
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
জাতীয় স্টেডিয়ামের ভিআইপি গেট দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই কানে ভেসে আসে সুরের মূর্ছনা। কৌতূহলী হয়ে খানিকটা থমকে দাঁড়াতে হয় দর্শনার্থীদের। সবুজ মাঠের ভেতর এত বড় আয়োজনের কারণ খুঁজতেই চোখে পড়ে বর্ণিল উৎসবের নানা প্রস্তুতি। মাঠের নির্দিষ্ট এক প্রান্তে গানের তালে নৃত্য পরিবেশন করছেন একদল শিল্পী, আর অন্য প্রান্তে কর্মীরা ব্যস্ত সময় পার করছেন বিজ্ঞাপনী বোর্ড লাগানোর কাজে। আগামী বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হতে যাওয়া সাফ ফুটবল চ্যাম্পিয়নশিপের জন্য সবুজ গালিচাও ধুয়েমুছে পুরোপুরি প্রস্তুত করা হচ্ছে।
স্টেডিয়াম চত্বরের বাইরে অবশ্য সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে সেই পুরোনো উন্মাদনার প্রবল ছাপ লক্ষ করা যাচ্ছে না। এর আগে ২০১৮ সালে যখন সর্বশেষ ঢাকায় সাফ টুর্নামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছিল, তখন শুরুর পাঁচ-ছয় দিন আগেই পুরো স্টেডিয়ামপাড়া কানায় কানায় গমগম করত। তবে এবার দৃশ্যপট কিছুটা নীরব মনে হলেও টুর্নামেন্টের আয়োজকদের প্রস্তুতিতে কোনো ধরনের কমতি রাখা হয়নি। আসন্ন উদ্বোধনী মঞ্চ মাতিয়ে তুলতে ঢাকা আসছেন খোদ ফিফা বিশ্বকাপের টরন্টো পর্ব মাতিয়ে যাওয়া বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মার্কিন ডিজে ও সংগীত প্রযোজক সঞ্জয় দেব। তার সঙ্গে যুক্ত হবে স্থানীয় শিল্পীদের আকর্ষণীয় ও জমকালো সাংস্কৃতিক পরিবেশনা।
মাঠের বাইরের এই রঙিন আয়োজন যতই জমজমাট হোক না কেন, দেশের আসল ফুটবলপ্রেমীদের নজর মূলত মাঠের তীব্র লড়াইয়ের দিকেই নিবদ্ধ রয়েছে। দীর্ঘ ২৩ বছরের দীর্ঘ অপেক্ষা ঘুচিয়ে দেওয়ার এক সোনালী হাতছানি এখন লাল-সবুজ দলের সামনে উপস্থিত। স্মরণ করলে দেখা যায়, সেই ২০০৩ সালে এই ঢাকার মাটিতেই সর্বশেষ সাফ চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল বাংলাদেশ দল। এরপর কেটে গেছে সুদীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময়, যার ফলে প্রাপ্তির খাতা সম্পূর্ণ শূন্য এবং সমর্থকদের মনে কেবল জমেছে হতাশা ও দীর্ঘশ্বাস। এবার কি তবে সেই বহুকাঙ্ক্ষিত অপেক্ষার অবসান ঘটবে?
এই প্রশ্নটি কেবল দেশের সাধারণ সমর্থকদের মনেই ঘুরপাক খাচ্ছে না, বরং ভাবাচ্ছে টুর্নামেন্টের শক্তিশালী প্রতিপক্ষদেরও। বিশেষ করে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতের মনেও এই ভাবনা রয়েছে। আসরের সবচেয়ে সফল দল হিসেবে তারা নিজেদের শিরোপা ধরে রাখার সুনির্দিষ্ট প্রত্যয় ব্যক্ত করেই আজ ঢাকায় এসে পৌঁছেছে। দুপুরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পা রেখেই নিজেদের স্পষ্ট লক্ষ্যের কথা সংবাদমাধ্যমের সামনে খোলাসা করেছেন কোচ নওশাদ মুসা। তিনি জানিয়েছেন যে সবারই মূল লক্ষ্য থাকে ম্যাচ জয় করা এবং টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়া এবং তারা অবশ্যই নিজেদের অর্জিত শিরোপা ধরে রাখতে চান।
এদিকে যখন ভারতীয় কোচ বিমানবন্দরে গণমাধ্যমের সঙ্গে নানা বিষয়ে কথা বলছেন, ঠিক সেই মুহূর্তে বাংলাদেশ দল ব্যস্ত ছিল তাদের অনুশীলনে যাওয়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতিতে। বিকেল চারটার সামান্য কিছু সময় আগে জাতীয় দলের টিম বাস গিয়ে থামে নির্ধারিত এবিজি স্পোর্টস সিটির মাঠে। সেখানে পৌঁছানোর পর প্রায় দীর্ঘ দুই ঘণ্টা ধরে চলে খেলোয়াড়দের ঘাম ঝরানো কঠোর অনুশীলন। আর এই একই মাঠে ঠিক তার ঘণ্টাখানেক আগে ঘাম ঝরিয়ে অনুশীলন সেরে নিয়েছে সাফে বাংলাদেশের টুর্নামেন্টের প্রথম প্রতিপক্ষ ভুটান দল।
