
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সৃষ্টিজগতের মালিফ ও মানবজাতির একমাত্র স্রষ্টা পরম করুণাময় আল্লাহ-তাআলা নিখুঁতভাবে জানেন কোন নিয়ম কখন মানবসমাজের জন্য উপাদেয় এবং কোন অবস্থার সাপেক্ষে কেমন নির্দেশনা প্রয়োগ করা দরকার। অতীতের কোনো নির্দেশ তুলে নিয়ে নতুন ওহি নাজিল করার মাঝে গভীর ও সুদূরপ্রসারী প্রজ্ঞা ও কৌশল লুকিয়ে থাকে, যাকে ইসলামি পরিভাষায় নাসখ বা রহিতকরণ বলা হয়ে থাকে। অনেকেই ভুলবশত প্রশ্ন তোলেন যে এই পরিবর্তন কি পূর্ববর্তী বিধানে কোনো ধরনের ত্রুটি বা বিচ্যুতির সংশোধন, নাকি এর নেপথ্যে লুকিয়ে আছে বান্দার ইমান ও আনুগত্যের এক কঠিন পরীক্ষা। আরবি শব্দ নাসখ-এর আভিধানিক অর্থ হলো কোনো কিছু সরিয়ে ফেলা, রূপান্তর করা কিংবা একটি উপাদানের স্থলে সম্পূর্ণ ভিন্ন কিছু প্রতিস্থাপন করা। শরিয়তের পরিভাষায় এই ধারণার অর্থ দাঁড়ায় পূর্ববর্তী কোনো নির্দেশনার কার্যকাল সমাপ্ত হওয়া পরবর্তী শক্তিশালী কোনো দলিলের মাধ্যমে।
পবিত্র আল-কোরআনে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় এই নীতিটির কথা ঘোষণা করা হয়েছে। আল্লাহতায়ালা পবিত্র বাক্যে এরশাদ করেছেন যে তিনি যখনই কোনো বিশেষ আয়াত তুলে নেন কিংবা ভুলিয়ে দেন, ঠিক তার বিপরীতে তখন আগেরটির চেয়ে অধিক কল্যাণকর অথবা সমকক্ষ কিছু উপস্থাপন করেন। এই ঐশী ঘোষণা স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে যে বিধান প্রত্যাহার করার ক্ষমতা সম্পূর্ণভাবে তাঁর নিজস্ব সার্বভৌম ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন। তাঁর কোনো পদক্ষেপই মানুষের ধারণার মতো অজ্ঞতা, ভুলত্রুটি, অপারগতা কিংবা কোনো ধরনের অসহায়ত্বের ফল নয়। তুলে নেওয়া নির্দেশের পরিবর্তে যে নতুন নির্দেশনা আসে তা অনেক সময় আগেরটির চেয়ে মানুষের জন্য বেশি সহজ কিংবা উপকারী হয়, আবার কখনো তা আগের নির্দেশনার অনুরূপও হতে পারে বলে প্রখ্যাত মুফাসসিরগণ বর্ণনা করেছেন।
ইসলাম ধর্মের বিশিষ্ট আলেমরা এই রহিতকরণ প্রক্রিয়াকে প্রধানত তিনটি সুনির্দিষ্ট ভাগে বিন্যস্ত করেছেন। প্রথম ক্যাটাগরিতে তেলাওয়াত বা পঠনযোগ্য রূপ অবিকল বহাল থাকে কিন্তু ভেতরের মূল বিধানটি সম্পূর্ণ রহিত হয়ে যায়, কোরআনের আলোচনার ক্ষেত্রে এই উদাহরণের আধিক্য সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। দ্বিতীয় ক্যাটাগরিতে পঠনযোগ্য রূপ বা তেলাওয়াত তুলে নেওয়া হলেও তার ভেتরের বিধানটি বহাল তবিয়তে বলবৎ থাকে। তৃতীয় এবং শেষ ক্যাটাগরিতে পঠনযোগ্য রূপ এবং ভেতরের বিধান উভয় অংশই পুরোপুরি রহিত হয়ে যায়। এই বৈচিত্র্যের কারণে কোনো আয়াতের পাঠ্যরূপ টিকে আছে মানেই তার ভেতরের হুকুম এখনো সক্রিয় রয়েছে, এমন ধারণা পোষণ করা সম্পূর্ণ ভুল। তদ্রূপ কোনো নির্দেশ রহিত হওয়ার অর্থ এই নয় যে ওই আয়াতের মর্যাদা কমে গেছে, কারণ বিধানের কার্যকারিতা এবং আল্লাহর বাণী হিসেবে আয়াতের মর্যাদা সম্পূর্ণ আলাদা দুটি বিষয়।
