
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বর্তমান বৈশ্বিক ভূরাজনীতিতে আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অন্যতম ফলপ্রসূ ও শক্তিশালী অর্থনৈতিক কৌশল হিসেবে বিবেচিত শুল্ক এবং নিষেধাজ্ঞা এখনো মার্কিন প্রশাসনের নির্বাহী বিভাগের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণেই বহাল রয়েছে। মার্কিন কংগ্রেসের আইনপ্রণেতারা চাইলে বিদেশে বড় ধরনের কোনো সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় আর্থিক তহবিল ছাড় বা বরাদ্দ স্থগিত রাখতে পারেন। তবে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাণিজ্যিক শুল্ক নির্ধারণ, শাস্তিূলক নিষেধাজ্ঞা জারি কিংবা সামরিক বোমা হামলার মতো তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা আইনগতভাবেই সীমিত করার কোনো সুযোগ কংগ্রেসের হাতে রাখা হয়নি। এ ধরনের নীতিগত ও কৌশলগত বিষয়গুলো সম্পূর্ণভাবে মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিজ নিজ এখতিয়ারভুক্ত বিষয় হিসেবে গণ্য করা হয়ে থাকে।
বিশেষ করে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তার বিধানগুলো কিংবা নির্বাহী বিভাগের বিশেষ জরুরি ক্ষমতা প্রয়োগ করে অত্যন্ত বিস্তৃত পরিসরে বাণিজ্যিক শুল্ক আরোপের যে আইনগত এখতিয়ার প্রেসিডেন্টের রয়েছে, তা মূলত মার্কিন কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ কিংবা সিনেটে কোন রাজনৈতিক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করেছে তার ওপর একেবারেই নির্ভর করে না।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ ভারতের জন্য এর মূল তাৎপর্য হলো, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য কাঠামোর গতিপ্রকৃতি নির্ধারণকারী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক বিষয়গুলো আগামী দিনেও মার্কিন হোয়াইট হাউসের প্রত্যক্ষ নিয়ন্ত্রণাধীন এলাকাতেই বজায় থাকবে। এই নির্ধারিত বিষয়ের পরিধির মধ্যে রয়েছে নির্দিষ্ট বিভিন্ন খাতভিত্তিক আমদানিমুখী শুল্ক, বৈশ্বিক সরবরাহব্যবস্থার ওপর সৃষ্ট বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত চাপ এবং ঐতিহ্যগত মিত্র রাশিয়ার সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখার কারণে ভারতের ওপর সম্ভাব্য নিষেধাজ্ঞা জারির প্রক্রিয়ায় ‘গ্রাহাম অ্যাক্ট’-এর চলমান অব্যাহতি বা ছাড় প্রত্যাহারের মতো অতি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের একচ্ছত্র ক্ষমতা।
অর্থাৎ, মার্কিন বাজারের বাণিজ্যিক সুবিধা ভোগ ও সেখানে অবাধ প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করার বিষয়ে পারস্পরিক আলোচনা, নিয়ন্ত্রণমূলক বিভিন্ন কাঠামোর সুচারু ব্যবস্থাপনা এবং পারস্পরিক দ্বিপক্ষীয় বিরোধ নিষ্পত্তির সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য সামনে রেখে দক্ষিণ এশিয়ার প্রভাবশালী রাজধানী নয়াদিল্লিকে আগামী দিনগুলোতেও সরাসরি মার্কিন প্রেসিডেন্ট এবং তাঁর প্রশাসনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিসভার সদস্যদের সঙ্গেই নিবিড়ভাবে কাজ করে যেতে হবে।
অন্যদিকে, মার্কিন রাজনৈতিক অঙ্গনের মধ্যবর্তী নির্বাচনগুলোর ঘোষিত ফলাফল ভারতের মতো উদীয়মান অর্থনীতির দেশের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশের সার্বিক প্রেক্ষাপটে একধরনের তাৎক্ষণিক মনস্তাত্ত্বিক ও বাস্তবসম্মত স্বস্তির বারতা বয়ে আনতে পারে। মার্কিন মুল্লুকে বহুল আলোচিত ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ বা সংক্ষেপে ‘মাগা’ রাজনৈতিক মতাদর্শের অনুসারী বলয়ের উগ্র রাজনৈতিক বক্তব্য ও প্রচারণামূলক কার্যক্রম প্রায়শই অভিবাসন নীতি, অশ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী এবং বিদেশি দক্ষ শ্রমশক্তির বিরুদ্ধে ক্রমবর্ধমান বিধিনিষেধমূলক ও বৈরী এক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করে চলেছে। বিশেষ করে, যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী ভারতীয় নাগরিকদেরই যেন বিশেষভাবে লক্ষ্য করেই এমন ধরনের এক বিরূপ সামাজিক মনোভাব প্রকাশ পেতে দেখা গেছে।
মার্কিন মধ্যবর্তী এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনৈতিক ক্ষমতার ভারসাম্যের মধ্যে যে লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে, তা মূলত উগ্র জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক উত্তাপের পারদ কিছুটা হলেও নিচে নেমে আসার জোরালো ইঙ্গিত প্রদান করছে। মার্কিন মুল্লুকে বসবাসরত অধিকাংশ ভারতীয়-আমেরিকান নাগরিকদের নিকটবর্তী বড় একটি অংশের জন্য এই রাজনৈতিক পটপরিবর্তন নিঃসন্দেহে একটি গভীর স্বস্তির সংবাদ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ বছরের নির্বাচনে তাঁদের একটি বিরাট অংশ ঐতিহ্যগতভাবে ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থীদের পক্ষেই তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের ধারণা।
যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে স্থায়ী ও অস্থায়ীভাবে বসবাসরত বিশালসংখ্যক ভারতীয় প্রবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছে কয়েক লাখ উচ্চশিক্ষিত তথ্যপ্রযুক্তি পেশাজীবী, মেধাবী শিক্ষার্থী, উচ্চপর্যায়ের গবেষক ও সফল উদ্যোক্তা। মার্কিন সমাজে কম বৈরী ও শান্ততাপূর্ণ জাতীয় পরিবেশ বজায় থাকলে তা তাঁদের কাজের ভিসার প্রয়োজনীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে, গ্রিন কার্ড পাওয়ার দীর্ঘসূত্রতার অবসান ঘটাতে এবং দৈনন্দিন জীবনে বর্ণবাদী বৈরিতা ও সমাজের কাছে ‘অপর’ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার গভীর আশঙ্কা অনেকটাই কমিয়ে দিতে সাহায্য করতে পারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্থায়ীভাবে বসবাসরত ভারতীয়-আমেরিকান অভিবাসী সম্প্রদায় ইতিমধ্যে দেশটির অর্থনীতি এবং সামগ্রিক নাগরিক জীবনের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী জনগোষ্ঠী হিসেবে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করে নিয়েছে। বৈশ্বিক মেধা এবং বাদামি বর্ণের সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর প্রতি তুলনামূলকভাবে কম বৈরী এই উন্মুক্ত জনপরিসর আগামী দিনগুলোতে প্রবাসী এই ভারতীয় সম্প্রদায়ের সামগ্রিক কল্যাণের জন্য আরও অধিকতর ইতিবাচক ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করতে সক্ষম হবে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা