
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
চারপাশে তীব্র খুনখারাবি ও ঘৃণার আবহ, এক অব্যক্ত ভোঁতা যন্ত্রণা এবং জালে বন্দি মাছের মতো চরম অসহায়ত্ব মনের ভেতর জাঁকিয়ে বসেছিল। চেতনা ফিরে পাওয়ার পর চোখ মেলে দেখতে পাই, আমি ধবধবে সাদা চাদর বিছানো একটি হাসপাতালে শুয়ে আছি। জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে একটা দুর্গম পাহাড়ি ছায়া চোখে পড়ে, আর কান পাতলে সকালের ব্যস্ত শহরের নানা আওয়াজ ভেসে আসে। ফিনাইলের গন্ধে ভারী হয়ে আছে পুরো হাসপাতালের পরিবেশ।
এটি একটি মিশনারি হাসপাতাল, যার দেয়ালে ঝোলানো ছবির ঠিক বিপরীতে যিশু অভয় মুদ্রা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। এমন সময় সাদা পোশাক পরা কোমল মুখের এক নার্স সেখানে এলেন এবং দারুণ উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে জানতে চাইলেন আমার জ্ঞান ফিরেছে কি না। ঠিক তখনই সাদা চামড়া, ধূসর চুল ও নীলচে চোখের এক বিদেশি বয়স্ক মানুষকে দেখতে পেলাম। তাঁর মুখের ভাব দেখে মনে হলো তিনি বেশ স্বস্তি পেয়েছেন এবং তাঁর হাতে থাকা স্টেথোস্কোপ বলে দিচ্ছে তিনি একজন চিকিৎসক।
স্টেথোস্কোপের ডায়াফ্রাম আমার বুকের চামড়া ও মাংসপিণ্ডের দেওয়ালের সঙ্গে চেপে ধরে তিনি বুঝতে চাইলেন বুকের ভেতর আমি কোনো কিছু লুকিয়ে রেখেছি কি না। আমার শরীরে তখনো জ্বর রয়ে গেছে এবং নার্সের রিনরিনে গলায় শুনতে পেলাম যে জ্বর এত সহজে নামবে না। ডক্টর ডেভিড ভাঙা বাংলায় আমাকে বিষয়টি নিশ্চিত করলেন। যদিও তাঁর নাম কীভাবে আমার মনে হলো তা তখনো বুঝতে পারিনি, তবে মনে হচ্ছিল আমি এঁদের নাম আগে থেকেই জানি। নার্সের নাম সরাসরি মাথায় না এলেও তা যে কিছুক্ষণের মধ্যেই চলে আসবে, তা আমি স্পষ্ট টের পাচ্ছিলাম। যে নিউরনগুলোতে নামটা জমা ছিল, তাদের ভেতর এক ধরনের কম্পন অনুভব করলাম। এক শীতল স্রোতের মতো নামটা জমা হলো এবং আমি সঙ্গে সঙ্গেই মনে করতে পারলাম নার্সটির নাম উছলা মারমা।
এর পরপরই আমি আবার এক অতল গহ্বরে তলিয়ে যেতে লাগলাম এবং যে স্রোত বেয়ে নার্সের নামটি এসে পৌঁছাল, সেই স্রোতের টানেই আমি ভেসে গেলাম। ভেসে ভেসে আমি হাজির হলাম একটা ছোট কেবিনের মতো জায়গায়, যার দেয়ালগুলো ধাতব শিটের তৈরি এবং তার ওপর সাদা রঙের প্রলেপের মতো প্লাস্টিকের শিট লাগানো। কেবিনটির একপাশে রয়েছে একটি ছোট দরজা। সেটি আসলে নাইট ডিউটির ডাক্তারের বিশ্রামকক্ষ ছিল। দরজায় সজোরে করাঘাতের শব্দ শুনে আমি বিছানা থেকে উঠে বসে বললাম, স্যার, রোগী খারাপ মনে হচ্ছে। টেবিল থেকে স্টেথোস্কোপটি তুলে গলায় পেঁচিয়ে আমি দ্রুত বেরিয়ে পড়লাম। সেটি ছিল সিলেট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ড।
রাত তখন তিনটা বাজে এবং সারাক্ষণ গমগম করা হাসপাতালটি এই সময়ে একেবারে নীরব ও নিঝুম হয়ে থাকে। কয়েকজন তরুণ একটি রুগ্ণ মানুষকে স্ট্রেচারে শুইয়ে ওয়ার্ডে নিয়ে এল, যিনি মূলত আজকের শিফটের আমাদের ওয়ার্ডের অ্যাডমিশন। সন্ধ্যা থেকে কপাল বেশ ভালোই ছিল, কারণ দুটো অ্যাকিউট অ্যাবডোমেন কেসের পর অবশেষে আরেকটি কেস এল। নতুন যে রোগীকে নিয়ে আসা হয়েছিল, তাকে দূর থেকেই দেখে বুঝতে পেরেছিলাম এটি বেশ অস্বস্তিকর একটি কেস হতে চলেছে। প্রথমত, নাকে এসে ধাক্কা দিল এক তীব্র কটু গন্ধ, যা আমার ভীষণ পরিচিত। মাংসে পচন ধরলে এই ধরনের গন্ধ তৈরি হয় এবং সেই গন্ধের তীব্রতাই শরীরকে জানিয়ে দেয় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে মৃত্যু অনিবার্য।
