
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
টাঙ্গাইল শহরে তিন বছর বয়সী এক শিশুসন্তানকে সুপরিকল্পিতভাবে প্রাণনাশের অপরাধে তার সৎমাতাকে কঠোর সাজা প্রদান করেছেন বিচারক। অপরাধ প্রমাণিত হওয়ায় ওই নারী আসামিকে আমৃত্যু বা যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ডের আদেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি আদালত তাঁকে পঞ্চাশ হাজার টাকা আর্থিক দণ্ডে দণ্ডিত করেছেন এবং এই অর্থ পরিশোধে ব্যর্থ হলে অতিরিক্ত আরও এক বছরের কারাবাস ভোগ করতে হবে।
বুধবার টাঙ্গাইলের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক মো. হাফিজুর রহমান জনাকীর্ণ আদালতে এই চাঞ্চল্যকর মামলার রায় ঘোষণা করেন। সাজাপ্রাপ্ত নারীর পরিচয় সাবরিন নাহার, যিনি সিনথি নাম থেকেও পরিচিত। তাঁর বাবার নাম মো. আলাউদ্দিন এবং পৈতৃক নিবাস রাজবাড়ী জেলার পাংশা উপজেলার নারায়ণপুর গ্রামে। তিনি ভুক্তভোগী শিশুটির জন্মদাতা পিতা সালাউদ্দিন ইমনের দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে ওই বাসাবাড়িতে বসবাস করতেন।
রাষ্ট্রপক্ষের সরকারি কৌঁসুলি বা পিপি মো. শফিকুল ইসলাম রিপন মামলার বিবরণ দিয়ে জানান যে, বিগত ২০২০ সালের ১৮ জানুয়ারি তারিখের সন্ধ্যায় টাঙ্গাইল শহরের বিশ্বাস বেতকা এলাকার একটি বাসায় এই মর্মান্তিক ঘটনা ঘটে। নিহত শিশু সাইফ তখন টেলিভিশন সেটের সামনে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছিল। টেলিভিশনের শব্দ অনেক বেশি থাকার কারণে তার সৎমা সাবরিন নাহার চরম মাত্রায় ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং শিশুটিকে তাৎক্ষণিকভাবে পাশের একটি কক্ষে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যান।
সেখানে নেওয়ার পর সাবরিন নাহার শিশু সাইফের হাত এবং তার নাক ও মুখ একটি ওড়না দিয়ে শক্ত করে পেঁচিয়ে ধরেন, যার ফলে সে দ্রুত নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এরপরও অপরাধ থামেনি, তিনি শিশুটির দুই হাত ও পা বেঁধে তাকে বাথরুমের ভেতর নিয়ে যান এবং সেখানে আগে থেকে রাখা পানিভর্তি একটি বালতিতে তার মাথা ডুবিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেন।
হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করার পর পুরো বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিন্ন একটি খাতে প্রবাহিত করার লক্ষ্যে সাবরিন নাহার একটি অভিনব ডাকাতির নাটক মঞ্চস্থ করেন। তিনি ঘরের ভেতরের সমস্ত আসবাবপত্র যত্রতত্র এলোমেলো করে ফেলেন এবং তাৎক্ষণিকভাবে মুঠোফোনে তাঁর স্বামীকে ফোন করে মিথ্যা তথ্য দিয়ে জানান যে তাদের বাসায় একদল ডাকাত হানা দিয়েছে।
এই নৃশংস ঘটনার পর নিহত শিশুর দাদা সরোয়ার হোসেন বাদী হয়ে টাঙ্গাইল সদর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেন। তবে তখন বিষয়টি স্পষ্ট না থাকায় মামলায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছিল। মামলার তদন্ত চলাকালীন পুলিশের মনে সন্দেহ তৈরি হলে তারা সাবরিন নাহারকে আটক করে। পরবর্তীতে পুলিশের নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে তিনি শিশু সাইফকে নিজ হাতে হত্যার কথা অকপটে স্বীকার করেন এবং বিচারকের সামনেও দোষ স্বীকার করে জবানবন্দি প্রদান করেন।
টাঙ্গাইল সদর থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত উপপরিদর্শক বা এসআই প্রতীমা রানী তরফদার সমস্ত সাক্ষ্যপ্রমাণ ও দালিলিক প্রক্রিয়া শেষ করে ২০২৬ সালের ১৪ জুন নির্দিষ্ট সময়ে আদালতে চূড়ান্ত অভিযোগপত্র দাখিল করেন। বিচারকার্য চলাকালীন বিচারক মহোদয় মোট ১০ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য ও জবানবন্দি অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে রেকর্ড করেন। বিচার প্রক্রিয়া শেষে রায় ঘোষণার পরপরই দণ্ডিত সাবরিন নাহারকে পুলিশি প্রহরায় টাঙ্গাইল জেলা কারাগারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।