
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
একনায়কসুলভ শাসনব্যবস্থায় বিচারালয় ও আইনের মূল কাজগুলোর একটি হলো বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর শাসনকে বৈধতা দেওয়া। এই লক্ষ্য অর্জনের একটি কার্যকর পথ হলো দেশের স্পর্শকাতর ও প্রধান রাজনৈতিক সংঘাতগুলো নিষ্পত্তির দায়িত্ব আদালতের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। তাত্ত্বিকগণ এই বিশেষ প্রবণতাকে অভিহিত করেছেন 'রাজনীতির বিচারিকীকরণ' হিসেবে। এই বিশেষ কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে একধরনের 'রাজনৈতিক আদালত'-এর জন্ম হয় এবং এর ফলে সমগ্র রাজনৈতিক অঙ্গন গভীরভাবে বিভক্ত হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রক্ষমতা টিকিয়ে রাখা, বৈধতা অর্জন কিংবা বড় ধরনের কাঠামোগো সংস্কারের যেকোনো জটিল প্রশ্ন সরকার নিজের ঘাড়ে না নিয়ে আদালতের মাধ্যমে সমাধান করিয়ে নেয়। অর্থ বরাদ্দ, বিচারক নিয়োগ ও তাদের পদোন্নতির বিষয়গুলো নির্বাহী বিভাগের সরাসরি কর্তৃত্বে রেখে, সুপ্রিম কোর্টের বেঞ্চ নতুন করে সাজিয়ে কিংবা অবসর গ্রহণের পরবর্তী সময়ে লোভনীয় পদের প্রলোভন দেখিয়ে বিচার বিভাগকে সব সময় অনুগত ও পরাধীন করে রাখা হয়। এর পরিণামেই জন্ম নেয় 'বিচারব্যবস্থার রাজনীতিকরণ'।
এই দুই বিপরীতমুখী অথচ পরিপূরক প্রক্রিয়ার মিথস্ক্রিয়ার ফলে আরও একটি লক্ষণীয় বিষয় অত্যন্ত স্পষ্ট হয়ে ওঠে। রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভিন্ন আইনি পরিভাষা, বাগাড়ম্বর, নানা বিধিবিধান এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলোর মাত্রাতিরিক্ত বিস্তার ঘটে। এমনকি দেশের নীতি প্রণয়নের পুরো ব্যবস্থাটিও ধীরে ধীরে আধা-বিচারিক নিয়মকানুন ও কাঠামোর ভেতর রূপান্তরিত হতে শুরু করে।
আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে বিচারিকীকরণের নানা দিক নিয়ে কিছু আলোচনা হলেও এর পেছনের যে মূল চালিকাশক্তিটি এখনো পুরোপুরি চিহ্নিত করা হয়নি, তা হলো বিচার বিভাগের 'কৌশলগত দলবদল'। এর সহজ অর্থ হলো, রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা শাসকগোষ্ঠীর প্রণয়ন করা কোনো সাংবিধানিক সংশোধনীতে সাধারণত বিচারকেরা সরাসরি হাত দেন না, বিষয়গুলো এড়িয়ে যান কিংবা প্রয়োজনের খা্তেরে সেগুলোকে আইনি বৈধতা দান করেন। বিগত ত্রিশ বছরের বিভিন্ন তুলনামূলক গবেষণা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিচার বিভাগের সদস্যরা সাধারণত যেকোনো রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গেই নিজেদের খুব সহজে মানিয়ে নিতে পারেন। তারা নিজেদের ক্ষমতার পরিধি এবং নির্দিষ্ট সীমানা সম্পর্কে পুরোপুরি সচেতন থাকেন এবং ক্ষমতাসীনদের সম্ভাব্য রাজনৈতিক পতনের মুহূর্তটির জন্য ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেন।
কর্তৃত্ববাদী শাসনকালের দীর্ঘ ছায়ায় আদালত যখন শাসকদের হাতের পুতুলে পরিণত হন, তখন এই পূর্বনির্ধারিত ধারণাটি বিচারকদের মনে একধরনের অতিরিক্ত দায়মুক্তির অনুভূতি জন্ম দেয়। এর ফলে দেখা যায় যে, সংবিধানে ইচ্ছেমতো যত্রতত্র কাটাছেঁড়া করা কিংবা দেশে সামরিক শাসন জারি হওয়ার পরেও সংস্কারের মানসিকতা সম্পন্ন বিচারকেরা কখনো কখনো রাজনৈতিক সংস্কারের জন্য অত্যন্ত সূক্ষ্ম উপায়ে চাপ সৃষ্টি করেন। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে নির্বাহী বিভাগের বেপরোয়া স্বেচ্ছাচারের বিরুদ্ধে তারা প্রগতিশীল রুলও জারি করে থাকেন। তবে আইনের দৃষ্টিতে জুডিশিয়াল রিভিউর পূর্ণাঙ্গ ক্ষমতা হাতে থাকা সত্ত্বেও তারা কখনোই কোনো সামরিক আইন কিংবা জরুরি অবস্থাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে সাহসিকতাপূর্ণ কোনো রায় প্রদান করেন না।
কোনো কর্তৃত্ববাদী শাসন দীর্ঘায়িত হতে থাকলে বিচার বিভাগের সদস্যরা কৌশলী আচরণে অত্যন্ত পারদর্শী হয়ে ওঠেন এবং বর্তমান শাসকগোষ্ঠী দুর্বল হয়ে পড়ার অপেক্ষায় থাকেন। এর ফলে তারা ওপর থেকে ক্ষমতাসীনদের প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত বলে মনে হলেও, যখনই ওই শাসনের পতনের পথটি পুরোপুরি স্পষ্ট হয়ে ওঠে, তখনই তারা সেই রেজিমের মৌলিক স্বার্থগুলোকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করে বসেন।
আমাদের দেশের রাজনীতির বিচারিকীকরণের প্রধান ও অন্যতম ক্ষেত্র হলো সংবিধান সংশোধনের নানা রকম রাজনৈতিক মারপ্যাচ। বিচার বিভাগ কীভাবে রক্ষণশীল মনোভাব এবং কৌশলগত দলবদলের নীতি অনুসরণ করে ক্ষমতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে পথ চলেছিল, তার সঠিক সন্ধান পাওয়া যাবে সংবিধানের সংশোধনীগুলোর পেছনের মামলার পটভূমিগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে। এ পর্যন্ত আমাদের দেশে সংবিধান পরিবর্তন বা সংশোধন করা হয়েছে মোট সতেরো বার। এর মধ্যে উচ্চ আদালতের রায়ে সংশোধনী পুরোপুরি বাতিল হওয়ার ঘটনা ঘটেছে মোটে ছয়বার। একটি মাত্র ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাকি প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই সংশোধনীগুলো বাতিল করা হয়েছে ঠিক সেই সময়, যখন চলমান শাসনব্যবস্থা পতনের মুখে ছিল কিংবা তার অনেক পরে সম্পূর্ণ ভিন্ন কোনো সরকারের আমলে।
দেশের সংবিধানের মূল কাঠামোর প্রথম বড় ধরনের রদবদল করা হয়েছিল ১৯৭৫ সালের পঁচিশে জানুয়ারি চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে। এর ঠিক দুই সপ্তাহের মধ্যেই এই সংশোধনীটি আদালতের বিচারিক পর্যালোচনার পরিধিতে চলে আসে। সে সময়ের মূল বিচার্য বিষয় ছিল বাহাত্তরের সংবিধানের ১০২ নম্বর অনুচ্ছেদের বিধান অনুযায়ী হাইকোর্টের অন্তবর্তীকালীন আদেশ বা ইন্টেরিম অর্ডার দেওয়ার যে ক্ষমতা ছিল, তা চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে পুরোপুরি কেড়ে নেওয়া হয়েছে কি না। কিছুটা দ্বিধা ও জটিলতার ইঙ্গিত দিলেও বিচারপতি মুনীম এবং বিচারপতি সায়েমের পর্যবেক্ষণে মূলত 'জাতির পিতার দ্বিতীয় বিপ্লব'-এর নীতির প্রতি সমর্থনের সুরই স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল। কিন্তু ওই শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ার বেশ কিছুদিন পর, ১৯৮১ সালে হাইকোর্ট নিজেই এই সত্য স্বীকার করে নেন যে, চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের মূল কাঠামোটিকে এমনভাবে ধ্বংস করা হয়েছিল যে এটিকে আর আগের সংবিধান বলে চেনাই সম্ভব ছিল না।
পাকিস্তানের সাবেক প্রধান বিচারপতি মুনীরের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্টের বিচারকেরা সে দেশের সামরিক শাসনকে আইনি বৈধতা দিতে ব্যবহার করেছিলেন 'ডকট্রিন অব নেসেসিটি' বা প্রয়োজনের তত্ত্ব। আমাদের দেশের বিচারালয়েও সেই একই তত্ত্ব সর্বরোগ নিরাময়কারী এক মহৌষধ হিসেবে বারবার ঘুরেফিরে এসেছে। এমনকি চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পরবর্তী সময়েও রাষ্ট্র সংস্কার কিংবা পুনর্গঠনের পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থানকারী বহু প্রভাবশালী ব্যক্তিকে