
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মানুষ কখনো চিরতরে হারিয়ে যায় না, কেবল তাদের ঠিকানা বদলে যায়—এমন একটি কথা অতীতে বলা হয়েছিল। সেই কথার পর বহু বছর অতিক্রান্ত হয়েছে, যেখানে শহুরে রূপ পরিবর্তন ঘটেছে, রাস্তার নামের পটপরিবর্তন হয়েছে এবং প্রাচীন বাসগৃহের দেওয়ালে নতুন রঙের আস্তরণ পড়েছে; কিন্তু স্মৃতির অন্তরালে সেই বিশেষ মানুষকে স্মরণ করার প্রবণতা আজও অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
প্রতিদিন গোধূলি লগ্নে বারান্দার জানালার পাশে এসে দাঁড়ালে এবং দূরবর্তী রাজপথে কোনো পথচারীকে হেঁটে যেতে দেখলে মনের অজান্তে প্রতীক্ষা জাগে, এই বুঝি সেই পরিচিত মানুষটি উপস্থিত হলো। দৃশ্যটি বড্ড অদ্ভুত মনে হয়, কারণ যে মানুষটিকে বাস্তবে আর কখনো চাক্ষুষ করা সম্ভব নয়, তাকেই দৃষ্টির ভ্রমে প্রতিনিয়ত খুঁজে বেড়ানো হয়।
প্রিয় মানুষটির উদ্দেশে জমিয়ে রাখা পত্রগুলো এখন আর সাধারণ কোনো চিঠি নেই, সেগুলো রূপান্তরিত হয়েছে অতীত সময়ের শুষ্ক পত্ররাশিতে। একে একে সেই পাতাগুলো উন্মোচন করলে তার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে জমানো কথামালা, পূর্ণতা না পাওয়া গোধূলি বেলা, বারিধারায় সিক্ত একটি মাত্র ছত্র এবং পাশাপাশি পদচারণের ক্ষুদ্র একটি মধুর স্মৃতি।
সব বিচ্ছেদ যে শব্দ করে আসে না, তা উপলব্ধি করা যায়; কিছু প্রস্থান অতি নিভৃতে সম্পন্ন হয়, যেখানে ক্রমান্বয়ে বাক্যালাপ হ্রাস পায়, এরপর সাক্ষাতের পরিমাণ কমে যায় এবং একসময় সেই মানুষটি নিজস্ব স্মৃতির কাছেও সম্পূর্ণ অপরিচিত হয়ে দাঁড়ায়। তা সত্ত্বেও সেই প্রিয়জনের প্রতি কোনো ক্ষোভ পোষণ করা হয় না, কারণ নদীকে যেমন কখনো প্রশ্ন করা চলে না যে সে কেন দুই তটভূমি ত্যাগ করে মোহনার দিকে ধাবিত হলো।
ঠিক একইভাবে কোনো পক্ষীকেও কি কখনো জিজ্ঞাসা করা যায় যে সে কেন পূর্বপরিচিত শাখা ত্যাগ করে সম্পূর্ণ অজানা কোনো গগন বেছে নিল? মানবজীবনও সম্ভবত ঠিক তেমনি, যেখানে কখনো কখনো গভীর ভালোবাসা থাকা সত্ত্বেও বহুদূরে চলে যেতে হয়। কেবল প্রস্থান করার পূর্বে যদি একটিবার পেছনের দিকে দৃষ্টিপাত করা হতো, তবে হয়তো হৃদয়ের এই তীব্র যন্ত্রণা এতটা প্রকট হতো না, কিন্তু সেই মানুষটি আর পেছন ফিরে তাকায়নি।
এই কারণে বর্তমানের প্রতিটি গোধূলি বেলা এখনও এক না-ফেরা মানুষের প্রতীক্ষায় প্রহর গুনে চলে, তবে এইবার আর কোনো অপেক্ষা করা হবে না। আজ সেই না-বলা স্মৃতির কপাটিকায় অন্তিম বারের মতো করাঘাত করে নিজের অস্তিত্বের কাছেই ফিরে আসা হচ্ছে। যা কিছু অতীতে অর্জিত হয়েছিল, তা স্মৃতির পাতায় অমর হয়ে থাকুক এবং যা চিরতরে হারিয়ে গেছে, তা এভাবেই হারিয়ে যাক।
জীবনের সব মানুষকে যে পুনরায় ফিরে পেতে হবে এমন কোনো নিয়ম নেই, বরং কিছু মানুষকে চিরতরে হারিয়ে ফেলার মাধ্যমেই উপলব্ধি করা সম্ভব হয় যে মানুষ অতীতে কতটা সজীব ও প্রাণবন্ত ছিল। পরবর্তীতে যদি কোনো অজানা জনপদের রাজপথে হঠাৎ করে অতীতদিনের সেই মানুষটির কথা মনে পড়ে যায়, তবে ক্ষণিকের জন্যও থমকে দাঁড়ানোর প্রয়োজন নেই।
বরং কেবল মহাশূন্যের দিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে উচ্চারণ করতে হবে যে, এমন একজন মানুষ অতীতে ছিল, যে তাকে হারিয়ে ফেলার পরেও বিন্দুমাত্র অভিযোগের সুর তোলেনি। এরপর নিজের গন্তব্যে প্রস্থান করতে হবে, কারণ আর কখনো সেই মানুষটিকে আহ্বান জানানো হবে না।
কারণ দুনিয়ার কিছু ভালোবাসা কোনো কিছু প্রাপ্তির আশায় জন্মায় না, বরং সাধারণ মানুষকে আরও কিছুটা বেশি মানবিক করে তোলার মাঝেই তাদের প্রকৃত সার্থকতা নিহিত থাকে এবং তারা কেবল সেই শিক্ষাটি দিয়েই বিদায় নেয়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।