
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মার্কিন রাজনীতিতে বড় ধরনের ক্ষমতার পালাবদল ঘটে মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে। রিপাবলিকান পার্টির বেশ কয়েকটি দুর্ভেদ্য ঘাঁটি ভেঙে চুরমার করে দিয়ে মার্কিন সিনেটের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় পুরে নিয়েছে ডেমোক্র্যাটরা। এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলে ওয়াশিংটনে ক্ষমতাসীন রিপাবলিকানদের একচ্ছত্র আধিপত্য বা 'ট্রাইফেক্টা'র অবসান ঘটার পথ তৈরি হলো। ২০২৪ সালের নির্বাচনে জয় পাওয়ার সুবাদে রিপাবলিকানরা হোয়াইট হাউসের প্রেসিডেন্ট পদ থেকে শুরু করে কংগ্রেসের উচ্চকক্ষ সিনেট ও নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ—এই তিনটি প্রধান ক্ষমতার কেন্দ্রই নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল।
গুরুত্বপূর্ণ এই নির্বাচনী লড়াইয়ে ওহাইও অঙ্গরাজ্যে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী শেরউড ব্রাউন পরাস্ত করেছেন ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী সিনেটর জন হাস্টেডকে। এর ফলে দীর্ঘদিনের আসনটি হাতছাড়া হয়ে গেছে রিপাবলিকানদের। অন্যদিকে কানসাসেও ঘটেছে বিশাল অঘটন; সেখানে মেগাচার্চের যাজক ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থী অ্যাডাম হ্যামিলটন হারিয়ে দিয়েছেন রিপাবলিকান সিনেটর রজার মার্শালকে। কানসাস সাধারণত রক্ষণশীলদের নিরাপদ দুর্গ হিসেবে পরিচিত ছিল এবং রাজ্যটিতে সর্বশেষ ১৯৩২ সালে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী সিনেটর হিসেবে জয়লাভ করার ইতিহাস গড়েছিলেন।
শুধু নতুন আসন দখল হওয়াই নয়, এর পাশাপাশি নিজেদের শক্ত অবস্থানে থাকা বেশ কিছু আসন অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে ধরে রাখতে সমর্থ হয়েছে ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। এর মধ্যে রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত সংবেদনশীল বা সুইং স্টেট খ্যাত জর্জিয়ায় দলের প্রার্থী জন অসফ পুনরায় বিজয়ী হয়ে নিজের আসন নিশ্চিত করেছেন। এছাড়া ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যে দীর্ঘ ১৭ বছর ধরে অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে সিনেট দায়িত্ব পালন করে আসা অভিজ্ঞ মার্ক ওয়ার্নারও নিজের আসনটি অক্ষত রাখতে সক্ষম হয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রতিনিধি পরিষদের তুলনায় সিনেটের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের পকেটে পুরে নেওয়া ছিল বেশ কঠিন একটি চ্যালেঞ্জ। এর মূল কারণ হলো মার্কিন কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সদস্যদের মেয়াদ দুই বছর হলেও, সিনেটরদের মেয়াদ দীর্ঘ ছয় বছর নির্ধারিত থাকে। তাছাড়া সিনেটের নির্বাচনগুলো সবসময় পর্যায়ক্রমে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই কাঠামোগত নিয়মের কারণে প্রতিটি নির্বাচনী চক্রে উচ্চকক্ষের মোট আসনের কেবল এক-তৃতীয়াংশ আসনে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হওয়ার সুযোগ থাকে।
এবারের মধ্যবর্তী এই নির্বাচনী লড়াইয়ে সিনেটের মোট ৩৫টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে নিয়মিত ভোটের সংখ্যা ছিল ৩৩টি এবং বাকি দুটি ছিল ওহাইও ও ফ্লোরিডার বিশেষ নির্বাচন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদের প্রশাসনে দায়িত্ব নেওয়ার আমন্ত্রণে তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও নিজেদের সিনেটর পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন। তাদের ছেড়ে যাওয়া এই দুটি শূন্য আসনে বাধ্য হয়েই বিশেষ নির্বাচন আয়োজন করতে হয়েছিল।
মঙ্গলবারে অনুষ্ঠিত এই নির্বাচনে অন্তত সাতটি ভিন্ন সিনেট আসনে চরম প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্ণ সম্ভাবনা আগে থেকেই ছিল। আলাস্কা, আইওয়া, কানসাস, মেইন, ওহাইও, টেক্সাস এবং মিশিগান—এই রাজ্যগুলোতে তীব্র লড়াইয়ের আভাস মিলেছিল। এর মধ্যে টেক্সাস ও কানসাস প্রথাগতভাবে কখনোই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনী এলাকার তালিকায় সাধারণত থাকে না, কারণ এই অঞ্চলগুলো দীর্ঘদিন ধরেই রিপাবলিকানদের অত্যন্ত শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য রাজনৈতিক ঘাঁটি হিসেবে সুপরিচিত।
বিদায়ী ১১৯তম কংগ্রেসের সার্বিক চিত্র অনুযায়ী ১০০ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ সিনেটে বর্তমানে ৫৩টি আসন রয়েছে রিপাবলিকানদের দখলে। বিপরীতে ডেমোক্র্যাটদের হাতে রয়েছে ৪৫টি আসন এবং তাদের সঙ্গে একই ককাসে যুক্ত রয়েছেন দুজন স্বতন্ত্র সিনেটর। মঙ্গলবারের এই নির্বাচনের চূড়ান্ত ফলাফল আসার পর স্বাভাবিকভাবেই উচ্চকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ চলে যাচ্ছে ডেমোক্র্যাটদের সুনির্দিষ্টহাতে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা