
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
তীব্র গরমে টেবিলের ওপর রাখা এক গ্লাস লেবুর শরবতে কয়েকটি বরফের টুকরো ফেলে দিলে কিছু সময় পর দেখা যায় বরফগুলো আকারে ছোট হয়ে গেছে এবং পানীয়টি চমৎকার ঠান্ডা হয়ে উঠেছে। প্রশ্ন জাগতে পারে, বরফ তো এমনিতেই ঠান্ডা, তবে তা দিয়ে শরবত ঠান্ডা করতে গিয়ে বরফের নিজের কী লাভ হয় এবং কেনইবা বরফ গলে তরল পানিতে পরিণত হয়। এই পুরো প্রক্রিয়াটির পেছনের রহস্য উন্মোচন করতে প্রবেশ করতে হবে তাপ ও শক্তির চমৎকার এক পরিসরে, যেখানে বরফ কেবল নিজের শীতলতা ছড়ায় না বরং শরবত থেকে তাপশক্তি শুষে নেয়। শক্তির এই পারস্পরিক আদান-প্রদানের কারণেই পানীয়টি ঠান্ডা হয় এবং বরফ ধীরে ধীরে গলে যায়।
আলোচনার শুরুতেই যে বিষয়টি পরিষ্কার করা প্রয়োজন, তা হলো তাপ এবং তাপমাত্রা কখনোই একই জিনিস নয়। কোনো বস্তু কতটা গরম বা ঠান্ডা অবস্থায় রয়েছে, তা পরিমাপ করা হয় তাপমাত্রা দিয়ে। আর তাপ হলো এমন একধরনের শক্তি, যা দুটি বস্তুর তাপমাত্রার পার্থক্যের কারণে এক বস্তু থেকে অন্য বস্তুতে স্থানান্তরিত হয়। উদাহরণস্বরূপ, চুলার ওপর বসানো পানির তাপমাত্রা ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। অন্যদিকে ফ্রিজ থেকে সবেমাত্র বের করা বরফের তাপমাত্রা সাধারণ পানির তুলনায় অনেক কম থাকে। এই পরিস্থিতিতে যদি গরম পানিতে বরফ ছেড়ে দেওয়া হয়, তবে গরম পানি থেকে বরফের দিকে শক্তি প্রবাহিত হতে শুরু করবে।
প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী বেশি তাপমাত্রার বস্তু থেকে কম তাপমাত্রার বস্তুর দিকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাপ প্রবাহিত হয়। ঠিক এই কারণেই গরম চা বরফকে শক্তি প্রদান করে এবং বরফ সেই শক্তি সানন্দে গ্রহণ করে। এর ফলে চায়ের তাপমাত্রা কমতে থাকে এবং বরফ গলতে শুরু করে। পদার্থবিজ্ঞানের ভাষায় এই ঘটনাটিকে তাপ সঞ্চালন বলা হয়। খুব সহজ করে বললে এর অর্থ হলো, গরম বস্তু ক্রমশ ঠান্ডা হতে থাকে এবং ঠান্ডা বস্তু গরম হওয়ার দিকে এগোয়। যতক্ষণ পর্যন্ত বস্তু দুটির তাপমাত্রা সম্পূর্ণ সমান না হচ্ছে, ততক্ষণ এই শক্তির আদান-প্রদান অব্যাহত থাকে।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মাথায় রাখা দরকার যে, বরফ গলেই পানীয়ের তাপমাত্রা সবসময় শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে আসে এমন নয়। গ্লাসে ঠিক কতটুকু বরফ দেওয়া হয়েছে এবং পানীয়টি ঠিক কতটা গরম ছিল, এসব বিষয়ের ওপর নির্ভর করে চূড়ান্ত ফলাফল কী হবে। যদি পর্যাপ্ত পরিমাণ বরফ দেওয়া হয় এবং কিছু বরফ গলে যাওয়ার পরও গ্লাসে অবশিষ্ট বরফ থেকে যায়, তবে স্বাভাবিক চাপে এই মিশ্রণটি প্রায় শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি তাপমাত্রায় অবস্থান করতে পারে।
এবার আসা যাক তাপমাত্রা এবং শক্তি কি একই জিনিস—এই তাত্ত্বিক প্রশ্নে। এক কাপ গরম চায়ের কথা কল্পনা করা যাক। ধরা যাক, চায়ের কাপটি রাখা রয়েছে বিশাল আকৃতির এক হিমবাহের ওপর। স্বভাবতই চায়ের তাপমাত্রা অনেক বেশি এবং হিমবাহের তাপমাত্রা অত্যন্ত কম। কিন্তু তা সত্ত্বেও হিমবাহটিতে থাকা মোট শক্তির পরিমাণ এক কাপ চায়ের ভেতরে থাকা মোট শক্তির চেয়ে অনেক বেশি। এর মূল কারণ হলো হিমবাহে উপস্থিত পানির কণার সংখ্যা অগণিত। প্রতিটি ক্ষুদ্র কণার নির্দিষ্ট কিছু শক্তি রয়েছে এবং সব কণার শক্তি একত্র করলে মোট শক্তির পরিমাণ বিশাল হয়ে দাঁড়ায়। পক্ষান্তরে, এক কাপ চায়ের ভেতর কণার সংখ্যা তুলনামূলকভাবে অনেক কম থাকে।
পানি বা যেকোনো পদার্থ মূলত অসংখ্য অতি ক্ষুদ্র কণা নিয়ে গঠিত, যা সর্বদা গতিশীল অবস্থায় থাকে। সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী, কোনো পদার্থের তাপমাত্রা যত বেশি হয়, তার ভেতরের কণাগুলোর গড় গতিশক্তিও তত বেশি হতে থাকে। গরম চায়ের কণাগুলো তাই বরফের কণাগুলোর তুলনায় গড়ে অনেক বেশি শক্তি নিয়ে চারদিকে ছোটাছুটি করে। যখন চায়ের সঙ্গে বরফের সরাসরি সংস্পর্শ ঘটে, তখন চায়ের কণা এবং বরফের পৃষ্ঠের কণাগুলোর মধ্যে শক্তির আদান-প্রদান শুরু হয়। চায়ের কণাগুলো তখন শক্তি হারাতে থাকে এবং বরফের কণাগুলো সেই শক্তি লাভ করতে শুরু করে। ঠিক এই কারণেই চায়ের তাপমাত্রা কমতে থাকে এবং বরফের তাপমাত্রা বাড়তে থাকে।
এখানেই লুকিয়ে রয়েছে পুরো প্রক্রিয়াটির আসল চমক। বরফের তাপমাত্রা শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে পৌঁছানোর পরও যদি সেটি বাইরে থেকে আরও শক্তি পেতে থাকে, তবে সেই শক্তির প্রভাবে যে তাপমাত্রা আরও বাড়তেই হবে, এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বরং প্রাপ্ত শক্তির একটি বড় অংশ বরফকে কঠিন অবস্থা থেকে তরল পানিতে রূপান্তরিত করার কাজে ব্যয় হয়। বরফের ভেতরের পানির অণুগুলো একটি নির্দিষ্ট সুনির্দিষ্ট বিন্যাসে অবস্থান করে বলেই বরফ কঠিন আকার ধারণ করে। যখন বরফ গলতে শুরু করে, তখন অণুগুলোর এই সুনির্দিষ্ট বিন্যাসের পরিবর্তন ঘটে। বরফকে তরল পানিতে পরিণত করার জন্য যে শক্তির প্রয়োজন হয়, তা মূলত পদার্থের অবস্থা পরিবর্তনেই ব্যবহৃত হয় এবং এই পুরো সময়জুড়ে বরফের তাপমাত্রা প্রায় একই থাকে।
