
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মাতৃদুগ্ধের অনুপস্থিতিতে একটি শিশুর পুষ্টির যোগান নিশ্চিত করার জন্য বিকল্প হিসেবে অন্য কোনো নারীর স্তন্যপান করানোর বিষয়টি অত্যন্ত কার্যকর এবং স্বাভাবিক একটি প্রক্রিয়া হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক সময়ে কোনো এক মৃত প্রসূতির নবজাতকের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জননী খোঁজার বিষয়টি ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং প্রশ্ন তুলেছে যে জন্মের পর থেকে দুই বছর বয়স পর্যন্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই খাদ্য অন্য কেউ সরবরাহ করতে পারেন কি না। জীবনপ্রবাহের শুরু থেকেই প্রথম অর্ধযুগ পর্যন্ত পূর্ণ পুষ্টির প্রধান উৎস হলো মাতৃদুগ্ধ এবং জন্মলগ্ন থেকেই যাদের এই প্রাকৃতিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হতে হয় তাদের ক্ষেত্রে কৃত্রিম গুঁড়ো দুধের তুলনায় অন্য নারীর স্তন্যপান করানো অনেক বেশি নিরাপদ ও পুষ্টিসম্মত। বিশেষ করে যেসব শিশু নির্ধারিত সময়ের আগেই জন্ম নেয় তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এই তরল খাদ্যের গুরুত্ব অপরিসীম এবং বিশ্বের বিভিন্ন উন্নত দেশে এর জন্য নির্দিষ্ট ব্যাংকও গড়ে তোলা হয়েছে যেখান থেকে চাহিদা অনুযায়ী তা সংগ্রহ করা যায়।
তবে এই মহৎ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে চিকিৎসাবিজ্ঞান কিছু নির্দিষ্ট স্বাস্থ্যঝুঁকি ও নিরাপত্তার কথা স্মরণ করিয়ে দেয় যাতে কোনোভাবেই অপর শিশুর কল্যাণ করতে গিয়ে নিজের সন্তানের বঞ্চনা না ঘটে। স্কয়ার হাসপাতালের সংশ্লিষ্ট চিকিৎসা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ অনুযায়ী অন্য কোনো শিশুকে বুকের দুধ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে কিছু মারাত্মক সংক্রমণের উপস্থিতি সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হয়। এই তালিকায় এইচআইভি, হেপাটাইটিস বি এবং সি ভাইরাসের পাশাপাশি হিউম্যান টি-সেল লিম্ফোট্রপিক ভাইরাস ও সিফিলিসের মতো রোগ রয়েছে যেগুলো অনেক সময় কোনো উপসর্গ প্রকাশ ছাড়াই শরীরে সুপ্ত থাকতে পারে বিধায় ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমেই কেবল নিশ্চিত হওয়া সম্ভব।
এছাড়াও স্তনের গোড়ায় বা আশেপাশের এলাকায় জ্বর ঠোসার মতো হারপেস সিমপ্লেক্স ভাইরাসের কোনো ক্ষত আছে কি না তা দেখতে হবে যদিও সংক্রামিত নয় এমন পাশের অন্য স্তন থেকে এই পরিস্থিতিতেও নিরাপদ দুধ সংগ্রহ করার অবকাশ থাকে। সাধারণ জ্বর ও ব্যথার মতো শারীরিক অস্বস্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পাওয়া ব্রুসেলা সংক্রমণ কিংবা বর্তমান সময়ের মারাত্মক মাঙ্কি ভাইরাস ও ইবোলা ভাইরাসের মতো প্রাণঘাতী রোগের জীবাণু থেকেও সম্পূর্ণ মুক্ত থাকা আবশ্যক। শুধুমাত্র সংক্রামক ব্যাধিই নয় বরং স্তন্যদানকারী নারী যদি নিয়মিত ধূমপান কিংবা যে কোনো ধরনের তামাকজাত দ্রব্য সেবন করেন তবে তা ওই অবুঝ শিশুটির সুস্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।
পাশাপাশি অতিরিক্ত মাত্রায় মদ্যপান করার অভ্যাস রয়েছে এমন নারীদের ক্ষেত্রেও নবজাতক মারাত্মক শারীরিক ঝুঁকির সম্মুখীন হতে পারে যা যেকোনো মূল্যে পরিহার করা বা যাচাই করা উচিত। এমনকি রোগ নির্ণয় বা চিকিৎসার প্রয়োজনে কোনো ধরনের তেজস্ক্রিয় বা রেডিওঅ্যাকটিভ পদার্থ গ্রহণ করতে হলেও তা ওই নির্দিষ্ট শিশুর শারীরিক বিকাশের পথে বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করতে পারে। এসব বহুমুখী স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি সফলভাবে এড়ানোর একমাত্র উপায় হলো যেকোনো ধরনের সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগেই একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং তার সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ল্যাবরেটরি পরীক্ষাগুলো সম্পন্ন করা।
কোনো নারী অতীতে বা বর্তমানে কোনো ধরনের ছোঁয়াচে কিংবা কঠিন সংক্রামক ব্যাধিতে আক্রান্ত থাকলে তিনি আদতে অন্য কোনো শিশুকে স্তন্যপান করাতে পারবেন কি না এবং কত দিন বিরতি নেওয়ার পর সেই অনুমতি মিলবে তা একমাত্র চিকিৎসকই সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিতে পারেন। এছাড়া স্তন্যপান করানোর সময়ে মায়েদের বিভিন্ন ধরনের ওষুধ সেবনের ক্ষেত্রে কঠোর কিছু বিধিনিষেধ ও নিয়মকানুন মেনে চলতে হয় যা চিকিৎসকের কাছে পরিষ্কার করতে হবে। ইদানিংকালে সেবন করা যেকোনো ধরনের ওষুধপত্র, পুষ্টির পরিপূরক বা সাপ্লিমেন্ট কিংবা ভেষজ বা হারবাল চিকিৎসার বিবরণও অবশ্যই চিকিৎসকের কাছে খুলে বলতে হবে।
আমাদের দেশে প্রাতিষ্ঠানিক মাতৃদুগ্ধ ব্যাংক বা পেস্টুরাইজেশনের আধুনিক সুযোগ না থাকায় সাধারণ ঘরোয়া পরিবেশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার বিষয়টি অত্যন্ত নিখুঁতভাবে মেনে চলা ছাড়া গত্যন্তর নেই। প্রতিবার দুধ সংগ্রহ করার নির্ধারিত প্রক্রিয়ার ঠিক পূর্বে নিজের হাত এবং দুধ সংগ্রহের সঙ্গে জড়িত প্রতিটি সরঞ্জাম খুব ভালোভাবে ধুয়ে পরিষ্কার করে নিতে হবে। সংগৃহীত তরল খাদ্য সবসময় সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন পাত্রে সংরক্ষণ করতে হবে যাতে কোনো ধরনের ব্যাকটেরিয়া বা জীবাণু সংক্রমণের সুযোগ না থাকে।
সংগ্রহের পর এই খাদ্য সাধারণ কক্ষের স্বাভাবিক তাপমাত্রায় প্রায় চার ঘণ্টা পর্যন্ত সম্পূর্ণ গুণগত মান বজায় রেখে ভালো থাকে তবে যদি সরাসরি বোতলের মাধ্যমে শিশুকে খাওয়ানো শুরু হয় তবে তা দুই ঘণ্টার মধ্যে শেষ করা বা নিরাপদ রাখা উচিত। ঘরের সাধারণ রেফ্রিজারেটরের নির্দিষ্ট চেম্বারে উপযুক্ত কম তাপমাত্রায় এটি চার দিন পর্যন্ত এবং ডিপ ফ্রিজারে অত্যন্ত ঠান্ডা পরিবেশে প্রায় ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত ব্যবহারের উপযোগী অবস্থায় সংরক্ষণ করা সম্ভব।
কোনো অবস্থাতেই সরাসরি চুলার আগুনে বা মাইক্রোওয়েভ ওভেনে এই সংগৃহীত খাদ্য গরম করার কোনো সুযোগ নেই যা এর পুষ্টিগুণ নষ্ট করে দিতে পারে। একটি আলাদা পাত্রে সামান্য উষ্ণ বা ঈষদুষ্ণ জল নিয়ে তার মধ্যে দুধের বোতলটি ডুবিয়ে রাখলে তা ধীরে ধীরে স্বাভাবিক তাপমাত্রার কাছাকাছি ফিরে আসবে। ফ্রিজ বা ডিপ ফ্রিজ থেকে নামানোর পর বোতলটি মানসম্মত হওয়া জরুরি যাতে তা অতিরিক্ত তাপে ফেটে না যায় বা নষ্ট না হয়।
ডিপ ফ্রিজে বরফ হয়ে থাকা অংশ গলানোর জন্য তা প্রথমে সাধারণ ফ্রিজে রেখে দিতে হবে এবং সম্পূর্ণভাবে তরল হওয়ার পর তা চব্বিশ ঘণ্টার বেশি সময় সংরক্ষণ করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। এভাবে বরফ গলানোর পর তা পুনরায় আবার ডিপ ফ্রিজে ফিরিয়ে নেওয়াও যাবে না এবং স্বাভাবিক তাপমাত্রায় ফিরিয়ে আনার পর সর্বোচ্চ দুই ঘণ্টার মধ্যে তা শিশুকে খাইয়ে শেষ করতে হবে। এছাড়া অপরিণত বা প্রি-টার্ম নবজাতকদের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক যদি কোনো বিশেষ ও সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা প্রদান করেন তবে তা অবশ্যই অক্ষরে অক্ষরে পালন করতে হবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।