
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
জাতীয় ক্রিকেট লিগের শেষ দিনে সিলেট ও চট্টগ্রামের মধ্যকার ম্যাচটি রূপ নিয়েছিল চরম এক রোমাঞ্চকর নাটকে। ম্যাচের শেষ দিনে জয়ের জন্য চট্টগ্রামের প্রয়োজন ছিল ১০১ রান এবং তাদের হাতে অক্ষত ছিল ৯টি উইকেট। সমীকরণটি দেখে মনে হচ্ছিল চট্টগ্রামের জয় কেবল সময়ের অপেক্ষা মাত্র। তবে ক্রিকেট যে সব সময়ই এক অনিশ্চয়তার মহাসমুদ্র, তা আবারও প্রমাণ করলেন সিলেটের দুই অভিজ্ঞ স্পিনার নাসুম আহমেদ ও শাহানুর রহমান। প্রায় হাতের মুঠোয় থাকা জয়টি চট্টগ্রামকে প্রায় কেড়ে নিতে বসেছিলেন এই দুই বোলার। শেষ পর্যন্ত অবশ্য সেই অঘটন ঘটাতে পারেননি তাঁরা এবং একটি রুদ্ধশ্বাস লড়াইয়ের পর শেষ উইকেটে জয় তুলে নেয় চট্টগ্রাম।
এর আগে চট্টগ্রামের স্কোরবোর্ডে ৩ উইকেটে ১৮৭ রান জমা হওয়ার পর মাত্র ১৩ ওভারের ঝড়ে মাত্র ২৩ রান যোগ করতেই তারা একে একে হারায় ৬টি মূল্যবান উইকেট। সিলেটের বোলারদের মধ্যে নাসুম আহমেদ ৭৬ রান খরচ করে শিকার করেন ৪টি উইকেট এবং সমপরিমাণ ৭৬ রান খরচ করে শাহানুর রহমান তুলে নেন ৩টি উইকেট। এই ধস নামার পর সিলেটের শিবিরের জয়ের সম্ভাবনা অত্যন্ত প্রবল হয়ে ওঠে। কিন্তু দলের এমন বিপদের দিনেও একপ্রান্ত আগলে লড়াই চালিয়ে যান চট্টগ্রামের ওপেনার সাদিকুর রহমান। এই দুর্দান্ত ব্যাটিংয়ের সুবাদে চলতি মৌসুমে তিনি তুলে নেন নিজের তৃতীয় সেঞ্চুরিটি। তবে ব্যক্তিগত ঠিক ১০০ রানের মাথায় দলের নবম ব্যাটসম্যান হিসেবে যখন তিনি সাজঘরে ফিরে যান, তখনো জয়ের বন্দরে পৌঁছাতে চট্টগ্রাম দলের প্রয়োজন ছিল ১৭ রান।
এরপর শেষ দুই ব্যাটসম্যান আশরাফুল হাসান রোহান ও সানজিদ মজুমদার মিলে সিলেটের সব আশাকে গুঁড়িয়ে দিয়ে দলের জয় নিশ্চিত করেন। অফ স্পিনার শাহানুরের বলটিকে মাথার ওপর দিয়ে দারুণ এক শটে সীমানার বাইরে পাঠিয়ে চার হাঁকিয়ে জয় নিশ্চিত করেন রোহান। এই জয়ে চট্টগ্রামের ড্রেসিংরুম থেকে উচ্ছ্বসিত খেলোয়াড়রা দৌড়ে মাঠে নেমে পড়েন। চলতি লিগে এটি তাদের দ্বিতীয় জয় এবং এই জয়ের ফলে ২১ পয়েন্ট সংগ্রহ করে তারা পয়েন্ট তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে।
অন্যদিকে ময়মনসিংহের বিপক্ষে খুলনার জয়টি এসেছে তুলনামূলক বেশ স্বস্তিদায়কভাবেই। আগের দিন ফলো অনে পড়া ময়মনসিংহ দল শেষ দিন খেলা শুরু করেছিল ৯ উইকেটে ৩১৫ রান নিয়ে। আর মাত্র ৪ রান সংগ্রহ করতেই তাদের ইনিংসের শেষ উইকেট পতন ঘটে এবং তারা অলআউট হয়ে যায়। এর ফলে খুলনার সামনে জয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত হয় ১৪০ রান। ওপেনার এনামুল হক বিজয়ের চমৎকার ও দায়িত্বশীল অপরাজিত ৮০ রানের ইনিংসে ভর করে ৮ উইকেটের বিশাল ব্যবধানের জয় তুলে নেয় খুলনা দল। পাঁচ ম্যাচ খেলে তিনটিতে জয় পেয়ে তাদের মোট পয়েন্ট দাঁড়িয়েছে ২৯। এর মাধ্যমে পঞ্চম রাউন্ড শেষে পয়েন্ট তালিকার শীর্ষস্থানটিও তারা নিজেদের দখলে নিশ্চিত করেছে।
