
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আধুনিক যুগে এসে যন্ত্রের অভাবনীয় বুদ্ধিবৃত্তিক উৎকর্ষ মানবসমাজকে এক মারাত্মক মানসিক ও সাংস্কৃতিক বিপদের মুখে এনে ফেলেছে। আমরা যদি নিজেদের উদ্ভাবিত প্রযুক্তির গতির সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে নির্বাক দর্শকের ভূমিকা পালন করি, তবে তা আমাদের প্রজাতিকে সম্পূর্ণ নিষ্ক্রিয়তা এবং হীনম্মন্যতার অন্ধকারে নিমজ্জিত করবে। যে জনপদে মানুষের বুদ্ধিবৃত্তিক সাধনা ও মননশীলতার কোনো কদর থাকে না, সে জনপদ অবধারিতভাবে একসময় প্রাণহীন ও যান্ত্রিক রূপ ধারণ করে। ব্যক্তি যদি নিজের মনন এবং বুদ্ধির ওপর থেকে সমস্ত বিশ্বাস হারিয়ে ফেলে, তবে চারপাশের পৃথিবী সম্পূর্ণ স্থবির হয়ে পড়বে এবং গভীর এক জড়তা নেমে আসবে।
তবে এই আকস্মিক ধাক্কা কি আমাদের পুরো সভ্যতার ধ্বংসের সূচনা, নাকি চিন্তাধারা পরিবর্তনের এক অপরিহার্য ডাক? অতীতের প্রতিটি বড় ঐতিহাসিক পরিবর্তনের মোড়েই নতুন প্রযুক্তি মানুষের সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ নতুন আকার দিয়েছে। অতীতে যখন ছাপার যন্ত্রের কল্যাণে না বুঝে মুখস্থ করার প্রাচীন প্রথার অবসান ঘটেছিল, কিংবা আলোকচিত্রীর আবির্ভাবের ফলে চিত্রশিল্পের চিরাচরিত সংজ্ঞা বদলে গিয়েছিল, তখনো মানুষ শুরুতে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তারা নতুন এই অগ্রগতির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়েছিল। একইভাবে, হিসাব-নিকাশ ও যুক্তির ময়দানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই একচ্ছত্র আধিপত্য সম্ভবত আমাদের শেখাবে যে, কেবল সঠিক সমাধান খুঁজে পাওয়াই জ্ঞানের শেষ কথা নয়; বরং সেই উত্তর অর্জনের দীর্ঘ ও কঠিন পথ এবং তার ভেতরের মানবীয় অনুভূতিগুলোকে তীব্রভাবে অনুধাবন করাই আসল।
বুদ্ধিমান যন্ত্র হয়তো পলক ফেলতে না ফেলতেই অত্যন্ত জটিল সব সূত্রের জট ছাড়িয়ে দিতে পারে, কিন্তু ওই সূত্রের গভীরে প্রোথিত মূল সৌন্দর্যটুকু কেবল মানুষের পক্ষেই অনুভব করা সম্ভব। একটি গাণিতিক সমীকরণ শুধুমাত্র কিছু সংখ্যার হিসাব-নিকাশ নয়, এর অন্তরালে লুকিয়ে থাকে সৃষ্টির রহস্য উন্মোচন করার এক প্রাচীন ও গভীর আনন্দ। প্রযুক্তির মেধা হয়তো নিখুঁত ফলাফল এনে হাজির করতে পারে, কিন্তু সেই ফলাফলের সামনে দাঁড়িয়ে বিস্মিত হওয়ার অনুভূতি কিংবা বিজয়ের উল্লাস উপলব্ধি করার কোনো ক্ষমতা তার নেই।
বিজ্ঞানী ফেদারিকো ফাজিনের মানবচেতনার অদ্বিতীয়তা কিংবা জ্যাকব ব্রনোওস্কির জ্ঞান ও কল্পনার পরিধি বাড়ানোর দর্শন আমাদের বারবার এই কথাই স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রযুক্তির এই অভূতপূর্ব সাফল্যকে যদি আমরা যন্ত্রের কাছে মানুষের পরাজয় হিসেবে ধরে নিই, তবে এই সাংস্কৃতিক ধাক্কা নিঃসন্দেহে আমাদের মননশীল দিক থেকে অক্ষম করে তুলবে। কিন্তু আমরা যদি এই আধুনিক সময়কে মানব মনের পরিধি বাড়ানোর এক দারুণ সহায়ক শক্তি হিসেবে গ্রহণ করি, যেখানে যন্ত্র ক্লান্তিহীনভাবে কঠিন গাণিতিক গবেষণা চালিয়ে যাবে, আর মানুষ তার সৃজনশীলতা দিয়ে তৈরি করবে তার দার্শনিক ও মানবিক দ্যোতনার জাদুকরী বিন্যাস, তবেই কেবল এই সম্ভাব্য সংকট এক নতুন সাংস্কৃতিক পুনর্জন্মের রূপ লাভ করতে পারে।
মানবসভ্যতা আজ এক অভূতপূর্ব ও সংকটময় সংযোগস্থলে এসে উপনীত হয়েছে। কার্ল সাগান যেমন প্রায়ই বলতেন যে, আমরা এই বিশাল মহাবিশ্বেরই একটা অংশ, যে মহাবিশ্ব স্বয়ং নিজেকে জানার জন্যই মানুষকে মাধ্যম হিসেবে বেছে নিয়েছে। অন্যদিকে ফ্রাঙ্ক ড্রেক, যার মহাজাগতিক বুদ্ধিমত্তার সমীকরণ কিংবা লর্ড মার্টিন রিজের মানুষ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার পাশাপাশি টিকে থাকার তত্ত্ব আমাদের আজ নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে যে, যখন যন্ত্র ধীরে ধীরে প্রজ্ঞার আসনে বসছে, তখন মানুষকে তার আসল পরিচয় নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। সে কি কেবল তথ্য প্রক্রিয়াজাত করার এক জৈবিক যন্ত্র মাত্র, নাকি অনুভূতি, বিস্ময় ও সাধনায় ভরপুর এক মহাজাগতিক সত্তা?
আমাদের সাংস্কৃতিক টিকে থাকাটা এখন আর কেবল মেধা বা বুদ্ধির একচ্ছত্র ক্ষমতার ওপর নির্ভর করছে না; বরং তা পুরোপুরি নির্ভর করছে আমরা কীভাবে এই যান্ত্রিক বুদ্ধিমত্তাকে মানবিক মূল্যবোধগুলোর সঙ্গে মেলাতে পারছি তার ওপর। মার্টিন রিজের সাবধানবাণী অনুযায়ী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা হয়তো আমাদের অস্তিত্বের হিসাব-নিকাশলিপিকে বদলে দিচ্ছে, কিন্তু কার্ল সাগানের কথানুসারে, আমরা যদি নিজেদের অস্তিত্ব হারিয়ে না ফেলি, তবে প্রযুক্তি যতই উৎকর্ষ লাভ করুক না কেন, জীবনের আসল অর্থ খুঁজে পাওয়ার এবং মহাবিশ্বকে ভালোবেসে যাওয়ার যে তীব্র বাসনা, তা শেষ পর্যন্ত মানুষের নিজস্ব অর্জন হিসেবেই টিকে থাকবে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা