
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বৈশাখ মাসের তীব্র রোদের দুপুরে কোনো সড়ক দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় হঠাৎ ওপরের দিকে তাকালে চোখে পড়ে রক্তিম কিংবা উজ্জ্বল হলুদ রঙের ফুলে পরিপূর্ণ দুটি ভিন্ন গাছ। অনেকেই মনে করেন যে এগুলো আসলে একটিমাত্র গাছ, যার কেবল ফুলের রঙ আলাদা, তবে বাস্তবে এই ধারণাটি সম্পূর্ণ ভুল।
উদ্ভিদবিজ্ঞান অনুযায়ী, লাল রঙের কৃষ্ণচূড়া এবং হলুদ রঙের রাধাচূড়া দুটি সম্পূর্ণ আলাদা প্রজাতির গাছ। কৃষ্ণচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম হলো Delonix regia এবং রাধাচূড়ার বৈজ্ঞানিক নাম Peltophorum pterocarpum। বৈজ্ঞানিক নামগুলো মুখস্থ করার কোনো প্রয়োজন না থাকলেও এটা জানা জরুরি যে এরা আলাদা বংশের হলেও শিম ও মটরের পরিবারের সদস্য হওয়ার সুবাদে দূরসম্পর্কের আত্মীয় বা ভাইবোনের মতো।
গাছ দুটির ফুল দেখলেই খুব সহজে তাদের মধ্যকার পার্থক্যটা চিনে নেওয়া সম্ভব। কৃষ্ণচূড়ার ফুলগুলো আকারে বেশ বড় হয় এবং এর পাঁচটি পাপড়ির মধ্যে চারটি গাঢ় লাল রঙের এবং পঞ্চম পাপড়িটিতে সাদা ও হলুদ ছোপ থাকে। যখন এই গাছে ফুল ফোটে, তখন এর সবুজ পাতাগুলো প্রায় আর দেখাই যায় না এবং দূর থেকে দেখে মনে হয় গাছের ডালে যেন আগুন লেগেছে।
অন্যদিকে, রাধাচূড়ার ফুলগুলো আকারে ছোট এবং এর রঙ হয় উজ্জ্বল হলুদ। এই ফুলের পাপড়ির কিনারাগুলো এমনভাবে কুঁচকানো থাকে যেন কেউ নিজে হাতে আঙুল দিয়ে সেগুলোতে ভাঁজ করে দিয়েছে এবং ফুলগুলো লম্বা গুচ্ছাকারে খাড়া হয়ে ফোটে। এই গাছের ফুলগুলোর মাঝখান থেকে সরু লাল রঙের কেশর বাইরে বেরিয়ে থাকে এবং এর গাছতলায় দাঁড়ালে এক ধরনের হালকা মিষ্টি সুবাস পাওয়া যায়, অথচ কৃষ্ণচূড়াতে প্রায় কোনো সুগন্ধই থাকে না।
ফুল ঝরে যাওয়ার পরও এই গাছগুলোকে আলাদা করা খুব একটা কঠিন কাজ নয়। কৃষ্ণচূড়ার ফলগুলো প্রকাণ্ড আকৃতির হয়ে থাকে এবং লম্বায় প্রায় আধা মিটার পর্যন্ত লম্বা হতে পারে, যা পেকে কাঠের মতো শক্ত হয়ে গেলে ভেতরে থাকা বিচিগুলো ঝাঁকালে খটখট শব্দ করে। ছোটবেলায় এই ফল দিয়ে তলোয়ার বানিয়ে খেলা করেনি এমন মানুষের সংখ্যা খুবই কম। বিপরীতে, রাধাচূড়ার ফলগুলো ছোট ও চ্যাপটা আকৃতির হয় এবং বড়জোর ১০ থেকে ১২ সেন্টিমিটার লম্বা হয়ে থাকে। প্রথমে সবুজ রঙের থাকলেও পরে এগুলো লালচে বাদামি বর্ণ ধারণ করে এবং ফলের দুই ধারে পাতলা ডানার মতো কিনারা থাকে, যার ভেতরে মোটে কয়েকটি বিচি জন্মায়।
পাতা দেখে এই দুটি গাছকে আলাদা করা একটু কঠিন, কারণ উভয়ের পাতাই পালকের মতো নিখুঁতভাবে সাজানো থাকে। তবে গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে রাধাচূড়ার পাতার অংশগুলো কৃষ্ণচূড়ার চেয়ে কিছুটা বড় এবং এর রঙ গাঢ় সবুজ।
এই দুটি গাছের আদি নিবাসেও রয়েছে বিশাল ফারাক। কৃষ্ণচূড়ার উৎপত্তি হয়েছে আফ্রিকার পূর্ব উপকূলের দ্বীপ রাষ্ট্র মাদাগাস্কার থেকে, যেখানে বুনো প্রকৃতির মাঝে গাছটি আজ বিলুপ্তির মুখে। অথচ অত্যন্ত অদ্ভুত ব্যাপার হলো, বর্তমানে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের রাস্তার ধারে এই গাছ সারি সারি লাগানো হচ্ছে এবং নিজের দেশে কমে গেলেও বিদেশের মাটিতে এর সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে, রাধাচূড়ার আদি নিবাস হলো এশিয়ার ক্রান্তীয় অঞ্চল, যার বিশেষ কেন্দ্রস্থল হলো দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া।
উভয় গাছের ফুল ফোটার সময়কাল প্রায় একই রকম। চৈত্রের শেষ দিকে এই গাছগুলোতে কুঁড়ি ধরতে শুরু করে এবং বৈশাখ থেকে জ্যৈষ্ঠ মাসজুড়ে এর ফুল ফোটার আসল সময়।
এই গাছ দুটির নামকরণ নিয়ে একটি জনপ্রিয় জনশ্রুতি চালু রয়েছে। 'চূড়া' শব্দটির অর্থ হলো মাথার ঝুঁটি বা মুকুট, আর বাংলার লোকসাহিত্য, গান ও কবিতায় রাধা ও কৃষ্ণ চিরকালের এক পরিচিত জুটি। সেই সুবাদেই ধারণা করা হয় যে কৃষ্ণের নামানুসারে লাল ফুলটিকে কৃষ্ণচূড়া এবং রাধার নামানুসারে হলুদ ফুলটিকে রাধাচূড়া বলা হয়ে থাকে। যদিও এই নামকরণের সঠিক ও নির্ভুল উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব নয়, তবুও এই জুটিবাচক নাম শুনতে বেশ ভালোই লাগে।
তবে এই নাম নিয়ে কিছুটা বিভ্রান্তিও তৈরি হয়। কারণ, কৃষ্ণচূড়া গাছেরই একটি নির্দিষ্ট হলুদ ফুলের জাত রয়েছে, যা দেখে অনেকে ভুল করে সেটিকে রাধাচূড়া বলে মনে করেন। আবার একই উদ্ভিদকে অঞ্চলভেদে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়ে থাকে। এই কারণে শুধুমাত্র ফুলের রঙ দেখে গাছটার নাম বলতে গেলে ভুল হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা থেকেই যায়।
