
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কোনো মানুষের আচার-আচরণে যদি ইনট্রোভার্ট বা অন্তর্মুখী এবং এক্সট্রোভার্ট বা বহির্মুখী—উভয় ধরনের মানসিকতার সংমিশ্রণ লক্ষ্য করা যায়, তবে তাঁকে অ্যাম্বিভার্ট হিসেবে চিহ্নিত করা সম্ভব। স্বাস্থ্যবিষয়ক পোর্টাল ভেরি ওয়েল মাইন্ড-এর একটি প্রকাশিত প্রতিবেদনে এই বিশেষ ধরনের ব্যক্তিত্বের নানান বৈশিষ্ট্য, এর ইতিবাচক দিকসমূহ এবং ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর এর গভীর প্রভাব বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে।
মানুষের দৈনন্দিন জীবনে প্রায়শই এমন সব মুহূর্ত আসে যখন বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়া, নতুন অপরিচিত মানুষের সঙ্গে পরিচিত হওয়া কিংবা যেকোনো সামাজিক অনুষ্ঠানে সবার সঙ্গে আনন্দচিত্তে মিশে যাওয়া বেশ উপভোগ্য মনে হয়। আবার এর ঠিক বিপরীত সময়ে কোনো মানুষের সঙ্গেই কথা বলতে ইচ্ছা করে না এবং সম্পূর্ণ নিজের মতো করে একা সময় কাটাতে প্রবল মন চায়।
কখনো একজন মানুষ বেশ প্রাণবন্ত, হাসিখুশি ও মিশুক স্বভাবের পরিচয় দেন, আবার ঠিক অন্য সময়ে অত্যন্ত শান্ত ও চুপচাপ থাকেন। মানুষের স্বভাবের ভেতরে এমন বিপরীতমুখী দুটি রূপের উপস্থিতি অত্যন্ত স্বাভাবিক একটি বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয় এবং সুইস প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ কার্ল ইয়ুং এই অ্যাম্বিভার্ট ধারণাকে বিশ্বজুড়ে জনপ্রিয় করে তুলেছিলেন।
ইনট্রোভার্ট বা অন্তর্মুখী মানুষেরা সাধারণত সম্পূর্ণ একা সময় কাটানোর মাধ্যমেই তাদের হারিয়ে যাওয়া মানসিক শক্তি পুনরায় ফিরে পান। পক্ষান্তরে, এক্সট্রোভার্ট বা বহির্মুখী মানুষেরা অন্য মানুষের সঙ্গে নিয়মিত মেলামেশা করা এবং বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার মধ্য দিয়েই মূলত নিজেদের ভেতরে বিশেষ উদ্দীপনা অনুভব করে থাকেন।
যাঁরা অ্যাম্বিভার্ট প্রকৃতির হয়ে থাকেন, তাদের ব্যক্তিত্বের ভেতরে মূলত এই দুই ধরনের বৈশিষ্ট্যেরই চমৎকার এক মেলবন্ধন স্পষ্টভাবে প্রকাশ পায়। তাঁরা যেমন অন্তরঙ্গ বন্ধুদের সঙ্গে আনন্দময় সময় কাটাতে দারুণভাবে উপভোগ করেন, ঠিক তেমনি আবার কখনো কখনো সম্পূর্ণ একা থাকতেও দারুণ স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন।
একজন অ্যাম্বিভার্ট ব্যক্তির সামাজিক হওয়ার তীব্র ইচ্ছা কিংবা একান্তভাবে নির্জনতা পাওয়ার প্রয়োজনীয়তা সবসময় এক থাকে না, বরং এটি সার্বিক পরিস্থিতি, বর্তমান সময় এবং মানসিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে প্রতিনিয়ত পরিবর্তিত হতে পারে।
আপনার ভেতরে কিছু নির্দিষ্ট লক্ষণ বা বৈশিষ্ট্য উপস্থিত থাকলে আপনিও যে একজন অ্যাম্বিভার্ট, তা সহজেই অনুধাবন করতে পারবেন। এর মধ্যে প্রথম লক্ষণ হলো সামাজিকতা ও একাকিত্ব—দুটো বিষয়ের প্রতিই সমান ভালোলাগা কাজ করা, যার ফলে কখনো দলে মিশতে ভালো লাগলেও আবার কখনো ঘরে বসে নিজের মতো সময় কাটাতে ইচ্ছা করে।
দ্বিতীয়ত, অ্যাম্বিভার্ট মানুষেরা সর্বদা পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেদের আচরণ পরিবর্তন করতে পারেন এবং পরিচিত মানুষের সঙ্গে অত্যন্ত প্রাণবন্ত থাকলেও নতুন কোনো পরিবেশে উপস্থিত হলে শুরুতে তারা কিছুটা চুপচাপ ও সংবৃত থাকেন।
