
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
গণতন্ত্রকে সুদৃঢ় ও অর্থবহ করতে হলে প্রথমেই আমাদের পরিষ্কার করতে হবে যে আমরা মূলত কেমন ধরনের রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তুলতে চাই। কারণ, গণতন্ত্রের ধরন নানা রকমের হতে পারে। কেবল অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোটের মাধ্যমেই কিন্তু গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার কেবল সূচনা হয়ে থাকে। তবে এই নির্বাচনও দুটি ভিন্ন রূপ ধারণ করতে দেখা যায়। একপর্যায়ে ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে কোনো নির্দিষ্ট দল বা একক ব্যক্তির হাতে জমা হয়ে জন্ম দিতে পারে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্র। অন্যথায় আবার ক্ষমতার হিসাব বদলে গিয়ে তৈরি হতে পারে অভিজাতদের স্বৈরতন্ত্র, যেখানে সাধারণ মানুষ পুরোপুরি কোণঠাসা ও প্রান্তিক হয়ে পড়ে।
এই দুই চরমপন্থার মধ্যবর্তী স্থানে সঠিক ভারসাম্য খুঁজে নেওয়াই হলো গণতন্ত্রের প্রকৃত লড়াই। এর মূল উদ্দেশ্য হলো যাতে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে নীত নির্ধারণের প্রক্রিয়াটিতে জনগণের প্রকৃত কণ্ঠস্বর ও তাদের উদ্বেগ প্রতিফলিত হয়। তাই রাষ্ট্রে আমরা ঠিক কী ধরনের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা দেখতে চাই, তার ওপরই নির্ভর করবে বিরোধী দলের আদর্শ ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত।
আমাদের দেশে অনেক মানুষের কাছেই গণতন্ত্রের অর্থ অত্যন্ত সংকীর্ণ। এখানে প্রতি পাঁচ বছর পরপর একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে কেবল ক্ষমতার হাতবদল হওয়াকেই রাষ্ট্রকে গণতান্ত্রিক বলে ধরে নেওয়া হয়। গণতন্ত্রের এই ন্যূনতম সংজ্ঞাটিকে পুরোপুরি ভুল না বলা গেলেও, আমাদের পুরো মনোযোগ কেবল নির্বাচনের দিনটিতেই সীমাবদ্ধ থাকে। যদি এমনটি ঘটে, তবে দুই ভোটের মধ্যবর্তী সময়ে বিরোধী দলের কাছ থেকে কোনো গঠনমূলক কিছু আশা করা সম্পূর্ণ অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়।
এমন ব্যবস্থায় প্রতি পাঁচ বছর অন্তর ভোট অনুষ্ঠিত হলেও, মধ্যবর্তী সময়ে সব ক্ষমতা পুরোপুরি কুক্ষিগত থাকে ক্ষমতাসীনদের হাতে। এ সময় রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের স্বাধীনতা হারিয়ে ফেলে এবং সাধারণ নাগরিকদের ভূমিকা কেবল ব্যালট পেপারে সিল মারার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। এই কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিরোধী দল দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে নির্বাহী বিভাগকে জবাবদিহির মুখোমুখি দাঁড় করানোর বিন্দুমাত্র সুযোগ পায় না, অথচ ঠিক পাঁচ বছর পর বিশাল ক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে তারা সরকার গঠনের প্রতিযোগিতায় নেমে পড়ে। এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে বিরোধী দলের কাছে দায়িত্বশীল আচরণের আশা করা যায় না।
পক্ষান্তরে, আমরা যদি গণতন্ত্রকে একটি চলমান প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচনা করি, যেখানে সরকারি নীতিগুলো রাজনৈতিক আলাপ-আলোচনা ও পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমে নির্ধারিত হবে, একক কোনো আধিপত্যের সুযোগ থাকবে না এবং ক্ষমতার যথেচ্ছ অপব্যবহার রোধে নির্বাহী বিভাগের ওপর কঠোর নজরদারি বজায় থাকবে, তবেই কেবল বিরোধী দলের কার্যকর ভূমিকা পালনের সুযোগ তৈরি হতে পারে। মূলত আমরা এমন একটি প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রত্যাশা করি, যা রাজনীতিকে ‘বিজয়ী সব নিয়ে নেয়’ এই নীতি থেকে বের করে ‘কিছু জেতো কিছু হারো’ নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে।