তাই পরবর্তী সময়ে যখন কোনো গাছের নিচে দাঁড়াবেন, তখন নিশ্চিত হওয়ার জন্য তিনটি সুনির্দিষ্ট বিষয় যাচাই করে দেখতে পারেন। প্রথমে ফুলের আকার খেয়াল করুন; ফুল যদি বড় ও লাল হয় তবে তা কৃষ্ণচূড়া, আর ছোট ও হলুদ হলে সেটি রাধাচূড়া। যদি গাছে ফুল না থাকে, তবে গাছের নিচের মাটিতে ঝরে পড়া ফল বা শুঁটি খুঁজে দেখতে পারেন। যদি আধা মিটার লম্বা শুঁটি পাওয়া যায়, তবে তা নিশ্চিতভাবেই কৃষ্ণচূড়ার ফল এবং ছোট চ্যাপটা ফল পেলে বুঝতে হবে সেটি রাধাচূড়ার। এছাড়া নিজের নাক খোলা রেখে বাতাস থেকে আসা হালকা মিষ্টি গন্ধ পরীক্ষা করলেও রাধাচূড়া চেনার কাজটা সহজ হয়ে যায়।
এই গাছগুলো কেবল সৌন্দর্যের জন্যই লাগানো হয় না। চৈত্রের প্রচণ্ড গরমের দুপুরে একটি বিশাল আকৃতির কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে আশ্রয় নিলে গরমের তীব্রতা অনেকটাই কমে আসে। যখন এই গাছে ফুল ফোটে, তখন চারপাশে অজস্র মৌমাছি ও প্রজাপতির উপদ্রব বা ভিড় জমে যায়। স্কুলের খেলার মাঠ বা পুরোনো রাস্তার পিচের ওপর ঝরে পড়া পাপড়ির আস্তরণ বিছিয়ে থাকে এবং সেই লাল-হলুদ পাপড়ি মাড়িয়েই পথ দিয়ে রিকশা চলে যায়।
আমাদের চারপাশের প্রকৃতিতে পাশাপাশি দুটি গাছ লাগানো থাকার দৃশ্য প্রায়শই দেখতে পাওয়া যায়, যেখানে একদিকে লাল ফুলের গাছ আর অন্যদিকে হলুদ ফুলের গাছ দাঁড়িয়ে থাকে এবং মাঝখান দিয়ে চলে যায় একটি সরু পথ। ছবি তোলার জন্য এর চেয়ে সুন্দর এবং আকর্ষণীয় জায়গা খুব কমই পাওয়া সম্ভব। তবে খেয়াল রাখতে হবে যেন ছবির ক্যাপশনে ভুল নাম লিখে ফেলা না হয়, কারণ আপনার বন্ধুরা একটু মনোযোগ দিলেই সেই ভুল ধরে ফেলবে।
গাছ দুটি আকারে বেশ বিশাল হয়ে থাকে এবং এর ডালপালাগুলো ছাতার মতো চারদিকে ছড়িয়ে অনেকখানি জায়গা জুড়ে অবস্থান করে। তাই কোনো ছোট উঠোনে যদি এই চারা রোপণ করা হয়, তবে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই এর বিশাল ডালপালা ঘরের ছাদের ওপর গিয়ে ঝুলে পড়তে পারে। এই কারণে আপনি যদি এই গাছের চারা লাগানোর কথা ভেবে থাকেন, তবে রোপণের আগেই উপযুক্ত কোনো খোলা জায়গা নির্বাচন করা উচিত। এক্ষেত্রে স্কুলের খেলার মাঠ, এলাকার কোনো পার্ক কিংবা নদীর ধার এই গাছ লাগানোর জন্য সবচেয়ে উপযোগী স্থান হতে পারে।
সবশেষে আপনি চাইলে গাছ থেকে ঝরে পড়া যেকোনো একটি ফুল কুড়িয়ে হাতে নিয়ে পরীক্ষা করতে পারেন। ফুলটি লাল রঙের হলে তার পাপড়ির সংখ্যা গুনে দেখতে পারেন, আর হলুদ রঙের হলে তার কুঁচকানো কিনারার ভাঁজে আলতো করে আঙুল বুলিয়ে অনুভবের চেষ্টা করতে পারেন। এরপর আপনার কোনো বন্ধুকে ডেকে তাকে বুঝিয়ে বলতে পারেন যে আপনি যে গাছটি দেখছেন তা আসলে রাধাচূড়া।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।