মানবজাতির টিকে থাকার সামর্থ্য এবং পরিবর্তনশীল সামাজিক বাস্তবতার কথা বিবেচনা করে ঐশী বিধান এক যুগে এক রকম এবং অন্য যুগে ভিন্ন হতেই পারে। নাসখ বা রহিতকরণের অন্যতম প্রধান তাৎপর্য হলো ঠিক উপযুক্ত সময়ে বান্দার জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী আইন কার্যকর করা। এর সবচেয়ে স্পষ্ট ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত হলো যুদ্ধক্ষেত্রের ময়দানে মুমিন বান্দাদের দৃঢ়তা প্রদর্শনের সংক্রান্ত বিধান। প্রাথমিক পর্যায়ে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল যে মুমিনদের মধ্য থেকে মাত্র বিশজন ধৈর্যশীল ব্যক্তি থাকলে তারা সংখ্যায় দুই শ শত্রুর ওপর অবলীলায় বিজয়ী হবে। পরবর্তীতে এর ঠিক পরের আয়াতে ঘোষণা করা হয় যে আল্লাহ এখন তাঁদের ওপর থেকে দায়িত্বের বোঝা হালকা করে দিয়েছেন এবং তিনি সম্যকরূপে অবগত আছেন যে তাঁদের শক্তির ভেতর দুর্বলতা রয়েছে। প্রথম আয়াতে একজন মুমিনকে দশজন শত্রুর মোকাবিলার কঠোর নির্দেশ থাকলেও পরের আয়াতে দায়িত্ব কমিয়ে একজনের বিপরীতে মাত্র দুজন শত্রুর অনুপাত নির্ধারণ করা হয়।
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সূচিপত্র বা শুরু থেকেই বান্দার সামগ্রিক শক্তি ও সীমাবদ্ধতার ব্যাপারে সম্পূর্ণ অবহিত ছিলেন। পরবর্তী আয়াতে যে দুর্বলতার কথা ফুটিয়ে তোলা হয়েছে তা নতুন কোনো তথ্য তাঁর গোচরীভূত হওয়ার ফল নয়, বরং সময়ের বাস্তবতার নিরিখেই কেবল বিধানের ভার কিছুটা লাঘব করা হয়েছে। এতে দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায় যে ধর্মের প্রতিটি বিধান মানুষের ব্যক্তিগত সামর্থ্য ও সার্বিক কল্যাণের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সহজীকরণের এই অনুপম নীতিটি পুরো কোরআন মাজিদের সাধারণ শিক্ষারও একটি অংশবিশেষ। রোজা ফরজ হওয়ার প্রেক্ষাপটে বলা হয়েছে যে আল্লাহ বান্দার জন্য সবকিছু সহজ করতে চান, কোনো অবস্থাতেই তা জটিল করতে চান না। যদিও এই নির্দিষ্ট আয়াতটি সরাসরি নাসখ বা রহিতকরণের দলিলের অন্তর্ভুক্ত নয়, তথাপি এটি শরিয়তের বিধান অনুধাবন করার ক্ষেত্রে সহজতার মূলনীতিটি দারুণভাবে ফুটিয়ে তোলে।
আরেকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তাৎপর্য হলো দীর্ঘমেয়াদে মানুষকে যেকোনো বড় ধরনের পরিবর্তনের জন্য মানসিকভাবে ক্রমান্বয়ে প্রস্তুত করে তোলা। সুপেয় বা নেশাজাতীয় পানীয় মদ নিষিদ্ধ করার বিভিন্ন ধাপগুলো এর সবচেয়ে প্রকট উদাহরণ। একেবারে শুরুতে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জানানো হয়েছিল যে এগুলোতে কিছু পাপের পাশাপাশি মানুষের জন্য সামান্য উপকারিতাও আছে, তবে এর ক্ষতিকর পাপের পরিমাণ উপকারের চেয়ে অনেক বেশি। পরবর্তী ধাপে যখন মানুষ নেশাগ্রস্ত অবস্থায় থাকত তখন তাদের নামাজের ধারেরকাছে যেতে কঠোরভাবে বারণ করা হয়েছিল। সর্বশেষ সুরা মায়িদায় এসে মদকে সরাসরি শয়তানের নোংরা কর্ম হিসেবে আখ্যায়িত করে তা চিরতরে বর্জনের চূড়ান্ত ও অকাট্য নির্দেশ অবতীর্ণ হয়। মানুষের দীর্ঘদিনের গভীরে শেকড় গেঁথে থাকা কোনো অভ্যাস রাতারাতি এক ধাক্কায় পুরোপুরি ছাড়ানো অসম্ভব ছিল, তাই আল্লাহ তাঁর অসীম প্রজ্ঞাবলে সমাজকে ধীরে ধীরে ও সুচারুভাবে প্রস্তুত করেছেন।
