
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা ও কৌশলের মাধ্যমে ইউক্রেনকে নিজের মুঠোয় আনার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন। একই সঙ্গে তিনি বহু বছর ধরে মার্কিন নেতা ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছেন। ক্রেমলিনের প্রধানের সেই দ্বিতীয় প্রচেষ্টার ফলপ্রসূতাই এখন তাঁর প্রথম ক্ষেত্রের যাবতীয় ব্যর্থতা পুষিয়ে নিতে বড় ধরনের সহায়তা জোগাচ্ছে। ইউক্রেনে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে রাশিয়ার নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো যখন একের পর এক ব্যাহত হচ্ছিল, ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বর্তমান অবস্থান মস্কোকে বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিচ্ছে।
আমেরিকার পক্ষ থেকে রাশিয়ার ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো শিথিল করা হচ্ছে এবং ইউক্রেনীয় ভূখণ্ডে সামরিক ও আর্থিক সহায়তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দুদেশের মধ্যকার গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান ব্যাহত করার পাশাপাশি ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কিকে পুতিনের যুদ্ধসংক্রান্ত শর্তগুলো মেনে নিতে বাধ্য করা হচ্ছে। ট্রাম্পের এসব নীতির কারণে রাশিয়ার পক্ষে ইউক্রেনের বিশাল এলাকা দখল করা এবং কিয়েভের ভবিষ্যতের যাবতীয় নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্তে একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা অনেক বেশি সহজ হয়ে গেছে।
ইউক্রেনে রাশিয়ার সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে মাঠের পরিস্থিতি বহুবার নাটকীয়ভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। অভিযানের শুরুর দিকে রুশ বাহিনীর আগ্রাসী রূপ ও দাপট সবচেয়ে বেশি থাকলেও, ২০২২ সালের শরৎকালের মধ্যেই কিয়েভ পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে শত্রুবাহিনীর দখল থেকে প্রচুর এলাকা পুনরুদ্ধার করে। ইউক্রেনীয় বাহিনীর এই অভাবনীয় অগ্রগতি ঠেকাতে খোদ পুতিন শেষ পর্যন্ত পারমাণবিক অস্ত্র প্রয়োগ করতে পারেন কি না, সেই আতঙ্ক তখন গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল ওয়াশিংটন করণিকদের মনে।
পরবর্তী সময়ে এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী এক স্থবিরতার রূপ নেয়, যার ধারাবাহিকতা বজায় ছিল গত বসন্তকাল পর্যন্ত। ঠিক সেই সময় কিয়েভ এমন কিছু আধুনিক অস্ত্রের সমাহার ঘটায় যা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে দেয়; যার মধ্যে ছিল রাশিয়ার মূল ভূখণ্ডের গভীরে আঘাত হানার উপযোগী দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, পূর্ব ইউক্রেনে রুশ রসদ সরবরাহের পথ গুঁড়িয়ে দেওয়ার মতো মাঝারি পাল্লার ড্রোন এবং ইউক্রেনীয় শহরগুলোতে শত্রুর হামলা প্রতিহত করার উপযুক্ত ইন্টারসেপ্টর ড্রোন।
রণক্ষেত্রের সামনের সারিতে রুশ সেনারা যখন আর কোনোভাবেই এগোতে পারছিল না, ঠিক তখন ইউক্রেনীয় বাহিনী ধীরে ধীরে নিজেদের ভূখণ্ড শত্রুমুক্ত করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিল। এমন এক পরিস্থিতিতে ট্রাম্পকে ঘিরে পুতিনের বহু পুরনো ছকগুলো নতুন করে কার্যকর হতে শুরু করে। কোনো তাৎক্ষণিক বা ক্ষণস্থায়ী উদ্দেশ্যে নয়, বরং কেজিবি বাহিনীর সুপ্রাচীন সেই নীতি অনুযায়ী এই পরিকল্পনা হয়েছিল যে ক্রেমলিনের প্রভাব মার্কিন নেতার ওপর বজায় থাকলে তা কোনো একদিন বড় কোনো উপকারে আসবে। আর বর্তমান সময়ে এসে সেই দীর্ঘ প্রতীক্ষার কাঙ্ক্ষিত দিনটিই হাজির হয়েছে।
মার্কিন প্রশাসনের বর্তমান ভূমিকা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে মস্কোর পালে নতুন করে হাওয়া দিয়েছে। রণক্ষেত্রে নিজেদের অগ্রযাত্রায় বড় ধরনের ধাক্কা খাওয়ার পর পুতিন এখন সাধারণ মানুষ এবং তাদের জীবনধারণের মৌলিক অবকাঠামো ধ্বংস করার নীতি গ্রহণ করেছেন। বিশেষ করে বিদ্যুৎ ও পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর ধারাবাহিক রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়ে ইউক্রেনীয় সমাজে প্রবল আতঙ্ক ছড়িয়ে দেওয়ার কৌশল নিয়েছেন তিনি।
