
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আমার কর্মক্ষেত্রের সহকারী এবং অনুজপ্রতিম সহকর্মী নোয়েলের জন্মলগ্নে তার নামকরণ নিয়ে মা ও বাবার মাঝে তীব্র মতবিরোধ দেখা দিয়েছিল। জনক রাখতে চেয়েছিলেন নোবেল আর জননী কোয়েল, পরবর্তীতে মাতার পক্ষ থেকে সমঝোতার মাধ্যমে দুই নামের অংশবিশেষ একত্রিত করে রাখা হয় নোয়েল।
হাসিখুশি স্বভাবের ও চমৎকার গল্পকার নোয়েলকে সহাস্য বদনে দেখতে অভ্যস্ত হলেও, সেদিন তার মনকে ভীষণ মলিন ও উদাসীন দেখে আমি তার নিকটবর্তী হই। তার চোখের পলকের নিচে জমেছিল কালচে দাগ এবং ঘন ঘন দীর্ঘশ্বাসের মাধ্যমে সে প্রকাশ করছিল তার গভীর মানসিক যন্ত্রণার কথা।
আমার প্রশ্নের উত্তরে নোয়েল দৃষ্টি ওপরে তুলে অত্যন্ত দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে জানায় যে, পায়েলের সাথে তার নির্ধারিত বিবাহটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল হয়ে গেছে।
আমি বিস্ময় প্রকাশ করে দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক হুট করে ভেঙে যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে নোয়েল মোহাম্মদপুরে তাদের বাসস্থানের বিষয়টি উল্লেখ করে।
সে জানায়, পায়েলের অভিভাবকরা গত শুক্রবার তাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিলেন এবং সেই অনুযায়ী শুভ পরিণয়ের দিনক্ষণও পাকা হয়েছিল। কিন্তু ফেরার পথে তারা ছিনতাইকারীদের আক্রমণের শিকার হন এবং আইফোন, নগদ অর্থ ও স্বর্ণালঙ্কারের পাশাপাশি পায়েলের পিতার পরিহিত সাধারণ স্যান্ডো গেঞ্জিটিও ছিনিয়ে নেয় অপরাধীরা।
এই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর পায়েলের পিতামাতা সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে তারা কোনো অবস্থাতেই মোহাম্মদপুর এলাকায় তাদের একমাত্র কন্যার বিয়ে দেবেন না।
সহকর্মী নোয়েলকে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে আমি বিভিন্ন কৌশল ও পরামর্শ দিতে থাকি, যাতে ভাঙনের মুখে পড়া এই সম্পর্কটি পুনরায় জোড়া লাগানো সম্ভব হয়।
অফিসের প্রধানের অনুমতি নিয়ে সেদিন কিছুটা আগেই কর্মস্থল ত্যাগ করি, কারণ পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী সোনিয়ার সাথে নিউমার্কেটে যাওয়ার কথা ছিল। দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছাতে একটি অ্যাপভিত্তিক রাইড শেয়ারিং মোটরসাইকেলে আরোহণ করি, কিন্তু চালক অত্যন্ত বেপরোয়াভাবে যানটি চালাচ্ছিলেন এবং ব্রেক করতে গিয়ে বারবার চরম বিপত্তির সৃষ্টি হচ্ছিল। অল্পের জন্য রাস্তার ধারে পার্ক করে রাখা একটি বিলাসবহুল রেঞ্জ রোভার গাড়ির সাথে সজোরে ধাক্কা লাগে, সৌভাগ্যবশত সেটিতে কেউ অবস্থান করছিল না। আকস্মিক দুর্ঘটনায় রাজপথে ছিটকে পড়ে আমার কনুই ও হাঁটুর চামড়া ছাল উঠে যায়, তবুও আমি দেরি না করে তড়িঘড়ি করে উঠে দাঁড়াই, কারণ নিউমার্কেটে পৌঁছাতে বিলম্ব হলে সোনিয়ার নিকট জবাবদিহিতার ভয় ছিল তীব্র।
বাইকচালককে উদ্দেশ্য করে আমি প্রশ্ন করি যে বাইকটিতে কোনো ব্রেক ছিল কি না।