কিবলা পরিবর্তন হলো আয়াত রহিতকরণের সবচেয়ে বেশি শিক্ষণীয় ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্তগুলোর একটি। প্রিয় নবী এবং তাঁর সাহাবিরা প্রাথমিক যুগে পবিত্র বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ ফিরিয়েই ইবাদত ও সালাত আদায় করতেন। পরবর্তীতে আসমানি নির্দেশের মাধ্যমেই কেবল পবিত্র কাবা শরিফ মুসলমানদের চিরকালীন কিবলা হিসেবে নির্ধারিত হয়। আল্লাহতায়ালা নিজেই বলেছেন যে তিনি পূর্বের কিবলা নির্ধারণ করেছিলেন কেবল এই বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য যে কে প্রকৃত নবীর আনুগত্য করে আর কে পেছনের দিকে ফিরে যায়। এই পরিবর্তনের মূল তাৎপর্য হলো এত দিন যেদিকে মুখ করে সালাত পড়া হতো নতুন নির্দেশ আসার পর ভিন্ন দিকে মুখ ফেরাতে হবে। এই রূপান্তর ও নির্দেশ মেনে নেওয়ার মাধ্যমেই মূলত প্রমাণিত হয় কার ইমান ও আনুগত্য আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের প্রতি কতটা অবিচল ও খাঁটি।
দুটি ভিন্ন আয়াতের ভেতরে আপাতদৃষ্টিতে কোনো বৈপরীত্য বা অর্থগত পার্থক্য দেখা মাত্রই একটিকে অন্যটির দ্বারা রহিত বলে ঘোষণা করা সঠিক আলেমদের পদ্ধতি নয়। অনেক সময় গভীর তাফসির, ওহি অবতীর্ণ হওয়ার বিশেষ প্রেক্ষাপট এবং ভাষাগত চুলচেরা বিশ্লেষণের মাধ্যমেই কেবল এই আয়াতগুলোর মাঝে চমৎকার সমন্বয় সাধন করা সম্ভব। নাসখ বা রহিতকরণের তত্ত্বটি নিয়ে মানুষের মনে যেসব ভুল ধারণার সৃষ্টি হয় তার মূল কারণ হলো এটিকে সাধারণ মানুষের তৈরি আইনের পরিবর্তনের সঙ্গে মেলানোর প্রবণতা। মানুষ সাধারণত সময়ের পরিবর্তন বুঝে নতুন পরিস্থিতিতে সিদ্ধান্ত নেয় এবং পুরোনো আইনে ভুল ধরা পড়লে তা সংশোধন করে। কিন্তু মহাজ্ঞানী আল্লাহর ক্ষেত্রে এই ধারণা সম্পূর্ণ অবাস্তব ও অমূলক, কারণ মানুষের জ্ঞান অত্যন্ত সীমিত এবং সে ভবিষ্যতের খবর জানে না।
পরাক্রমশালী আল্লাহর সুমহান জ্ঞান অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ—এই তিন কালকেই সমানভাবে পরিব্যপ্ত করে রাখে। কোন বিধান মানুষের জন্য কখন কার্যকর হবে, কত দিন তার মেয়াদ থাকবে এবং ঠিক কোন মুহূর্তে তার স্থলাভিষিক্ত হবে অন্য বিধান, এই সবকিছুই তাঁর অনাদি জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। সুরা বাকারার ১০৬ নম্বর আয়াতে এই রহিতকরণের আলোচনার ঠিক পরপরই আল্লাহ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে তিনি সবকিছুর ওপর সর্বশক্তিমান। এর পরের আয়াতে আবার ঘোষণা করা হয়েছে যে আসমান ও জমিনের অবিসংবাদিত রাজত্ব একমাত্র তাঁরই হাতে ন্যস্ত। এর মধ্য দিয়ে অত্যন্ত পরিষ্কার হয়ে যায় যে আইন প্রণয়ন ও তা পরিবর্তনের নিরঙ্কুশ অধিকার কেবল তাঁরই, কারণ তিনিই পুরো সৃষ্টিজগতের একমাত্র মালিক। একজন চিকিৎসক যেমন রোগীর তখনকার অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ওষুধ দেন এবং আগে থেকেই জানেন পরিস্থিতি বদলালে অন্য ওষুধের প্রয়োজন হবে, তেমনি আল্লাহর বিধান পরিবর্তন কোনো ভুল নয়, বরং তা তাঁর সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনারই একটি অংশ।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।