
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে পোশাক খাতের অবদান অনস্বীকার্য হলেও এই শিল্পের টিকে থাকা মূলত নির্ভর করে শ্রমিক, কারখানা মালিক এবং প্রশাসনের পারস্পরিক বিশ্বাস ও সহযোগিতার ওপর। শ্রমজীবীদের ন্যায্য পাওনা নিশ্চিত না করে যেমন উৎপাদন খাতের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব রক্ষা করা অসম্ভব, ঠিক তেমনি শিল্পকে হুমকির মুখে ফেলে শ্রমিকদের টেকসই স্বার্থও রক্ষা করা যায় না। তাই সব পক্ষের স্বার্থ জলাঞ্জলি না দিয়ে এমন একটি বাস্তবসম্মত সমঝোতায় পৌঁছাতে হবে, যার মাধ্যমে কর্মীরা সম্মানজনক জীবিকা নির্বাহের সুযোগ পান, উদ্যোক্তারা ব্যবসা পরিচালনার সক্ষমতা বজায় রাখতে পারেন এবং বিশ্ববাজারে দেশের প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান অক্ষুণ্ণ থাকে।
শ্রমিকদের যথাযথ পারিশ্রমিক কোনো দয়া বা অনুকম্পার বিষয় নয়, এটি তাদের একান্ত আইনগত অধিকার। অন্যদিকে, কলকারখানার পরিবেশ শান্ত রাখা কেবল মালিকপক্ষের একক লাভ বা দায় নয়, এটি সরাসরি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এই দুই পক্ষের বিরোধ জিইয়ে না রেখে তাদের মধ্যে ভারসাম্য ও মেলবন্ধন তৈরির পথ আবিষ্কার করাটাই বর্তমান প্রশাসনের সবচেয়ে বড় গুরুদায়িত্ব। এই পথ ছেড়ে অন্য কোনো কৌশল অবলম্বন করা হলে তা কেবল বিদ্যমান সমস্যাকে ঘনীভূত করবে, কোনো স্থায়ী সুফল বয়ে আনবে না।
বেতন কাঠاামো পুনর্নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় কেবল একটি নির্দিষ্ট অংক ঠিক করাই যথেষ্ট নয়, বরং শ্রমিকদের পরিবার পরিজনের বাস্তব জীবনযাত্রার খরচ এবং বর্তমান মূল্যস্ফীতির হার গভীরভাবে বিবেচনা করতে হবে। একই সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতের আর্থিক সক্ষমতাও পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বিশ্লেষণ করা বাঞ্ছনীয়। দরকার হলে এই বেতন বৃদ্ধি ধাপে ধাপে কার্যকর করা যেতে পারে, তবে মেয়াদি বাস্তবায়নের নামে কালক্ষেপণ করার কোনো সুযোগ থাকা উচিত নয়। পারিশ্রমিক কাঠামোগুলো নির্ধারণের পাশাপাশি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সূচকের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্দিষ্ট সময় পরপর তা পর্যালোচনা করার কার্যকর ব্যবস্থা চালু রাখা আবশ্যক।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ওপর দায়িত্বের বোঝা সবচেয়ে ভারী। একদিকে যেমন খেটে খাওয়া মানুষের যৌক্তিক দাবিগুলোর প্রতি ইতিবাচক সাড়া দিয়ে কার্যকর ভূমিকা পালন করতে হবে, অন্যদিকে শিল্পকারখানার অভ্যন্তরীণ পরিবেশ শান্তিপূর্ণ রাখতে উদ্যোক্তাদের সব ধরনের সহায়তা প্রদান করতে হবে। উৎপাদনাঞ্চলগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিতকরণ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, বন্দর ও পরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং সার্বিক ব্যবসা পরিচালনার খরচ কমানোর সুনির্দিষ্ট উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
এর পাশাপাশি শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন, কর্মীদের সংঘবদ্ধ হওয়ার স্বাধীনতা প্রদান, অভিযোগ জানানোর নিরাপদ পরিবেশ এবং যেকোনো বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ প্রক্রিয়া গড়ে তুলতে হবে। যাতে নিজেদের দাবি আদায়ের জন্য সাধারণ শ্রমিকদের বারবার আন্দোলন বা রাজপথে নেমে আসার পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয়।
এই সামগ্রিক প্রক্রিয়ায় বৈশ্বিক ক্রেতা ও ব্র্যান্ডগুলোর দায়িত্বশীল আচরণও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও তাদের ওপর দেশীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ সীমিত, তবুও যেসব আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ থেকে নিয়মিত পোশাক সংগ্রহ করে, তাদেরও ন্যায্য পারিশ্রমিক নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় সক্রিয় অংশীদার হতে হবে। সস্তা দরে পণ্য ক্রয়ের অসম প্রতিযোগিতায় উৎপাদনকারীদের ওপর মাত্রাতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হলে তার চরম নেতিবাচক প্রভাব শেষ পর্যন্ত প্রান্তিক শ্রমিকদের ওপরই পড়ে।
কারখানার উৎপাদন ব্যয় ক্রমাগত ঊর্ধ্বমুখী থাকা সত্ত্বেও বিদেশি ক্রেতারা যদি উপযুক্ত মূল্য পরিশোধে কার্পণ্য করেন এবং অনৈতিক সুবিধা আদায়ের চেষ্টা চালান, তবে কেবল স্থানীয় মালিকদের একক পক্ষে শ্রমজীবীদের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নের পুরো আর্থিক বোঝা টানা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তাই ন্যায্য বেতনের দাবির ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডগুলোকেও যথাযথ দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে হবে এবং এ বিষয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সঠিক কৌশল অবলম্বনে সরকারকেই প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দিতে হবে।
সূত্র: আজকের পত্রিকা