
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
একদিনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সর্বমোট সংগ্রহের ক্ষেত্রে সর্বকালের সেরা রান সংগ্রাহক হিসেবে আগের মতোই শীর্ষে অবস্থান করছেন ভারতীয় ব্যাটিং কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার। যদিও শতক অর্জনের দিক থেকে এই মহাতারকাকে বেশ আগেই ছাড়িয়ে গেছেন তাঁরই স্বদেশী বিরাট কোহলি, যেখানে শচীনের উনিশটি সেঞ্চুরির বিপরীতে কোহলির ঝুলিতে জমা হয়েছে পঁচান্নটি সেঞ্চুরি। দীর্ঘকাল ধরে সীমিত ওভারের ক্রিকেটে লক্ষ্য তাড়ার সময় কার শ্রেষ্ঠত্ব বেশি, তা নিয়ে নানা আলোচনা চললেও পরিসংখ্য়ানের পাতায় এবার তার পূর্ণ স্বীকৃতি দৃশ্যমান হলো।
নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে অকল্যান্ডের ইডেন পার্কে অনুষ্ঠিত সিরিজের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচে ব্যাটিং করার সময় এই অনন্য কৃতিত্ব অর্জন করেন তিনি। প্রতিপক্ষ দলের বোলার জেকব ডাফির একটি শর্ট ডেলিভারি পুল করার সময় বল ব্যাটের কানায় লেগে ডিপ স্কয়ার লেগ অঞ্চলে ফিল্ডারের তালুবন্দী হয়। জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ার আকুল বাসনা পূরণ না হওয়ায় তাঁকে কিছুটা মনঃকষ্ট নিয়ে সাজঘরে ফিরতে হয়। তবে মাঠ ত্যাগের আগেই তিনি নিজের নাম নতুন একটি বিশাল রেকর্ডের ইতিহাসের পাতায় স্থায়ীভাবে খোদাই করে নেন।
বৃষ্টির কারণে বিঘ্নিত হওয়া এই লড়াইয়ে স্বাগতিকদের ছুড়ে দেওয়া লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দারুণ এক ইনিংস উপহার দেন এই অভিজ্ঞ তারকা। একান্নটি বল মোকাবেলা করে তিয়াত্তর রানের চোখ জুড়ানো ইনিংসটি তাঁকে পৌঁছে দেয় লক্ষ্য তাড়ায় সর্বোচ্চ রানের চূড়ায়। তেরোটি দৃষ্টিনন্দন বাউন্ডারি এবং একটি ছক্কার মার দিয়ে সাজানো এই ইনিংসে ভর করেই তিনি টপকে যান এতদিন শীর্ষে থাকা শচীন টেন্ডুলকারকে।
নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের রান তাড়ার ক্ষেত্রে দুইশো বত্রিশটি ইনিংসে ব্যাটিং করে আগের রেকর্ডধারীর মোট সংগ্রহ ছিল আট হাজার সাতশো কুড়ি রান। সেই লড়াইয়ে তাঁর নামের পাশে যুক্ত ছিল সতেরোটি শতক এবং বাহান্নটি অর্ধশতক। ষোলো বছরের দীর্ঘ ক্রিকেট যাত্রায় অনেক কম ইনিংসে খেলে সেই মাইলফলক পেছনে ফেলেছেন বর্তমান প্রজন্মের এই ব্যাটার। লক্ষ্য তাড়ায় এ পর্যন্ত একশো উনসত্তর বার উইকেটে নেমে তাঁর বর্তমান রান সংখ্যা দাঁড়িয়েছে আট হাজার সাতশো একচল্লিশে। এই যাত্রায় তিনি হাঁকিয়েছেন ত্রিশটি সেঞ্চুরি এবং ছেচল্লিশটি হাফ সেঞ্চুরি।
অর্থাৎ আগের কিংবদন্তির তুলনায় তেষট্টিটি ইনিংস কম খেলে তাঁকে পেছনে ফেলে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন এই তারকা ক্রিকেটার। এখন তাঁর চোখের সামনে হাতছানি দিচ্ছে আরও দারুণ এক কীর্তি, যেখানে লক্ষ্য তাড়ায় প্রথম কোনো ব্যাটার হিসেবে নয় হাজার রানের অনন্য মাইলফলক স্পর্শ করার সুযোগ রয়েছে তাঁর সামনে। এই তালিকায় দুই গ্রেটের ঠিক পরেই তৃতীয় অবস্থানে রয়েছেন ভারতের আরেক প্রবীণ খেলোয়াড় রোহিত শর্মা। একশো তেষট্টি ইনিংসে ব্যাট চালিয়ে এই সাবেক অধিনায়ক সংগ্রহ করেছেন ছয় হাজার আটশো একান্ন রান, যার মধ্যে রয়েছে উনিশটি সেঞ্চুরি ও চল্লিশটি ফিফটি।