বিষয়টি আরও পরিষ্কার করার জন্য একটি সহজ উদাহরণ দেওয়া যেতে পারে। বরফের একটি টুকরো যদি শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসে থাকে, তবে সেটিকে ঠিক শূন্য ডিগ্রি সেলসিয়াসের পানিতে রূপান্তর করতে হলেও বাইরে থেকে শক্তি সরবরাহ করতে হবে। শক্তি পাওয়া মানেই যে তাপমাত্রার পারদ ওপরে উঠবে, তা সবসময় সত্য নয়; মাঝে মাঝে সেই শক্তি পদার্থের ভৌত অবস্থা বদলাতেও কাজে লাগতে পারে। ঠিক এই কারণেই বরফ গলার প্রক্রিয়ায় প্রচুর পরিমাণে তাপ শোষণ করতে পারে। পানীয় থেকে এই তাপশক্তি শুষে নেওয়া হয় বলেই পানীয়টি দ্রুত ঠান্ডা হয়।
শক্তির সংরক্ষণশীলতা নিয়ে কথা বলতে গেলে মনে রাখতে হবে যে শক্তি কখনো চিরতরে হারিয়ে যায় না। শক্তি কেবল এক স্থান থেকে অন্য স্থানে স্থানান্তরিত হতে পারে কিংবা একধরনের শক্তি থেকে অন্য ধরনের শক্তিতে রূপান্তরিত হতে পারে। কিন্তু মহাবিশ্বের মোট শক্তির পরিমাণ কখনো নিজে থেকে তৈরি বা ধ্বংস হতে পারে না। প্রকৃতির এই ধ্রুব সত্য নিয়মটিকে শক্তির নিত্যতা সূত্র নামে অভিহিত করা হয়। পাহাড়ে ওপর একটি পাথর স্থির হয়ে পড়ে আছে, সেখান থেকে গড়িয়ে নিচে নামতে শুরু করলে তার অবস্থানের কারণে জমা থাকা শক্তি গতিশক্তিতে রূপ নিতে শুরু করে। পাথরটি যখন নিচে মাটিতে এসে সজোরে আঘাত করে, তখন সেই শক্তির কিছু অংশ শব্দ ও তাপ উৎপন্ন করে। অর্থাৎ শক্তি হারিয়ে যায়নি, কেবল তার রূপের বদল ঘটেছে।
বরফ এবং পানীয়ের মধ্যকার সম্পর্কের ক্ষেত্রেও শক্তির এই নিখুঁত হিসাবটি একইরকমভাবে প্রযোজ্য। গরম পানীয় যে পরিমাণ শক্তি হারাতে থাকে, বরফ তার কিয়দংশ নিজের মধ্যে গ্রহণ করে। সেই শক্তির একাংশ বরফের তাপমাত্রা বাড়াতে সাহায্য করে এবং যখন বরফ গলতে শুরু করে, তখন শক্তির একটি বড় অংশ বরফকে পুরোপুরি পানিতে পরিণত করার কাজে ব্যয় হয়ে যায়।
সবশেষে প্রশ্ন আসতে পারে, বরফ দেওয়া ঠান্ডা পানীয় কেন বেশিক্ষণ তার শীতলতা ধরে রাখতে পারে না। বরফ মেশানো কোনো শরবত যদি টেবিলে দীর্ঘক্ষণ ফেলে রাখা হয়, তবে তা আবার ধীরে ধীরে গরম হতে শুরু করে। এর কারণ হলো কক্ষের ভেতরের বাতাস শরবতের তুলনায় কিছুটা উষ্ণ থাকে। এমনকি গ্লাসটি হাত দিয়ে ধরে রাখলেও হাতের উষ্ণতা থেকে তাপ শরবতের ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। ফলে চারপাশ থেকে পরিবেশের শক্তি সংগ্রহ করে বরফ আরও দ্রুত গলতে শুরু করে। একসময় বরফ সম্পূর্ণ শেষ হয়ে গেলে পানীয়ের তাপমাত্রাও ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে। তাই গরমের দিনে ঠান্ডা পানীয়ের আসল স্বাদ উপভোগ করতে চাইলে বরফ মেশানোর পর তা বেশিক্ষণ ফেলে না রেখে দ্রুত পান করা উচিত। তাছাড়া গ্লাসের গায়ে বরফের টুকরোগুলোকে ঘুরপাক খেতে দেখলে সঙ্গে সঙ্গে বুঝে নেওয়া যায় যে বরফটি পানীয়ের ভেতর থেকে শক্তি শুষে নিজের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।