রোগীটি মূলত ভবঘুরে প্রকৃতির এবং সড়ক দুর্ঘটনায় রাস্তার পাশে পড়েছিল। সে অন্তত তিন সপ্তাহ আগে এই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছিল এবং অন্য কোনো জায়গা থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়েছিল। তবে বোঝাই যাচ্ছিল, সেই জায়গাটি কোনো হাসপাতাল ছিল না, বরং সম্ভবত কোনো হাতুড়ি চিকিৎসকের আস্তানা ছিল। তার বাঁ পা ও হাতে প্লাস্টার ব্যান্ডেজ করা ছিল এবং দেখে মনে হচ্ছিল সেই ব্যান্ডের ভেতরেই ইনফেকশন হয়ে পচন ধরেছে। রোগীর এমন করুণ অবস্থা দেখে এলাকার কয়েকজন তরুণ তাকে এখানে নিয়ে এসেছে। তবে এদের কেউই রোগীর সত্যিকারের আত্মীয় নয় দেখে আমি প্রথমেই একটু দমে গেলাম, কারণ সরকারি হাসপাতালে রোগীদের সঙ্গের লোকজনকে নানা ধরনের দায়িত্ব পালন করতে হয়, যা এরা স্বভাবতই করতে প্রস্তুত ছিল না। রোগীকে পৌঁছে দিয়েই এরা যথাদ্রুত সম্ভব হাসপাতাল ত্যাগ করবে এবং এ ধরনের কেস আমরা প্রায়ই পেয়ে থাকি যা নিয়ে আমাদের বেশ ভুগতে হয়।
আমি ডিউটি নার্স রিতাদিকে সঙ্গে নিয়ে রোগীর কাছে গেলাম। রিতাদি রোগী দেখেই নাক কুঁচকে ফেললেন এবং কোনো রাখঢাক না রেখেই বলে উঠলেন, আপনার সঙ্গে ডিউটি মানেই সব আজেবাজে কেস। তাঁর কথা শুনে আমি হেসে ফেললাম এবং তাঁকে ভারী মাস্ক পরার পরামর্শ দিয়ে বললাম, গন্ধটা দূর থেকেই ধাক্কা দিচ্ছে। অ্যাডমিশন ফাইল দেখে জানতে পারলাম রোগীর নাম ‘রিজু পাগল’। তাঁর সঙ্গে যে তরুণটি এখনো রয়েছে তার নাম ইকবাল। সমস্যা কী হয়েছে জানতে চাইলে ইকবাল হড়বড় করে বলে উঠল, রিজু পাগল তাদের এলাকার অনেক পুরনো একজন মানুষ এবং বহু বছর ধরেই সে সেখানে আছে। তার আপন কেউ আছে কি না, সে বিষয়ে কেউ কিছু জানে না। হঠাৎ করেই মানুষটা লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল এবং পরে তাকে বড় রাস্তার পাশের এক নর্দমায় পাওয়া যায়। তাদের ধারণা, কোনো গাড়ির সঙ্গে ধাক্কা লেগে রিজু মূল রাস্তা থেকে ছিটকে নর্দমায় গিয়ে পড়েছিল।
ইকবাল আরও জানাল, তারা ভেবেছিল লোকটি মারা গেছে, কিন্তু পরে আবিষ্কার করল যে সে এখনো জীবিত এবং তার শরীরে মারাত্মক জখম রয়েছে। তার একটা পা ভেঙে ফুলে গেছে এবং একই পাশের হাতও কবজির ওপর থেকে ভেঙে গেছে। তার চোখমুখেও জখমের স্পষ্ট চিহ্ন ছিল। তারা তখন তাকে বালতি বালতি পানি ঢেলে কোনোমতে পরিষ্কার করে কাছের এক পল্লিচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যায়। সেই চিকিৎসক তার বাঁ হাত ও পায়ে প্লাস্টার করে দেন এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গায় থাকা জখমে সেলাই করে ওষুধপত্র দিয়ে দেন। চিকিৎসক তাদের জানান যে পায়ের হাড় জোড়া লাগতে এক-দুই মাস সময় লাগবে এবং শরীরের বাকি জখম সারতে এক-দুই সপ্তাহ লাগবে। এরপর রিজুর ঠাঁই হয় কলোনির পরিত্যক্ত দারোয়ানরুমে এবং এলাকার কয়েকজনসহ আমিও তার নিয়মিত ওষুধপত্র ও খাবারের ব্যবস্থা করে আসছিলাম।
কিন্তু গত কয়েক দিন ধরে বুঝতে পারছিলাম তার শারীরিক অবস্থা ভীষণ খারাপের দিকে যাচ্ছে এবং শরীর থেকে প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বের হচ্ছে, যে কারণে বাধ্য হয়ে তাকে এখানে নিয়ে এসেছি। রোগীর ইতিহাস শোনার পর আমি ইকবালকে বুঝিয়ে বললাম এ ধরনের কেসে আমাদের কী করণীয়। ওটিতে নিয়ে আমাদের দেখতে হবে ইনফেকশন কতদূর ছড়িয়েছে। এমনও হতে পারে যে প্লাস্টার করা হাত বা পা কেটে ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় নেই। তবে সেসব চিকিৎসাও চাইলেই হুট করে করা সম্ভব নয়, কারণ রোগী অপারেশনের ঝুঁকি নিতে পারবে কি না, তা পরীক্ষানিরীক্ষা করেই তবে ঠিক করতে হবে। এরপর ইকবালকে কিছু ওষুধের তালিকা ধরিয়ে দিলাম।
ও একটা প্রশ্ন করে জানতে চাইল সব মিলিয়ে আনুমানিক কত খরচ হতে পারে। আমি তাকে একটা সম্ভাব্য খরচ জানিয়ে দিলাম এবং এও বলে দিলাম যে হাসপাতালের সঙ্গে লাগোয়া হাসপাতাল-অনুমোদিত ফার্মেসি থেকে ওষুধ কিনলে খরচ কিছুটা কম পড়বে। সে মাথা নেড়ে বোঝাল যে সে আমার কথা বুঝতে পেরেছে এবং ওষুধগুলো কিনে আনতে সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে গেল। ইকবাল যদি বলত ওষুধ জোগাড় করার মতো কোনো টাকা তার কাছে নেই, তবে হাসপাতালের গরিব রোগীদের জন্য রাখা মজুত থেকে সেগুলো জোগাড় করার চেষ্টা করতে হতো, যদিও সেখানে সব সময় সবকিছু পাওয়া যায় না। তখন আরেক দফা দুশ্চিন্তায় পড়তে হতো এবং কখনো কখনো নিজের পকেট থেকে ডোনেশন দেওয়া বা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছে সাহায্য চাইতে হতো।
আমি রোগীর ফাইল তৈরি করে রিতাদির হাতে দিয়ে দিলাম এবং আপাতত আমার কাজ শেষ হলো। এবার রিতাদির কাজ শুরু হয়, যিনি নিজে এবং ওয়ার্ড বয়দের নিয়ে রুটিন ওটিতে ঢোকার আগের সমস্ত ব্যবস্থা সম্পন্ন করবেন। এই সমস্ত ভাবনার মাঝেই ডক্টর ডেভিড আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, আসিফ, তুমি ভীষণ বাজেভাবে জখম হয়েছ। আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমার পায়ে ফ্র্যাকচার আছে এবং জানতে চেয়েছিলাম আর কিছু হয়েছে কি না। তিনি উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, তোমার ফিমার ফ্র্যাকচার হয়েছে, অর্থাৎ শ্যাফট অব দ্য ফিমার ভেঙেছে। এর পাশাপাশি পিঠে গাছের ডালে লেগে তৈরি হওয়া একটি গভীর ক্ষত রয়েছে, তবে তোমার ভাগ্য ভালো যে ফুসফুসে কোনো আঘাত লাগেনি। আর এই সমস্ত ফ্র্যাকচার ও মারাত্মক ইনজুরি নিয়ে তুমি একটা খাদে প্রায় নয় দিন ধরে পড়ে ছিলে। বান্দরবানের থানচিতে তোমাদের গাড়ি দুর্ঘটনা ঘটেছিল এবং খাদে বাস উল্টে পড়ে তিনজন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। বাকি যাত্রীরা মারাত্মকভাবে জখম হন এবং তুমিও গুরুতর আহত হয়ে নিখোঁজ ছিলে। উদ্ধারকারীরা তোমাক খুঁজে পায়নি, কারণ তুমি ছিটকে বহুদূরে এক ঝোপের আড়ালে অজ্ঞান অবস্থায় পড়ে ছিলে। দীর্ঘ নয় দিন পর স্থানীয় কয়েকজন মুরং কিশোর তোমাকে আবিষ্কার করে এবং তারাই তোমাকে এখানে নিয়ে আসে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।