কিউইদের বিপক্ষে চলমান এই সিরিজের উদ্বোধনী ম্যাচে আরও একটি দুর্দান্ত রেকর্ডের মালিক বনে গেছেন এই ডানহাতি ব্যাটার। ওয়ানডে ফরম্যাটে তিন নম্বর পজিশনে ব্যাট হাতে নেমে তেরো হাজার রান পূর্ণকারী বিশ্বের প্রথম ব্যাটসম্যান এখন তিনিই। ম্যাচ শুরু হওয়ার আগে এই মাইলফলকে পৌঁছানোর জন্য তাঁর মাত্র বারোটি রানের প্রয়োজন ছিল। দলের ইনিংসের সপ্তম ওভারের খেলা চলাকালীন নিজের ত্রয়োদশ বলটি মোকাবেলা করেই তিনি এই গৌরবময় চূড়ায় পা রাখেন।
তিন নম্বর অর্ডারে দুইশো একান্নটি ইনিংস খেলে এই ভারতীয় তারকার সর্বমোট রান সংখ্যা এখন তেরো হাজার। এই পজিশনে ব্যাট করার সময় তাঁর ব্যাটিং গড় একষট্টি দশমিক এক এক। এখানে তাঁর ব্যাট থেকে এসেছে আটচল্লিশটি সেঞ্চুরি এবং সত্তরটি অর্ধশতক। এই বিশেষ পজিশনে তাঁর কাছাকাছি অবস্থানে রয়েছেন মাত্র একজনই, আর তিনি হলেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক রিকি পন্টিং। তিনশো ত্রিশ ইনিংসে ব্যাট করে বারো হাজার ছয়শো বাষট্টি রান সংগ্রহ করে নিজের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের সমাপ্তি টেনেছিলেন তিনি, যেখানে তাঁর গড় ছিল বিয়াল্লিশ দশমিক চার আট।
সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তিন নম্বর পজিশনে দশ হাজারের বেশি রান করার কৃতিত্ব কেবল এই দুই তারকারই রয়েছে। এই তালিকার পরবর্তী নাম হিসেবে রয়েছে লঙ্কান কিংবদন্তি কুমার সাঙ্গাকারার নাম। দক্ষিণ আফ্রিকার তারকা ক্রিকেটার জ্যাক ক্যালিস সাত হাজার সাতশো চুয়াত্তর রান নিয়ে এই তালিকার চার নম্বর আসনটি দখল করে আছেন।
পুরো ওয়ানডে ক্যারিয়ারের সার্বিক পরিসংখ্য়ানের দিকে তাকালে দেখা যায় দুই মহারথীর মধ্যকার তুলনাটা বেশ রোমাঞ্চকর। এই সময়ের তারকা ব্যাটার এখন পর্যন্ত তিনশো পনেরোটি ম্যাচ খেলে সংগ্রহ করেছেন পনেরো হাজার ৮০ রান। তাঁর ব্যাটিং গড় উনষান্ন দশমিক এক চার এবং স্ট্রাইক রেট চুরানব্বই দশমিক তিন শূন্য। অন্যদিকে আগের রেকর্ডধারীর চারশো ত্রেষট্টি ম্যাচে সংগ্রহ ছিল আঠারো হাজার চারশো ছাব্বিশ রান। সেখানে তাঁর গড় ছিল চুয়াল্লিশ দশমিক আট তিন এবং স্ট্রাইক রেট ছিয়াশি দশমিক দুই চার।
এতসব ব্যক্তিগত অর্জনের এই দিনটিতে বৃষ্টি আইনে পাঁচ উইকেটের বড় জয় তুলে নিয়েছে সফরকারী ভারত। প্রথমে ব্যাট করার আমন্ত্রণ জানিয়ে স্বাগতিক দলকে একশো পঁচাশি রানে আটকে দেয় অতিথিরা। এরপর বৃষ্টি বারবার খেলায় বাধা সৃষ্টি করায় সংশোধিত লক্ষ্য দাঁড়ায় বত্রিশ ওভারে একশো তিয়াত্তর রান। নির্ধারিত ওভারের বহু আগেই ছাপিয়ে যায় সেই লক্ষ্য।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।