
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আমদানির মাধ্যমে দেশে আসা বিভিন্ন ব্র্যান্ডের দুই চাকার মোটরযান রাস্তায় চলার মোটে তিন থেকে সাড়ে তিন বছরের মধ্যেই ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ছে। এগুলোর জ্বালানি বা তেলের ট্যাংকের ভেতর অংশ ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে সৃষ্টি হচ্ছে ক্ষুদ্রাকৃতির ছিদ্র। গতানুগতিক ঝালাই প্রক্রিয়া ব্যবহার করেও এসব ছিদ্র স্থায়ীভাবে প্রতিকার করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে চালকশ্রেণিকে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করে নতুন ট্যাংক সংযোজন করতে হচ্ছে।
মোটরসাইকেল চালকদের এমন চরম ভোগান্তি এবং বাড়তি খরচের ওপর ভিত্তি করে দক্ষিণাঞ্চলের জেলা যশোরে গড়ে উঠেছে ফুয়েল ট্যাংক কেনাবেচা, ডেন্টিং তথা দেবে যাওয়া অংশ আগের রূপ দেওয়ার কাজ এবং রং করার একটি বিশাল বাণিজ্যিক বাজার। এই ব্যবসায়িক খাতটি অত্যন্ত রমরমা হলেও, ট্যাংক দ্রুত নষ্ট হওয়ার প্রকৃত কারণ নিয়ে দেখা দিয়েছে তীব্র ধোঁয়াশা। জ্বালানি তেলের মানহীনতা নাকি ট্যাংক তৈরিতে ব্যবহার করা ধাতুর নিম্নমান দায়ী, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
যশোরের বিভিন্ন এলাকার মেকানিক পট্টি ও গ্যারেজগুলো ঘুরে লক্ষ করা গেছে, সেখানে সারিবদ্ধভাবে মোটরসাইকেলের ট্যাংক খোলার কাজ চলছে। শহরের নলডাঙ্গা সড়ক ও রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা আর এন সড়ক এলাকায় তেলের ট্যাংক ঘিরে ডেন্টিং ও সুনিপুণ রঙের এক বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের আঞ্চলিক কার্যালয়ের খুব কাছাকাছি এসব স্থানে আমদানি করা রঙহীন বা ব্ল্যাঙ্ক এবং পুরনো ট্যাংক মেরামতের বেশ কয়েকটি কারখানা গড়ে উঠেছে।
দক্ষ কারিগরেরা এসব কারখানায় মরিচা দূরীকরণ, বিশেষ লেপন প্রয়োগ, স্প্রে পেইন্ট করা, পলিশ এবং স্টিকার সাঁটানোর কাজ করে চলেছেন। কেবল ট্যাংক বিক্রির উদ্দেশ্যে যশোরে অন্তত ২৫ থেকে ৩০টি বিশেষায়িত শোরুম রয়েছে। এসব শোরুমের সামগ্রिक খুচরা যন্ত্রাংশের নব্বই শতাংশ জুড়েই রয়েছে বিভিন্ন মডেলের মোটরসাইকেলের ট্যাংক।
মোটরসাইকেল চালকদের পক্ষ থেকে ট্যাংক পরিবর্তনের চাহিদা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রতিবেশী দেশ ভারত থেকে খুচরা ট্যাংক আমদানির পরিমাণ রেকর্ড গড়েছে। বেনাপোল কাস্টমস হাউসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালের পর থেকে এই পণ্যের আমদানি বেড়ে প্রায় পাঁচ গুণ পর্যন্ত পৌঁছেছে। প্রতি কেজি চার মার্কিন ডলার মূল্যে এই সমস্ত ট্যাংকের শুল্কায়ন সম্পন্ন করা হয়ে থাকে।
গত পাঁচ বছরের অর্থাৎ ২০২২ থেকে ২০২৬ সালের সময়সীমার মধ্যে বেনাপোল বন্দর দিয়ে ২১ লাখ ৪৩ হাজার ১৯৯ কেজির বেশি পরিমাণের তেলের ট্যাংক শুল্কায়িত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের হিসাব অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট ট্যাংকের গড় ওজন প্রায় ৩ কেজি ৩৮০ গ্রাম। সেই হিসাবে গত পাঁচ বছরে সর্বমোট প্রায় ৬ লাখ ৩৪ হাজার ২৩টি ট্যাংক দেশে আমদানি করা হয়েছে, যার সিংহভাগই এসেছে গত দুই বছরের ব্যবধানে।
ভারত থেকে ট্যাংক আমদানিকারক সুজন দত্তের ভাষ্যমতে, ভারতে ট্যাংক সাধারণত দুটি ভিন্ন অবস্থায় পাওয়া যায়, যার একটি হলো রঙ করা এবং অন্যটি ব্ল্যাঙ্ক বা রঙহীন। বর্তমানে তাদের মাধ্যমে বেশির ভাগই রঙহীন ব্ল্যাঙ্ক ট্যাংক আমদানি করা হচ্ছে। পরবর্তীতে সেগুলোকে যশোরে এনে উপযুক্ত রং করে সারা দেশের বিভিন্ন প্রান্তে পাঠানো হয়। তাঁর পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের মোট চাহিদার প্রায় নব্বই শতাংশই যশোর থেকে জোগান দেওয়া হয় এবং এই ব্যবসার সঙ্গে অন্তত ১৫ জন আমদানিকারক সরাসরি যুক্ত আছেন।
নলডাঙ্গা সড়কের পার্শ্ববর্তী এলাকায় নিজস্ব কারখানা পরিচালনা করছেন শান্ত মোল্লা। তাঁর কর্মশালায় গিয়ে দেখা মেলে, শ্রমিকেরা একসাথে বেশ কয়েকটি ট্যাংকে সুনিপুণভাবে রং ও পলিশের কাজ করছেন। বিগত সাতাশ বছর ধরে ডেন্টিং ও রঙের পেশার সঙ্গে জড়িত শান্ত মোল্লা জানান, গত দুই বছর ধরে তিনি ভারত থেকে নিয়ে আসা ব্ল্যাঙ্ক ট্যাংক নিয়ে কাজ করছেন। তাঁর কারখানায় প্রতিদিন গড়ে ত্রিশটি ট্যাংকে রং করা হয় এবং এই কাজের সুবাদে তাঁর প্রতিষ্ঠানে তিনিসহ মোট নয়জন শ্রমিকের কর্মসংস্থান হয়েছে।
বাগেরহাট জেলার মোংলা উপজেলা থেকে সুদূর যশোরে নিজের মোটরসাইকেল নিয়ে হাজির হয়েছেন চালক রুবেল হাওলাদার। তিনি বলেন, আজ থেকে তিন বছর আগে ক্রয় করা বাইকের তেলের ট্যাংকটি বর্তমানে ফুটো হয়ে গেছে। যশোরে এসে ১০ হাজার ৬০০ টাকার বিনিময়ে বাজাজ কোম্পানির পালসার মডেলের একটি নতুন ট্যাংক কিনেছেন তিনি। এই শহরে রঙের কাজ মানসম্মত ও টেকসই হয়, এমন জনশ্রুতি শুনেই তিনি এখানে এসেছেন। তবে নতুন একটি মোটরসাইকেলের ট্যাংক কেন মোটে তিন বছরের মাথায় নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, সে বিষয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই বলে তিনি চরম ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
মোটরসাইকালের ফুয়েল ট্যাংক অতি দ্রুত নষ্ট হওয়ার প্রকৃত কারণ কী, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চিত উত্তর এখনো পাওয়া যাচ্ছে না। জ্বালানি তেলে কোনো ধরনের ভেজাল বা ক্ষতিকর রাসায়নিকের মিশ্রণ রয়েছে, নাকি ট্যাংকের উৎপাদনে ব্যবহৃত ধাতুর মান নিম্নমানের, তার কোনটি এর জন্য দায়ী, তা সম্পূর্ণ স্পষ্ট নয়।
গত ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর দেশের একটি শীর্ষস্থানীয় জাতীয় দৈনিকে এই সংক্রান্ত একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছিল। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ডিপো থেকে সংগৃহীত জ্বালানি তেলের মান নিয়ে আপত্তি জানিয়ে ওই বছরের ১২ অক্টোবর বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনকে একটি চিঠি দিয়েছিল বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম ডিলারস, ডিস্ট্রিবিউটরস, এজেন্টস অ্যান্ড পেট্রলপাম্প ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন।
উক্ত চিঠিতে সুনির্দিষ্টভাবে বলা হয়েছিল যে, রাষ্ট্রায়ত্ত তিনটি তেল কোম্পানির জ্বালানির মানে ভিন্নতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বিশেষ করে পেট্রল ও অকটেনের মান সন্তোষজনক না হওয়ার কারণে মোটরসাইকেল ও মোটরগাড়ির ফুয়েল ট্যাংকে দ্রুত মরিচা ধরে যাচ্ছে। এমনকি বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনের তেল মজুত করার ভূগর্ভস্থ ট্যাংকেও মরিচা ধরার সমস্যা দেখা দিচ্ছে।
এই বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে দেশের পণ্যের মান প্রণয়ন ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন বা বিএসটিআইয়ের যশোরের সহকারী পরিচালক আবদুল মতিন জানান, মোটরসাইকেলের ফুয়েল ট্যাংক তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণাধীন তালিকাভুক্ত কোনো পণ্য নয়। তাঁর মতে, এই সামগ্রিক বিষয়টি বাংলাদেশ শিল্প কারিগরি সহায়তা কেন্দ্র বা বিটাকের এখতিয়ারভুক্ত হতে পারে।
অপরদিকে বিটাকের মহাপরিচালক এবং অতিরিক্ত সচিব মোড. নূরুজ্জামান এই প্রসঙ্গে মন্তব্য করতে গিয়ে জানান, তাদের প্রতিষ্ঠান মূলত পলিসি বা নীতিমালাসংক্রান্ত বিষয়াদি নিয়ে কাজ করে থাকে। এই নির্দিষ্ট বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য তাদের জানা নেই। আমদানির অনুমতি সাধারণত বাণিজ্য মন্ত্রণালয় প্রদান করে থাকে, ফলে তারাই হয়তো এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারবে।
সার্বিক এই বিষয়ে উত্তরা মোটরসের চেয়ারম্যান এবং ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউর রহমান সংবাদমাধ্যমকে জানান, মোটরসাইকেলের ফুয়েল ট্যাংক তৈরিতে অত্যন্ত উন্নত মানের ধাতু ব্যবহার করা হয়ে থাকে। বিভিন্ন সময় পরীক্ষাগারে যাচাই করে এই ট্যাংকগুলোতে কোনো ধরনের ত্রুটি বা সমস্যা পাওয়া যায়নি। তাঁর সুনির্দিষ্ট মত হলো, মূল সমস্যাটি নিহিত রয়েছে খোলা বাজারে বিক্রিত তেলের মধ্যে। কিছু অসাধু ব্যবসায়ী এসব খোলা তেলে ভেজাল মিশিয়ে তা বিক্রি করে থাকেন এবং সেই ভেজাল তেল ফুয়েল ট্যাংকে প্রবেশ করার ফলেই মূলত ট্যাংকের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হয় এবং মরিচা ধরে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।