অসহনীয় কষ্টের মুখে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে উঠলে তারা নিজেরাই প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে পুতিনের কাছে আত্মসমর্পণ করার জন্য প্রবল চাপ সৃষ্টি করবে—এমনটাই মূল ভাবনা রুশ প্রশাসনের। রাশিয়ার ঝুলিতে থাকা বিপুল পরিমাণ সৈন্যবাহিনী, বিশাল সামরিক উৎপাদন সক্ষমতা এবং বেশ কিছু ধ্বংসাত্মক উন্নত অস্ত্র থাকার কারণে পুতিনের মনে এই দৃঢ় বিশ্বাসের জন্ম হয়েছে যে, যুদ্ধ দৃশ্যত স্থবির মনে হলেও তিনি এই লড়াই দীর্ঘসময় চালিয়ে যেতে পারবেন।
আমেরিকান প্রেসিডেন্টের সরাসরি সমর্থন পুতিনের এই প্রত্যয়কে আরও বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে যে, সময় পুরোপুরি তাঁর পক্ষেই কাজ করছে। বিগত মাত্র কয়েক সপ্তাহ ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগীরা মস্কোর প্রতি সহযোগিতার মাত্রা আরও দৃশ্যমানভাবে বাড়িয়ে দিয়েছেন। এর মধ্যে রয়েছে নানামুখী নিষেধাজ্ঞা স্থগিত করা, রাশিয়ার ডিজেল উন্মুক্তভাবে ক্রয় করা, ইউক্রেনের গুরুত্বপূর্ণ ‘স্টারলিংক’ ও ‘স্টারশিল্ড’ যোগাযোগ নেটওয়ার্কের সুবিধা ব্যাহত করা এবং খোদ জেলেনস্কিকে অবিলম্বে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার জন্য তীব্র চাপ প্রয়োগ করা।
ইউক্রেনীয় নেতা ভলোদিমির জেলেনস্কি এই পরিস্থিতি নিয়ে একথাই স্পষ্ট করে বলেছেন যে, আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কেউ কেউ যখন ক্রেমলিনের ওপর থেকে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমিয়ে দেন, তখন পুতিনের মনে এই বিশ্বাসের জন্ম হয় যে তিনি তাঁর চূড়ান্ত লক্ষ্য অর্জনের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছেন। ট্রাম্পকে কেন্দ্র করে পুতিনের এই সুদূর প্রসারী ছক আঁকার ইতিহাস আজকের নয়, বরং এর সূচনা হয়েছিল বহু বছর আগে।
আমেরিকার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ট্রাম্প প্রেসিডেন্ট পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার দীর্ঘ সময় আগেই পুতিনের অত্যন্ত আস্থাভাজন রুশ ব্যক্তিরা এই আমেরিকান আবাসন ব্যবসায়ীর সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য নানা তৎপরতা শুরু করেছিলেন। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ঘটনাটি ঘটেছিল ২০১৩ সালে মস্কোর মাটিতে, যেখানে ট্রাম্পের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় জাঁকজমকপূর্ণ ‘মিস ইউনিভার্স’ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়েছিল এবং সেই আয়োজনে ট্রাম্পের সঙ্গী হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রভাবশালী রুশ ব্যক্তিত্ব এমিন ও আরাশ আগালারভ।
পরবর্তী সময়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মার্কিন নির্বাচনে বিজয়ী করতে এবং তাঁর প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী হিলারি ক্লিনটনকে শোচনীয়ভাবে পরাস্ত করতে ২০১৬ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এক নজিরবিহীন ও গোপন হস্তক্ষেপের পরিকল্পনা করেছিলেন রুশ প্রেসিডেন্ট। হিলারি ক্লিনটনের নির্বাচনী প্রচার শিবিরের অত্যন্ত গোপনীয় ই-মেইলগুলো চুরি করে জনসমক্ষে প্রকাশ করা এবং ট্রাম্পের পক্ষে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রবল প্রচারের ঝড় তোলা ২০১৬ সালের ভোটের ফলাফলকে ঠিক কতখানি প্রভাবিত করেছিল, তা হয়তো নিশ্চিত করে বলা অসম্ভব। তবে পুতিন যে সেই সময়ে আমেরিকান নির্বাচনের ফলাফল সম্পূর্ণ বদলে দেওয়ার সুনির্দিষ্ট চেষ্টা চালাচ্ছিলেন, সে বিষয়ে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।
এর ধারাবাহিকতায় ২০১৭ সালে ট্রাম্পের ক্ষমতার পালাবদলের পর পুতিনের এই বিশাল রাজনৈতিক বিনিয়োগ কূটনৈতিক অঙ্গনে ধীরে ধীরে সুফল দিতে শুরু করে। সেই সময় জনসমক্ষে রুশ একনায়কের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হতে দেখা যায় ডোনাল্ড ট্রাম্পকে এবং তিনি রুশ নেতার প্রতি নিজের গভীর মুগ্ধতাও অকপটে প্রকাশ করেছিলেন।