এদিকে বগুড়ার মাঠে রাজশাহীর বিপক্ষে ম্যাচটিতে রংপুরের ওপেনার মিম মোসাদ্দেক ব্যাট হাতে দারুণ এক কীর্তি গড়েছেন। চলতি টুর্নামেন্টের প্রথম চার ম্যাচে দুটি সেঞ্চুরি ও তিনটি ফিফটি হাঁকিয়েছিলেন এই ব্যাটার। যদিও রাজশাহীর বিপক্ষে প্রথম ইনিংসে তিনি মাত্র ১০ রান করেই আউট হয়ে গিয়েছিলেন, তবে দ্বিতীয় ইনিংসে তিনি দলের আস্থার প্রতিদান দিয়েছেন। বগুড়ায় শেষ দিনে ৬১ রানের একটি নান্দনিক ইনিংস খেলে টানা পাঁচ ম্যাচেই অন্তত একটি করে ফিফটি অর্জনের রেকর্ড নিজের নামের পাশে বজায় রেখেছেন তিনি।
ম্যাচের শেষ দিনে ৩ উইকেটে ১১০ রান নিয়ে দিন শুরু করা রাজশাহী দল মাত্র ৭৪ রান যোগ করতেই তাদের শেষ ৭টি উইকেট হারিয়ে ১৮৪ রানে অলআউট হয়ে যায়। এর ফলে রংপুরের সামনে জয়ের জন্য লক্ষ্য দাঁড়ায় ১৬০ রান। মিম মোসাদ্দেকের দায়িত্বশীল ফিফটি ইনিংসের ওপর ভর করে বর্তমান চ্যাম্পিয়ন রংপুর দল শেষ পর্যন্ত ৬ উইকেটের সহজ জয় তুলে নেয়। চলতি জাতীয় ক্রিকেট লিগে এটি বর্তমান চ্যাম্পিয়নদের প্রথম জয়।
অপরদিকে রাজশাহীর মাঠে ঢাকা ও বরিশালের মধ্যকার ম্যাচটির শেষ দিনে ভিন্ন রকমের নাটকীয়তা দেখা যায়। এই ম্যাচে কোনো দলেরই জয়ের বাস্তবসম্মত কোনো সম্ভাবনা ছিল না এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ড্রয়ের মাধ্যমেই শেষ হয়। তবে এই ম্যাচটি দুই দলের দুই তরুণ ব্যাটসম্যানের জন্য চরম আক্ষেপের উপলক্ষ হয়ে রইল। ৮ উইকেটে ২৬৬ রান নিয়ে দিনের খেলা শুরু করা বরিশাল দল শেষ পর্যন্ত অলআউট হয় ৩১৫ রানে। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের ক্যারিয়ারের প্রথম সেঞ্চুরির অত্যন্ত কাছাকাছি পৌঁছেও তা অর্জন করতে পারেননি উইকেটকিপার ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ আবদুল্লাহ। মাত্র ১৮ বছর বয়সী এই তরুণ ক্রিকেটার ১৪৩ বল মোকাবেলা করে ৯৪ রান সংগ্রহ করেন। কাঙ্ক্ষিত সেঞ্চুরি থেকে কেবল ৬ রান দূরে থাকতেই থেমে যায় তাঁর এই লড়াকু ইনিংস।
অন্যদিকে ঢাকার ব্যাটার আশিকুর রহমানের আক্ষেপটি ছিল আরও দীর্ঘ ও যন্ত্রণাদায়ক। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে নিজের পঞ্চম সেঞ্চুরির মাইলফলক ছুঁতে যখন তাঁর কেবল ১ রান প্রয়োজন, তখনই তিনি আউট হয়ে যান। বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে ২২তম ব্যাটসম্যান হিসেবে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৯৯ রান করে আউট হওয়ার দুর্ভাগ্যজনক অভিজ্ঞতা অর্জন করলেন তিনি। আশিকুরের এই ১ রানের আক্ষেপের ৯৯ রানের চমৎকার ইনিংসের ওপর ভিত্তি করে ঢাকা দল ৫ উইকেটে ২৫১ রান সংগ্রহ করে তাদের ইনিংস ঘোষণা করে। এরপর দুই দলের অধিনায়কের সম্মতিতে ম্যাচটি ড্র বলে মেনে নেওয়া হয়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।