এই বিশেষ তত্ত্বটির যথেচ্ছ ব্যবহার করতে দেখা যাচ্ছে। ১৯৭৫ সালের পনেরোই আগস্ট ঘোষিত সামরিক শাসন বলবৎ ছিল ১৯৭৯ সালের নয়ই এপ্রিল পর্যন্ত। পরবর্তীতে পঞ্চম সংশোধনী জারি করে বিগত দিনে জারি করা সব সামরিক ফরমান ও নানামুখী কার্যক্রমকে সম্পূর্ণ বৈধতা দেওয়া হয়। বিভিন্ন মামলার শুনানিতে বারবার সামরিক শাসনের বিষয়টি আদালতের সামনে চলে আসে। আদালত যথারীতি তাদের রক্ষণশীলতার বর্ম গায়ে জড়িয়ে জানিয়ে দেয় যে, সামরিক শাসন হলো আইনবিজ্ঞানের একটি 'পরিচিত ধারণা'; এটি মূলত 'সাধারণ আইনের আওতার বাইরে কিছু সংশোধনমূলক বা সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণের স্বার্থে' জারি করা হয়ে থাকে, কিংবা আদালতের 'সুপারভাইজরি ক্ষমতা' সামরিক আইনের কারণে 'সম্পূর্ণভাবে বাতিল' হয়ে যায়।
পরবর্তীতে ২০১০ সালে আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনীকে অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের দেওয়া পূর্ববর্তী রায়টি বহাল রাখেন। সরকারি ও বেসরকারি প্রচার মাধ্যমগুলোতে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে উদযাপিত এই 'ঐতিহাসিক রায়ে'র মাধ্যমে প্রধান বিরোধী দল বিএনপির রাজনৈতিক বৈধতাকে সম্পূর্ণ প্রশ্নবিদ্ধ করার এক বিশাল রাজনৈতিক পুঁজি অর্জন করেছিল সে সময়ের ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ।
হাসিনাশাহির সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকা আদালত জিয়াউর রহমানকে একজন 'ক্ষমতা-দখলকারী' হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু জিয়াউর রহমানের ক্ষমতার এই বেসামরিকীকরণের প্রক্রিয়ার পেছনেও বিচার বিভাগের সুনির্দিষ্ট ভূমিকা ও অংশীদারত্ব রয়েছে। বাংলাদেশ আর্মি রেগুলেশনের ভলিউম ওয়ান রুলস অনুসারে, সামরিক বাহিনীর কোনো সদস্যই সাধারণ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না—এই মর্মে প্রধান সামরিক শাসক ও সেনাপ্রধান জিয়াউর রহমানের রাষ্ট্রপতি পদে দাখিল করা মনোনয়নপত্রের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে একটি রিট করা হয়েছিল। কিন্তু আদালত সেই চ্যালেঞ্জ সরাসরি খারিজ করে দেন।
২০০৫ সালে বিচারপতি খায়রুল হক ও বিচারপতি ফজলে কবীরের গড়া হাইকোর্ট বেঞ্চ যখন ১৯৭৫ থেকে ১৯৭৯ সালের সময়কালের সামরিক শাসনকে বৈধতা দানকারী পঞ্চম সংশোধনীটি অবৈধ ঘোষণা করেন, ঠিক তত দিনে বিচার বিভাগে প্রধান বিচারপতির সঙ্গে পরামর্শ করার দীর্ঘদিনের প্রতিষ্ঠিত প্রথা পুরোপুরি ভেঙে ফেলা হয়েছে। অতিরিক্ত বিচারক নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়াটিকে দলীয় লোক ঢোকানোর প্রধান প্রবেশদ্বার বানানো হয়েছে এবং রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের বিচারকে কেন্দ্র করে বিচার বিভাগের চরম দলীয়করণ স্থায়ী রূপ লাভ করেছে। ২০১০ সালে আপিল বিভাগ পঞ্চম সংশোধনী অবৈধ ঘোষণা করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখার পর, দলীয় প্রচারযন্ত্রের কল্যাণে সরকারি দল রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করে।
পরবর্তীতে ২০০৭ সালের এগারোই জানুয়ারি সেনা সমর্থিত একটি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে দেশে জরুরি অবস্থা জারি করে। বিচার বিভাগ পৃথক্করণের সাংবিধানিক প্রতিশ্রুতি কেবল আংশিক বাস্তবায়নের মাধ্যমেই উচ্চ আদালতের নিঃশর্ত আনুগত্য সম্পূর্ণভাবে নিজেদের পক্ষে অর্জন করে নেয় এই সরকার।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।