তৃতীয় বৈশিষ্ট্য হিসেবে বলা যায় যে, এই ধরনের মানুষেরা কেবল নিজেরা কথা বলতেই ভালোবাসেন না, বরং অন্যের কথা মন দিয়ে শুনতে সমানভাবে পছন্দ করেন এবং মতামত প্রকাশের পাশাপাশি অন্যের কথা গভীর মনোযোগ দিয়ে শোনেন।
চতুর্থত, বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে অত্যন্ত আনন্দময় ও জমজমাট সময় কাটানোর পরেও তাঁদের মনের ভেতরে কখনো কখনো বাড়তি মানসিক প্রশান্তির জন্য একটু একা থাকার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়।
পঞ্চম এবং শেষ বৈশিষ্ট্য হলো যেকোনো পরিবেশ ও মানুষের সঙ্গে তাঁরা খুব সহজেই নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেন এবং ভিন্ন স্বভাবের মানুষের সঙ্গে কেবল পরিস্থিতি বুঝে নিখুঁতভাবে যোগাযোগ রক্ষা করতে সক্ষম হন।
অ্যাম্বিভার্ট হওয়ার সবচেয়ে বড় এবং উল্লেখযোগ্য সুবিধা হলো তাদের চমৎকারভাবে মানিয়ে নেওয়ার সহজাত ক্ষমতা। প্রয়োজনের তাগিদে তাঁরা কখনো কথা বলায় দারুণভাবে সক্রিয় হন, আবার কখনো সম্পূর্ণ চুপ থেকে অন্যের কথা শুনে পুরো পরিস্থিতি বোঝার চেষ্টা করেন।
কর্মক্ষেত্র, বন্ধুত্ব কিংবা যেকোনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের ক্ষেত্রে মানুষের এই বিশেষ নমনীয়তা তাঁদের যেকোনো কঠিন পরিস্থিতির সঙ্গে খুব সহজে খাপ খাইয়ে নিতে এবং নিজেদের নির্দিষ্ট লক্ষ্যে সফলভাবে পৌঁছাতে ভীষণভাবে সাহায্য করে থাকে।
তবে মাঝেমধ্যে অ্যাম্বিভার্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে তাঁদের অত্যন্ত কাছের মানুষেরও বিভিন্ন কারণে ভুল-বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে। যেমন কোনো একটি দিন বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দারুণ আনন্দে কাটিয়ে আসার ঠিক পরের দিনই তাঁরা হয়তো সম্পূর্ণ একা থাকতে চাইতে পারেন।
এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে সঙ্গী বা কোনো বন্ধু তখন ভুলবশত এমনটা ভাবতে পারেন যে হয়তো তাঁকে জেনেশুনেই এড়িয়ে চলা হচ্ছে। এ ধরনের অনভিপ্রেত ভুল-বোঝাবুঝি কমিয়ে আনার জন্য নিজের মনের প্রয়োজনগুলো অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা অত্যন্ত জরুরি।
আপনি যে নিজের মতো করে একটু একা থাকতে চাইছেন, তার প্রকৃত অর্থ মোটেও এই নয় যে অন্য মানুষের সঙ্গে সময় কাটানো আপনার ভালো লাগে না। বরং এর আসল কারণ হলো কিছুটা নিরিবিলি সময় পেলে আপনি পরবর্তীতে আরও বেশি স্বাচ্ছন্দ্যে মানুষের সঙ্গে মিশতে পারবেন।
আপনি মূলত অন্তর্মুখী, বহির্মুখী নাকি অ্যাম্বিভার্ট—এই বিষয়টি নিখুঁতভাবে বোঝার জন্য সর্বদা খেয়াল রাখুন যে কোন নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে আপনি সবচেয়ে বেশি স্বস্তি পান এবং কোন পরিবেশে গিয়ে আপনি দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন।
প্রতিটি দিন একই রকমভাবে প্রবল সামাজিক হওয়ার কোনো প্রকার বাধ্যবাধকতা বা প্রয়োজন নেই। কখনো মানুষের সঙ্গ উপভোগ করা এবং কখনো সম্পূর্ণ নিজের মতো করে সময় কাটানো—দুটোই মানুষের জীবনের অত্যন্ত স্বাভাবিক এবং সহজাত চাহিদা।
নিজেকে কখনোই নির্দিষ্ট কোনো একটি পরিচয়ের গণ্ডির মধ্যে আটকে না রেখে নিজের মনের আসল প্রয়োজন উপলব্ধি করা সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজের স্বভাবকে পরিপূর্ণভাবে গ্রহণ করতে পারলে সম্পর্কের ক্ষেত্রে সঠিক প্রত্যাশা ও ব্যক্তিগত সীমারেখা নির্ধারণ করাও সহজতর হয়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।