দুই প্লাটুন বিজিবি সদস্য মোতায়েন রয়েছে। এছাড়া আশুলিয়া ও মিরপুরসহ সংলগ্ন অন্যান্য অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও অত্যন্ত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। স্থানীয় প্রশাসন ও অন্যান্য বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় রেখেই বিজিবি কাজ করছে এবং জননিরাপত্তা রক্ষার্থে এই কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।