
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের দায়ের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের একটি মামলায় ঢাকার আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে আত্মসমর্পণ করার পর জামিন লাভ করেছেন জনপ্রিয় চিত্রনায়িকা পরীমনি। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঠিক পরের দিনই আজ বৃহস্পতিবার বিচারিক আদালত তাঁর জামিন আবেদন মঞ্জুর করেছেন।
আজ নির্ধারিত দিনে বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে ঢাকার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছায় পরীমনিকে বহনকারী একটি সাদা রঙের ব্যক্তিগত গাড়ি। এর কিছুক্ষণ পর, বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে তিনি এজলাসে প্রবেশ করেন এবং আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করে জামিনের প্রার্থনা করেন।
উভয় পক্ষের আইনি শুনানি সম্পন্ন হওয়ার পর জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমান মাত্র ৫০০ টাকার একটি মুচলেকায় তাঁর জামিন মঞ্জুর করার এই আদেশ প্রদান করেন।
আদালতে আসামিপক্ষের এই আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়টি গণমাধ্যমকে নিশ্চিত করেছেন পরীমনির আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত।
আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত গণমাধ্যমকে জানান যে, আদালতের পক্ষ থেকে আগের দিনই তাঁর মক্কেলের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল এবং সেই অনুযায়ী তাঁরা আজ দ্রুত আদালতে আত্মসমর্পণ করে জামিন চেয়েছেন, যা আদালত শুনানি শেষে মঞ্জুর করেছেন।
মূলত গতকাল বুধবার এই মামলার সাক্ষ্য গ্রহণের নির্ধারিত দিন ধার্য ছিল, কিন্তু নির্দিষ্ট সময়ে পরীমনি আদালতে উপস্থিত হতে ব্যর্থ হন।
আদালতে হাজিরা না দিতে পারার কারণে তাঁর আইনজীবীর পক্ষ থেকে সময়ের আবেদন করা হলেও আদালত সেই আবেদন নামঞ্জুর করেন এবং তাঁর পূর্বের জামিন বাতিল করে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির কঠোর নির্দেশ দেন।
আদালতে অনুপস্থিতির সুনির্দিষ্ট কারণ ব্যাখ্যা করে আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত গতকালই গণমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন যে, পরীমনি মারাত্মক অ্যালার্জিজনিত জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে গুরুতর অসুস্থ থাকায় আদালতে উপস্থিত হতে পারেননি এবং সময়ের আবেদন করেছিলেন।
অন্যদিকে, আদালতের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে যে, মামলার বাদী নির্ধারিত দিনে আদালতে সশরীরে উপস্থিত হয়ে পরীমনিসহ মোট তিন আসামির জামিন বাতিলের জোরেশোরে আবেদন জানান।
বাদীর ওই জামিন বাতিলের আবেদনের ওপর শুনানির সময় আসামিপক্ষের কোনো আইনজীবী আদালতে উপস্থিত ছিলেন না, যার পরিপ্রেক্ষিতে আদালত শুনানি নিয়ে পরীমনির জামিন বাতিলের সিদ্ধান্ত নেন এবং পরোয়ানা জারি করেন।
উল্লেখ্য, আলোচিত এই মামলার ক্ষেত্রে পরীমনির বিরুদ্ধে এর আগেও একবার গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছিল।
গত বছরের ২৬ জানুয়ারি আদালত এই মামলায় অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিচার কার্যক্রম শুরুর আদেশ দিয়েছিলেন এবং সেদিনও তিনি আদালতে অনুপস্থিত থাকায় পরোয়ানা জারি হয়েছিল, যা পরে তিনি আত্মসমর্পণ করে কেটে দিয়েছিলেন।
২০২২ সালের ৬ জুলাই ঢাকার আদালতে মামলাটি দায়ের করেছিলেন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদ।
বাদী তাঁর অভিযোগে উল্লেখ করেছিলেন যে, ২০২১ সালের ৯ জুন গভীর রাতে পরীমনি ও তাঁর সহযোগীরা সাভারের বোট ক্লাবে প্রবেশ করেছিলেন।
এরপর রাত সোয়া একটার দিকে নাসির উদ্দিন মাহমুদ ও তাঁর সহযোগী শাহ শহিদুল আলম যখন ক্লাব ত্যাগ করছিলেন, তখন পরীমনি তাঁকে ডেকে কিছুক্ষণ সেখানে বসার অনুরোধ জানান।
নাসিরের আরও অভিযোগ ছিল যে, বসার পর একপর্যায়ে পরীমনি কোনো মূল্য পরিশোধ না করেই একটি মদের বোতল তাঁকে দেওয়ার জন্য চাপ সৃষ্টি করেন।
বাদী সেই প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় পরীমনি তাঁকে অকথ্য ভাষায় গালমন্দ করেন এবং দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বাগ্বিতণ্ডা শুরু হয়।
সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতির একপর্যায়ে পরীমনি তাঁর দিকে কাচের গ্লাস ও একটি মুঠোফোন সজোরে ছুড়ে মারেন, যার ফলে তাঁর মাথা ও বুকে আঘাত লাগে।
নাসির উদ্দিন মাহমুদ তাঁর অভিযোগে মারধর করা ছাড়াও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া এবং ক্লাবের ভেতরে ভাঙচুর চালানোর গুরুতর অভিযোগ এনেছেন।
বোট ক্লাবের ওই অপ্রীতিকর ঘটনার পর নাসির উদ্দিন ও অন্যান্যদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যাচেষ্টার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এনে সাভার থানায় মামলা দায়ের করেছিলেন পরীমনি নিজেই।
এদিকে নাসিরের দায়ের করা মারধরের মামলাটি তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ২০২৪ সালে আদালতে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এবং পিবিআই ঢাকা জেলার পরিদর্শক মোণ্ড মনির হোসেন আদালতে জমা দেওয়া প্রতিবেদনে জানান যে, পরীমনি ও তাঁর কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমি—উভয়ের বিরুদ্ধেই মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
তবে তদন্ত প্রতিবেদনে অপর আসামি ফাতেমা তুজ জান্নাত বনির বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগগুলোর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি বলে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
পরবর্তীতে পুলিশি তদন্ত প্রতিবেদনটি আদালত আমলে গ্রহণ করে পরীমনি ও জিমিকে আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দিয়ে সমন জারি করেছিলেন।
গত বছরের ২৫ জুন তাঁরা দুজনই আদালতে সশরীরে হাজির হয়ে আইনজীবীর মাধ্যমে জামিন নিয়েছিলেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।