যদিও ট্রাম্পের প্রথম শাসন মেয়াদে পুতিনের প্রতি তাঁর এই প্রকাশ্য প্রশংসাসূচক ও বন্দনামূলক মনোভাব মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সার্বিক বৈদেশিক নীতিতে খুব একটা বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে পারেনি। এর মূল কারণ ছিল তৎকালীন সময়ে ট্রাম্পের জাতীয় নিরাপত্তা দলের শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা তাঁকে পুরোপুরি রাশিয়াঘেঁষা কোনো একপেশে নীতি গ্রহণ করা থেকে বিরত রেখেছিলেন।
পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দ্বিতীয় মেয়াদে পুনরায় মার্কিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন, তখন ক্রেমলিনের দীর্ঘদিনের এই চেষ্টার প্রকৃত ও বাস্তব সুফল মিলতে শুরু করে। যার সবথেকে বড় এবং ধ্বংসাত্মক প্রভাবটি সরাসরি গিয়ে পড়ে ইউক্রেনের ওপর, কারণ এর মাধ্যমেই আমেরিকার পক্ষ থেকে ইউক্রেনকে দেওয়া সমস্ত প্রত্যক্ষ সামরিক ও অর্থনৈতিক সাহায্য চিরতরে বন্ধ হয়ে যায়। অথচ এর আগে খোদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রই ছিল ইউক্রেনের সবচেয়ে বড় ও নির্ভরযোগ্য সমর্থক রাষ্ট্র।
ওয়াশিংটনের অন্যান্য নীতিগত পদক্ষেপগুলোও ইউক্রেনকে ক্রমান্বয়ে দুর্বল করেছে এবং একচ্ছত্রভাবে রাশিয়াকে লাভবান করেছে। ট্রাম্প ইতিমধ্যে অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইউক্রেন কোনো অবস্থাতেই ভবিষ্যতে ন্যাটো জোটে যোগ দিতে পারবে না। বিগত বছর আলাস্কায় অনুষ্ঠিত এক বিশেষ সম্মেলনে তিনি পুতিনকে উষ্ণ লালগালিচা সংবর্ধনা জানান, যেখানে দুই দেশের প্রেসিডেন্ট একসঙ্গে বসে ইউক্রেনকে পূর্ব দনবাসের অবশিষ্ট অংশটুকুও পুরোপুরি ছেড়ে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করার বিষয়ে নানা গোপন আলোচনা করেছিলেন—যে অঞ্চলটি পুতিন সুদূর ২০১৪ সাল থেকে জোরপূর্বক দখলের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
অবশ্য পুতিনেরও এটি ভালোভাবেই অনুধাবন করা উচিত যে, মার্কিন নেতার সঙ্গে সম্পর্কের এই বিশেষ সুবিধার দিনগুলো খুব বেশি দীর্ঘস্থায়ী নাও হতে পারে। ভবিষ্যতের যেকোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট—তিনি ডেমোক্র্যাট কিংবা রিপাবলিকান যে দলেরই অনুসারী হোন না কেন—ট্রাম্পের এই অতিমাত্রিক ও একপেশে রাশিয়া নীতি কখনোই দীর্ঘমেয়াদে অব্যাহত রাখবেন না।
এর আগে বিভিন্ন সময়ে ট্রাম্প প্রকাশ্যে ইউক্রেনীয় প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কিকে অত্যন্ত অসম্মানজনক ভাষায় আক্রমণ করেছেন এবং সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনাটি সংঘটিত হয়েছিল ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে। সেই বৈঠকে জেলেনস্কির কথা হঠাৎ থামিয়ে দিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট অত্যন্ত চড়া গলায় চিৎকার করে বলেছিলেন, ‘আপনারা এই যুদ্ধে কোনোভাবেই জয়ী হতে পারছেন না... আপনাদের হাতে জেতার মতো কোনো তুরুপের তাস নেই।’
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে ডোনাল্ড ট্রাম্প রুশ আগ্রাসনকে টিকিয়ে রাখতে মস্কোর পক্ষে সহায়তার হাত আরও প্রসারিত করেছেন। তিনি রাশিয়ার ডিজেল রপ্তানির ওপর থেকে সমস্ত নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, যা যুদ্ধ পরিচালনার জন্য মস্কোকে নতুন করে শত শত কোটি ডলারের আর্থিক জোগানের ব্যবস্থা করে দিচ্ছে।
আর এসবের মধ্যে সবচেয়ে মারাত্মক ও উদ্বেগের বিষয় হলো, স্পেসএক্সের সরবরাহ করা ‘স্টারলিংক’ এবং ‘স্টারশিল্ড’-এর মতো আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করতে গিয়ে বর্তমানে পদে পদে নানা বাধার সম্মুখীন হচ্ছে ইউক্রেন। উল্লেখ্য যে, এই স্পেসএক্স প্রতিষ্ঠানটি ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক সমর্থক, তাঁর পরম মিত্র এবং বিগত প্রশাসনের প্রাক্তন কর্মকর্তা ইলন মাস্কের মালিকানাধীন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।