তবে কোনো ক্ষমতাসীন দলই নিজ দায়িত্বে নিজেদের ক্ষমতা খর্ব করতে চায় না। তাই এই ধরনের একটি রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার পক্ষে যৌক্তিকতা তুলে ধরা, নাগরিক সমাজের সঙ্গে দৃঢ় মৈত্রী স্থাপন করা এবং কাঠামোগত সংস্কারের দাবিতে সরকারের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করাই হওয়া উচিত বিরোধী দলের প্রধান কাজ।
যদিও প্রতিনিধিত্বমূলক উদার গণতন্ত্রের নিজস্ব একটি বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রায়ই এই ব্যবস্থাটি অভিজাতদের পারস্পরিক দর-কষাকষির ওপর মাত্রাতিরিক্ত মাত্রায় নির্ভরশীল করে তোলে এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের সরাসরি প্রভাব বিস্তারের পথ সংকুচিত করে ফেলে। জনপ্রতিনিধিরা যেন স্থানীয় পর্যায়ের সংকীর্ণ দাবির ঊর্ধ্বে উঠে জাতীয় স্বার্থে পুরোপুরি স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারেন, তত্ত্বের এই সুযোগের অপব্যবহার করে বাস্তবে নাগরিকদের মতামতকে অবহেলা করা হয়।
এই সীমাবদ্ধতা থেকেই মূলত জন্ম নিয়েছে অংশগ্রহণমূলক গণতন্ত্রের ধারণা, যেখানে যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণকেই সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হয়। এই ধারাটি বেশ পরিবর্তনকামী হতে পারে, যেমন নাগরিক সমাবেশ আয়োজন কিংবা নিয়মিত গণভোটের মাধ্যমে বড় ধরনের নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। আবার এটি একটি অত্যন্ত কার্যকর পরামর্শমূলক ব্যবস্থা হতে পারে, যেখানে সাধারণ নাগরিকেরা অনায়াসেই তাঁদের নানা দাবি-দাওয়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে পৌঁছে দিতে সক্ষম হন। তবে অবশ্যই এমন একটি অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থাপনাকে সাংবিধানিক সুরক্ষার চাদরে মুড়ে রাখতে হবে, যাতে কোনোভাবেই সংখ্যাগরিষ্ঠের চাহিদার কারণে সংখ্যালঘুদের অধিকার ক্ষুণ্ন না হয়। আমরা যদি একটি প্রাণবন্ত গণতন্ত্র বিনির্মাণ করতে চাই, তবে বিরোধীদের অবশ্যই সাধারণ মানুষের অনেক কাছাকাছি চলে যেতে হবে।
গণতন্ত্রের এই তিনটি ভিন্ন ধারা যথা নির্বাচনী, উদার প্রাতিষ্ঠানিক এবং অংশগ্রহণমূলক ধারা একে অপরের কোনো বিরোধী নয়। অবাধ নির্বাচন যদি এর ভিত্তিপাথর হয়ে থাকে, তবে উদার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হলো ক্ষমতার অপব্যবহার রোধ করার একমাত্র বর্ম, আর অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা হলো সাধারণ মানুষের হাতে থাকা ক্ষমতার প্রধান চাবিকাঠি। আমাদের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই তিনটি মাত্রাকে একটি সুতোয় গেঁথে ফেলা। আমরা যত বেশি নিছক ভোটকেন্দ্রিক চিন্তা থেকে বেরিয়ে এসে নীতিনির্ধারণী প্রক্রিয়ায় সাধারণ মানুষকে সম্পৃক্ত করার দিকে এগিয়ে যাব, বিরোধী দলের গুরুত্ব ঠিক ততটাই বেশি বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমান বাংলাদেশের সার্বিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিরোধী দলের ভূমিকা আরও অনেক বেশি সংবেদনশীল এবং জরুরি। শাসক দল যখন যেকোনো গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান পুনর্নির্মাণ করার বিষয়ে সম্পূর্ণ অনিচ্ছুক থাকে, যেকোনো ধরনের সমালোচনা সহ্য করতে নারাজ হয়, আমলাতন্ত্রের যত্রতত্র দলীয়করণে ব্যস্ত থাকে, দল ও সরকারকে একাকার করে ফেলে এবং নিজেদের দলীয় কর্মীদের নিয়ন্ত্রণ করতেই ব্যর্থ হয়, তখন ক্ষমতাসীন দল নিজ উদ্যোগে কোনো ধরনের সংস্কার করবে—এমন আশা করা সম্পূর্ণ ভুল। স্বৈরাচারী মনোভাব ও প্রবণতার মুখে ক্ষমতার লাগাম টেনে ধরতে বিরোধী দলকেই রাজপথ ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগে এক শক্তিশালী প্রতিরোধ এবং বিকল্প ব্যবস্থার রূপরেখা তৈরি করতে হবে।
