
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিশাল এই অরণ্যের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন এক সিংহ। তার বিশাল শরীরের নাম ছিল ডন, আর তার ভয়ে প্রকম্পিত হতো চারপাশ। তবে বুদ্ধিমত্তার প্রশ্ন উঠলেই বনের বাসিন্দাদের মনে নানা সংশয় জাগত।
সবসময় তার ঠিক পাশেই ঘাপটি মেরে থাকত ছোট্ট এক শেয়াল। তার নাম লিডারনিয়াহু। তার একটাই মাত্র কাজ ছিল, মোড়লের কানে নানা মন্ত্রণা দেওয়া। সে বলত, অমুক বনে হামলা চালান, টার্গেট করুন তমুক এলাকাকে। নিজের স্বার্থ হাসিলের জন্য সে সিংহকে বোঝাত যে এটাই তার নিজের প্রয়োজনে দরকার। শিয়াল তাকে বিশ্বমঞ্চের মহান শাসক হিসেবে অভিহিত করত।
সেই শিয়ালের প্রতিটি পরামর্শেই অন্ধের মতো চলতেন সিংহ। শিয়াল একবার অভিযোগ করল যে পারস্যের বিড়ালটা বড় অবাধ্য, তার গোঁফের ধরনও ঠিক নেই। এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সেই অঞ্চলে বোমাবর্ষণ শুরু করলেন মোড়ল। শিয়াল আবার বলল, পাশের এলাকার ছাগলগুলো মাত্রাতিরিক্ত চেঁচামেচি করছে। সেখানেও মুহূর্তের মধ্যে আক্রমণ চালানো হলো। দূরদূরান্তের আরেকটি বনের দিকেও গর্জন ছুড়ে আসার প্ররোচনা দিল শিয়াল, যাতে কেউ দুর্বল না ভাবে। সিংহ সেখানে গিয়ে নিজের শক্তি জাহির করলেন।
খবর সংগ্রহের দায়িত্বে থাকা এক পেক্ষ সংবাদকর্মী প্রশ্ন রেখেছিলেন, আপনি কি নিজের বিচারবুদ্ধিতে দেশ চালান, নাকি ওই শেয়ালের পরামর্শে চলেন? এই কথা শুনে ভীষণ চটে যান সিংহ। তিনি ধমক দিয়ে বলেন, তুমি মিথ্যা খবর পরিবেশন করছ! তুমি একটি ভুয়া পেঁচা! চুপ থাকো!
পেঁচা তখন পাল্টা জানতে চাইল, কিন্তু এই যুদ্ধের বিপুল খরচের জোগান কে দেবে? সিংহ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে ঘোষণা করলেন, খরচের হিসাব নিয়ে মাথা ঘামানোর কোনো দরকার নেই। বিজয় অর্জিত হলেই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার ঘরে তুলবেন তিনি।
এদিকে শিয়াল কিন্তু সুখে ও নিরাপদে তার বাসগৃহে বসে সময় কাটাচ্ছিল। যুদ্ধের বলি হচ্ছিল অন্য অঞ্চল, রক্ত ঝরছিল ভিন্ন প্রজার, অথচ তার সব মূল্য পরিশোধ করতে হচ্ছিল সিংহকে। কিন্তু শিয়ালের ভূগর্ভস্থ ডেরায় নতুন শীতাতপ নিয়ন্ত্রক যন্ত্র সংযোজিত হয়েছে। সিংহ জানতে চাইলেন, তোমার ঘরে এই বিলাসবহুল এসি এল কোথা থেকে? শিয়াল চাটুকারিতার সুরে উত্তর দিল, কর্তা, এটা তো আপনারই প্রদান করা অকৃত্রিম ভালোবাসা!
এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতে দীর্ঘদিনের পুরোনো মিত্রদের সঙ্গেই বিরোধে জড়িয়ে পড়েন সিংহ। তিনি হাতিকে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে বললেন, তোমরা খাবার বেশি খাও, তাই তোমাদের ওপর বাড়তি শুল্ক বসালাম। হাতি তখন আশ্চর্যান্বিত হয়ে জবাব দেয়, মহামান্য কর্তা, আমি তো আপনার পুরনো বন্ধু! সিংহ নির্লিপ্তভাবে জানালেন, মিত্রতা আর বাণিজ্যের শুল্ক সম্পূর্ণ ভিন্ন দুটি বিষয়।
বানরকে উদ্দেশ করে তিনি বললেন, তুমি মস্ত বড় চোর, তোমার সমস্ত কলা আমি কেড়ে নেব। এই কথা শুনে বানরটি ঝটপট সমস্ত ফল নিয়ে সুউচ্চ গাছের ডালে আশ্রয় নিল এবং আর নিচে নামল না।
পুরো অরণ্যের হাটবাজারে তখন আগুন লাগার দশা। পারস্যের সীমানার ঠিক পাশেই ছিল জ্বালানি তেলের সুবিশাল খনি। সংঘাত শুরু হতেই সেই কুয়ো বন্ধ হয়ে গেল, আর তেলের মূল্য হু হু করে উর্ধ্বমুখী হলো।
মধু কিনতে গেলে গুনতে হচ্ছে দ্বিগুণ অর্থ। গাছের পাতার দাম বেড়ে গেছে তিন গুণ। বাঘের ছোট ছানাটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাবে, অথচ বাহনে দেওয়ার মতো জ্বালানি পর্যন্ত নেই। বাঘ মহাশয় নিজে গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে মন্তব্য করলেন, এই গাড়ি ঠেলার কাজটি এখন আমার নিত্যদিনের শরীরচর্চা হয়ে দাঁড়িয়েছে!