ছয় দলের এই মর্যাদাপূর্ণ লড়াইয়ে কোন দলটি তুলনামূলক এগিয়ে রয়েছে, সেই আলোচনা উঠলেই সবার আগে বাংলাদেশ ও ভারতের নাম সামনে চলে আসে। যদিও এবারের টুর্নামেন্টে ভারত তাদের পূর্ণ শক্তির দল নিয়ে ঢাকায় এসে পৌঁছায়নি। তবুও ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, অতীতে ভারতকে কখনোই খাটো করে দেখার সুযোগ থাকে না, যেমনটা তারা ২০০৯ সালে অনূর্ধ্ব-২৩ দল নিয়ে অংশ নিয়েও চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল।
তবে এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে বর্তমান বাংলাদেশ দলও আর আগের সেই পুরনো জায়গায় দাঁড়িয়ে নেই। ২০০৯ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সালের এই দীর্ঘ সময়ে দলের সার্বিক চেহারা যেমন বদলে গেছে, তেমনি বহুগুণ বেড়েছে খেলোয়াড়দের সামর্থ্য। হামজা ও শমিতের মতো প্রতিভাবান তারকারা এখন নিয়মিতভাবেই বাংলাদেশের জার্সিতে মাঠ মাতাচ্ছেন। দলের সাম্প্রতিক সময়ের মাঠের পারফরম্যান্সও ভক্তদের মধ্যে নতুন আশার আলো জ্বেলে দিয়েছে। গত বছরের ১৮ নভেম্বর খোদ ঢাকার মাঠেই এএফসি এশিয়ান কাপ বাছাইপর্বের ম্যাচে ভারতকে ১-০ গোলের ব্যবধানে পরাজিত করেছিল বাংলাদেশ।
ভারতীয় কোচ নওশাদ মুসার কাছেও নিশ্চয়ই এই পরিসংখ্যান অজানা নয়। আর এই কারণেই হয়তো তিনি মন্তব্য করেছেন যে তার ব্যক্তিগত বিবেচনায় এই মুহূর্তে বাংলাদেশ দলই টুর্নামেন্টের সবচেয়ে শক্তিশালী দল। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে শেষ পর্যন্ত ফাইনালে তাদেরই মুখোমুখি লড়াই হবে স্বাগতিকদের সঙ্গে।
প্রতিবেশী দেশের কোচের এমন বক্তব্যে যেমন প্রতিপক্ষের প্রতি যথাযথ সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি ফুটে উঠেছে, তেমনি নিজেদের শিরোপা ধরে রাখার আত্মবিশ্বাসও পরিষ্কার। তবে বাংলাদেশ দলের কোচ টমাস ডুলির কণ্ঠে আরও বেশি স্পষ্ট ও জোরালো প্রত্যয়ের সুর শোনা গেছে। মুঠোফোনে দেওয়া বক্তব্যে তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে ভারত কেমন দল গঠন করে নিয়ে এসেছে, সেটা কোনো বড় বিষয় নয়। নিশ্চিতভাবেই তারাও শিরোপা জিততে চাইবে এবং বাংলাদেশের লক্ষ্যও ঠিক একই, কারণ কেউই এখানে হার মানতে প্রস্তুত নয়। সবার প্রতি পূর্ণ সম্মান বজায় রেখেই তিনি দৃঢ়কণ্ঠে উচ্চারণ করেছেন যে এবার আমাদেরই জেতা উচিত।
একদিকে ভারতের নিজেদের অর্জিত শিরোপা ধরে রাখার সুনির্দিষ্ট প্রত্যয়, অন্যদিকে বাংলাদেশের দীর্ঘ ২৩ বছরের অপেক্ষা ঘুচিয়ে দেওয়ার সুমহান স্বপ্ন। কথার এই লড়াইয়ের মধ্য দিয়ে দুই প্রতিবেশী দেশই নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান পরিষ্কার করে দিয়েছে। তাদের এই কথার লড়াইয়ের মূল উদ্দেশ্য যে মনস্তাত্ত্বিক দিক থেকে কিছুটা সুবিধা আদায় করে নেওয়া, তা বলাই বাহুল্য। তবে দিনের শেষে এই কথার ফুলঝুরির বাস্তবিক কোনো মূল্য নেই, কারণ মাঠের আসল খেলাটাই হলো সবচেয়ে বড় সত্য। এই সত্যটি শুধু নওশাদ মুসা নন, খুব ভালো করেই অনুধাবন করতে পারছেন বাংলাদেশ কোচ টমাস ডুলিও।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।