চালক নিজের মাথা চুলকাতে চুলকাতে স্বীকার করেন যে সকাল থেকেই ব্রেক নিষ্ক্রিয় ছিল এবং তিনি আমাকে গন্তব্যে নামিয়ে দেওয়ার পরই সেটি মেরামতের চিন্তা করছিলেন।
তার এমন দায়িত্বজ্ঞানহীন কথা শুনে আমি ক্ষুব্ধ হয়ে বলি যে সামান্যের জন্য নিউমার্কেটের পরিবর্তে আমাকে সোজা কবরস্থানে পাঠিয়ে দেওয়ার বন্দোবস্ত হয়েছিল।
এরপর শরীরের ব্যথা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় চেপে বসি।
নির্দিষ্ট সময়ে নিউমার্কেটে উপস্থিত হয়ে আবিষ্কার করি যে আমার জন্য অপেক্ষা না করে সোনিয়া একাই কেনাকাটা শুরু করে দিয়েছে।
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশ রহস্যজনক ধোঁয়ায় ছেয়ে যায় এবং বিকট শব্দে মানুষের মাঝে তীব্র আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘন ধোঁয়ার কারণে চোখের সামনে কিচ্ছু দেখা যাচ্ছিল না এবং এই বিপুল জনসমুদ্রে সোনিয়াকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। আমি তখন দিশাহারা হয়ে চিৎকার করে সোনিয়াকে ডাকতে থাকি এবং আগুন লেগেছে বলে আতঙ্ক প্রকাশ করি। ভাগ্যক্রমে ধোঁয়াচ্ছন্ন পরিবেশের মধ্যেই সোনিয়ার নাগাল পেয়ে যাই এবং জীবনের মায়ায় ওর হাত শক্ত করে খপ করে ধরে দৌড় শুরু করি। পরিস্থিতি যাই হোক, আমাদের জীবন বাঁচাতেই হবে—এই তাগিদে সোনিয়ার বারবার চিৎকার ও হাত ছাড়ানোর আকুল আবেদন উপেক্ষা করে আমি দৌড়াতে থাকি। একটানা প্রায় তিন মিনিট দৌড়ে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে আমরা থামতে সক্ষম হই।
শ্বাস ফেলতে ফেলতে সোনিয়া আমাকে অবাক করে দিয়ে প্রশ্ন তোলে যে আগুন কোথায় দেখা গেল, কারণ এটি আসলে মশার উপদ্রব তাড়ানোর ওষুধ ছিটানোর ধোঁয়া ছিল।
কণ্ঠস্বর সম্পূর্ণ অপরিচিত ঠেকায় আমি ভালোভাবে খেয়াল করে আবিষ্কার করি যে আমি আসলে কোনো এক সম্পূর্ণ অচেনা তরুণীর হাত শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে আছি।
ভুল বুঝতে পেরে তক্ষণাৎ হাত ছেড়ে দিয়ে অত্যন্ত লজ্জিত হয়ে আমি ক্ষমা প্রার্থনা করে জানাই যে আমি তাকে আমার স্ত্রী বলে ভুল করেছি।
তরুণীটি কিছু বলতে যাওয়ার ঠিক সেই মুহূর্তেই আসল সোনিয়া সেখানে এসে উপস্থিত হয় এবং পরিস্থিতি সামাল দিতে ওই তরুণীর কাছে বারবার দুঃখপ্রকাশ করে বিষয়টি মিটমাট করে।
সোনিয়া চরম ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করে আমাকে উদ্দেশ্য করে বলে যে আমি নিজের বৈধ স্ত্রীকে পর্যন্ত চিনতে পারি না এবং সে আর আমার সাথে কোনোভাবেই সংসার করবে না।
ঘটনার আকস্মিকতায় দিশাহারা হয়ে আমি তৎক্ষণাৎ নোয়েলকে মুঠোফোনে কল করে জানাই যে আমার নিজের জীবনেও আসন্ন বিবাহ বিচ্ছেদের পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে, যেন সে আমার জন্য প্রার্থনা করে।
সহকর্মীর এমন আকস্মিক কথায় হতবাক নোয়েল জানতে চায় যে কিভাবে একটি পাকা হওয়া বিয়ে ভেঙে যেতে পারে।
ফোনের লাইন কেটে দিয়ে আমি ক্রুদ্ধ সোনিয়ার পিছু ধাওয়া করি, কারণ ভালো করেই বুঝতে পেরেছিলাম সেদিন আমার কপালে বড় রকমের দুর্গতি অপেক্ষা করছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।