এখন প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় বিরোধী দলগুলো কি আদৌ সেই নির্দিষ্ট দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছে? অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, বর্তমান বিরোধীদের রাজনীতি এখনো মূলত সংঘাতকেন্দ্রিক এবং তা সাধারণ মানুষমুখী চিন্তাভাবনা থেকে বহু দূরে অবস্থান করছে। একটি প্রগতিশীল ও গঠনমূলক বিরোধী রাজনীতি বাস্তবায়নের স্বার্থে তাদের সুনির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়ে বিশেষ জোর দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
প্রথমত, কেবল সরকারি বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সমালোচনার মধ্যে নিজেদের সীমাবদ্ধ না রেখে কীভাবে একটি টেকসই রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার সাধন করা সম্ভব, তার একটি স্পষ্ট যৌক্তিকতা সাধারণ জনগণের সামনে তুলে ধরতে হবে। ক্ষমতাসীন অভিজাত জোটে ফাটল ধরাতে সুশীল সমাজ ও প্রাতিষ্ঠানিক অংশীদারদের সবাইকে সঙ্গে নিয়ে একটি শক্তিশালী পাল্টা সংস্কারবাদী রাজনৈতিক অক্ষ গড়ে তোলা প্রয়োজন।
দ্বিতীয়ত, দীর্ঘমার্চ বা শক্তি প্রদর্শনের চিরাচরিত রাজনৈতিক কর্মসূচিগুলোর কার্যকারিতা এখন প্রায় তলানিতে এসে ঠেকেছে। কেবল নিজেদের দলীয় সমর্থক জমায়েত করার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে বিরোধী দলকে সরাসরি পৌঁছাতে হবে আপামর জনসাধারণের দোরগোড়ায়। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ঊর্ধ্বগতি, ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা কিংবা দুর্নীতির মতো দৈনন্দিন সংকটগুলো যে বর্তমান বিদ্যমান শাসনব্যবস্থারই অনিবার্য ফসল, তা সাধারণ মানুষকে অত্যন্ত প্রাঞ্জল ভাষায় বোঝাতে হবে। এই ক্লান্তিহীন ও ধৈর্যশীল কাজ সম্পন্ন করা ছাড়া কোনোভাবেই গণআস্থা অর্জন করা সম্ভব নয়।
তৃতীয়ত, একটি সমতাভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে তাদের মনে একটি স্পষ্ট ভিশন থাকা আবশ্যক। জনতুষ্টিবাদ, ধর্মীয় চরমপন্থা কিংবা কোনো ধরনের বৈষম্যমূলক মানসিকতার ওপর ভর করে কোনো দল যদি গণতান্ত্রিক কাঠামো ব্যবহার করেও থাকে, তবে তা দিন শেষে সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরতন্ত্রেই পর্যবসিত হয়। বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে অত্যন্ত স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা উচিত যে ধর্ম, জাতি কিংবা লিঙ্গপরিচয় নির্বিশেষে দেশের প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা এবং ভিন্নমতকে যথাযথ শ্রদ্ধার সঙ্গে গ্রহণের এক উদার রাজনৈতিক সংস্কৃতি তারা গড়ে তুলবে। সংখ্যালঘুদের অধিকার সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রই কখনোই প্রকৃত অর্থে উদার গণতান্ত্রিক হয়ে উঠতে পারে না।
বাংলাদেশের বর্তমান বিরোধী দলগুলো গণতন্ত্রের এই মূল জায়গাটিতে নিজেদের প্রকৃত সাফল্যে ঠিক কতটুকু সফল হতে পেরেছে, সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।