খরগোশ রানি বাজারে গিয়ে দেখল, এক মুঠো ঘাস ক্রয়ের পেছনেই তার সারা দিনের শ্রমের মজুরি নিঃশেষ হয়ে গেছে! সে চোখের জলে ভেসে প্রশ্ন করল, কর্তা, জ্বালানির মূল্য কেন এত বেশি? সিংহ মেজাজ হারিয়ে বললেন, তেলের দাম একটুও বাড়েনি, আসলে তোমাদের দেখার চোখেই গলদ রয়েছে! তোমরা তাকাচ্ছো বেশি!
বৃদ্ধ হরিণ এসে আকুতি জানাল, ঘরে এক মুঠো চাল পর্যন্ত নেই, ছোট ছোট শিশুগুলো না খেয়ে দিন কাটাচ্ছে। সিংহ পরামশ দিলেন, খাবার কম গ্রহণ করো, পরিমিত আহার বা ডায়েট করো। এই ডায়েট করলে নাকি পরমায়ু বৃদ্ধি পায়। আমি তো কেবল তোমাদের মঙ্গলের জন্যই এই পথ বেছে নিয়েছি!
বনের সাধারণ প্রাণীকুল প্রথমে চরম আতঙ্কিত হলো। এরপর তাদের মনে তীব্র বিরক্তির জন্ম নিল। দিনশেষে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠল তারা। পেটে ক্ষুধা থাকলে গর্জন ভালো লাগে না। খালি পেটে কোনো স্লোগানও মনে রাখা সম্ভব হয় না।
অবশেষে সমাগত হলো মধ্যবর্তী সেই ঐতিহাসিক নির্বাচন। হাতির দল তখনো মনে মনে ভাবছিল, ডন তো আমাদেরই আপন মানুষ, তিনিই বিজয়ী হবেন। সিংহ জিতলে শেয়ালেরও জয় হবে।
ভোটের ফলাফল গণনা করতে গিয়ে সবার চোখ কপালে ওঠার উপক্রম! সিনেটবৃক্ষ এবং হাউসবৃক্ষ উভয়ই এখন পুরোপুরি নীল গাধা দলের দখলে চলে গেছে, যাদের সবাই ডেমো নামে চেনে। মোড়লের সেই হাতি বাহিনী দুটি গাছ থেকেই শোচনীয়ভাবে ছিটকে পড়ে গেছে।
বিস্ময়ে হতবাক হয়ে চুপচাপ বসে রইলেন সিংহ। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, এ কী ধরনের কাণ্ড ঘটল? আমি তো এই বনের মঙ্গলের জন্য এত সব করলাম! এত যুদ্ধ করলাম!
ধীরে ধীরে মন্থর গতিতে এগিয়ে এলেন প্রবীণ কচ্ছপ। তিনি শান্তস্বরে বুঝিয়ে দিলেন, কর্তা, আপনি যুদ্ধ করেছেন কেবল ওই শিয়ালের ব্যক্তিগত স্বার্থ উদ্ধারের জন্য, আর তার আর্থিক খেসারত গুনতে হয়েছে আমাদের ঘরের প্রজারদের। বন্ধুকে অকারণে অপমান করেছেন, যার চড়া মূল্য পরিশোধ করেছে সাধারণ অবলা প্রাণীরা। আপনি ভেবেছিলেন কেবল গর্জন দিয়েই ভোট আদায় করা সম্ভব। কিন্তু নির্বাচন কখনো শুধু গর্জন শোনে না, ভোটের বাক্স তো কেবল বাজারের থলের ওজন বিচার করে। সেই থলে যদি শূন্য থাকে, তবে রাজাকে সিংহাসনচ্যুত হতে হয়।
পিছনের দিকে তাকিয়ে সিংহ দেখলেন, শিয়াল তখনও কানে কানে ফিসফিস করে বলছে, কর্তা, দয়া করে মন খারাপ করবেন না। আরেকটি যুদ্ধ শুরু করুন! এবার আরও বড় পরিসরে!
এবার ডন কিছুটা বিরতি নিয়ে বললেন, তুমি কি এবার একটু মুখ বন্ধ রাখবে? আমার ভোটাধিকার গেছে, আমার শাসনবৃক্ষ গেছে, আমার সম্মানও ধূলিসাৎ হয়েছে। তোমার কী এমন ক্ষতি হয়েছে? তোমার ডেরায় তো শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্রের বহর আরও বেড়েছে!
মুখের ভঙ্গি বিকৃত করে শেয়াল তখন উত্তর দিল, কর্তা, আপনার মানসিকতা পুরোপুরি বদলে গেছে।
আজ বনের বিভিন্ন গাছের গায়ে নতুন কিছু স্লোগান খোদাই করা হয়েছে—গর্জন কোনো দিন ক্ষমতা ধরে রাখে না, বরং বাজারের নিত্যপণ্যের চড়া দামই সিংহাসনে বসায় আবার সিংহাসন থেকে ছুড়ে ফেলে দেয়। আর কেবল অন্যের কানে ফিসফিসানি শুনে রাজ্য পরিচালনা করলে, দিনশেষে সেই রাজার নিজের কানটাই কাটা পড়ে যায়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।