
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে বর্তমানে পরস্পরকে চ্যালেঞ্জ ও তার পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানানোর প্রবণতা তীব্র আকার ধারণ করেছে। অবশ্য দৃশ্যমান পরিস্থিতি বলছে যে কোনো পক্ষই মূলত প্রতিপক্ষের দেওয়া মূল চ্যালেঞ্জ গ্রহণের সাহস প্রদর্শন করছে না।
বিজেপির শীর্ষ নেতৃত্ব বরাবরই কংগ্রেস দল এবং তাদের শীর্ষ নেতা রাহুল গান্ধীকে দেশবিরোধী হিসেবে প্রমাণের চেষ্টা করে এসেছে। গেরুয়া শিবিরের পক্ষ থেকে বহুবার দাবি করা হয়েছে যে বিদেশি শক্তির মদদে কংগ্রেস পরিচালিত হচ্ছে। তাদের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ছিল যে বিরোধীদের বিভিন্ন আন্দোলনের পেছনে রয়েছে বিদেশি উসকানি। এই প্রসঙ্গে তারা সরাসরি পাকিস্তান, চীন এবং আমেরিকার ভারতবিরোধী শক্তির ভূমিকার কথা উল্লেখ করেছে এবং মার্কিন ধনকুবের জর্জ সোরসের নামও উচ্চারণ করেছে।
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিও কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আক্রমণ শাণিত করে মন্তব্য করেছিলেন যে এই বিষয়গুলো এখন পুরোপুরি প্রকাশ্যে চলে এসেছে। তিনি দাবি করেন, বিদেশে গিয়ে গোপনে কে কার সঙ্গে বৈঠক করছে এবং কোন কোন ভারতবিরোধী শক্তি তাদের সমর্থন জোগাচ্ছে, তা এখন সম্পূর্ণ পরিষ্কার। এসব শক্তির বিরুদ্ধে কঠোরভাবে মোকাবিলা করার কথাও তিনি বলেছিলেন।
প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যের তাৎক্ষণিক পাল্টা জবাব দিয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। তিনি নরেন্দ্র মোদিকে একটি মুখোমুখি বিতর্কের প্রকাশ্য আহ্বান জানান এবং এর জন্য ২৪ ঘণ্টার একটি সময়সীমাও বেঁধে দিয়েছিলেন। তবে সেই আহ্বানে কোনো সাড়া মেলেনি। ফলে এর দুদিন পর প্রধানমন্ত্রীর নাম উল্লেখ করে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী আরেকটি ভিডিও বার্তা প্রকাশ করেন। হাতে একটি লাল গোলাপ নিয়ে সেই ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, চ্যালেঞ্জ জানানোর পর নির্ধারিত ২৪ ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও মোদিজি কোনো সাড়া দেননি। তিনি প্রধানমন্ত্রীকে মিথ্যাচার পরিহার করার আহ্বান জানিয়ে বলেন যে বিদেশি সাহায্যেই তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন এবং এখনো বিদেশের সহায়তাতেই সেই পদে টিকে রয়েছেন।
বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী তার ওই বার্তায় আরও বলেন যে প্রধানমন্ত্রী বিরোধীদের দেশদ্রোহী হিসেবে অভিযুক্ত করছেন, অথচ প্রকৃত দেশদ্রোহী কে এবং বিদেশি শক্তির সঙ্গে কার কী ধরনের যোগাযোগ রয়েছে, তা বিতর্কের মাধ্যমে স্পষ্ট হয়ে যাবে। তিনি মোদিকে তার মুখোমুখি বসে সরাসরি বিতর্কে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। রাহুল প্রস্তাব দেন যে বিতর্ক কোথায় হবে, সেই স্থান প্রধানমন্ত্রী নিজেই ঠিক করতে পারেন। টেবিলের একপাশে প্রধানমন্ত্রী বসবেন এবং অন্যপাশে তিনি নিজে থাকবেন। সরাসরি এই বিতর্ক অনুষ্ঠিত হবে এবং সেখানে সংবাদমাধ্যম উপস্থিত থাকবে যাতে গোটা দেশ তা দেখতে ও শুনতে পায়। এমনকি বিতর্কের বিচারক কে হবেন, তাও প্রধানমন্ত্রীকে ঠিক করতে বলেন এবং এক্ষেত্রে তিনি আরএসএস প্রধান মোহন ভাগবতের নামও বিচারক হিসেবে প্রস্তাব করেন। তিনি স্পষ্ট জানান যে বিতর্কের জন্য তিনি সম্পূর্ণ প্রস্তুত রয়েছেন।
ভিডিও বার্তার ধারাবাহিকতায় রাহুল বলেন যে সেই খোলামেলা বিতর্কে দেশের অর্থব্যবস্থা এবং এর কাঠামো নিয়ে আলোচনা হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কী পরিস্থিতিতে এবং কেন এত দ্রুত বাণিজ্য চুক্তি করা হলো, কেন সেই চুক্তির বোঝাপড়া শুধুমাত্র প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গেই হলো এবং কেন মন্ত্রিসভাকে এই বিষয়ে অন্ধকারে রাখা হলো, সেই প্রশ্নগুলো তুলবেন তিনি। এ ছাড়াও আদানি সংক্রান্ত মামলা কেন বন্ধ করে দেওয়া হলো এবং জেফ্রি এপস্টিন প্রসঙ্গসহ নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য তিনি উন্মুক্ত বিতর্কের তাগিদ দেন।
মোদিকে উদ্দেশ করে রাহুল আরও বলেন যে তিনি যেন ভয় না পেয়ে এই প্রস্তাবে রাজি হন, তাহলেই বোঝা যাবে কার তথ্যে কতটা সারবত্তা রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন যে প্রধানমন্ত্রী তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগের ঝাঁপি খুলে দিয়েছেন, তাই সব বিষয় জনসমক্ষে পরিষ্কার হয়ে যাওয়া উচিত। রাহুল জানান যে তার বিরুদ্ধে সম্ভবত ৪৫টি মানহানির মামলা করা হয়েছে, অথচ এই বিদেশি সংযোগের অভিযোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী কোনো মানহানির মামলা করছেন না। তিনি পরামর্শ দেন যে এই বিষয়টিও যেন মামলাভুক্ত করা হয়, যাতে বিতর্কের সময় তা নিয়েও খোলামেলা আলোচনা করা সম্ভব হয়।
রাহুলের এই দ্বিপক্ষীয় চ্যালেঞ্জের জবাবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি নিজে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি। তবে তার পক্ষ থেকে পাল্টা চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। গত বৃহস্পতিবার হরিয়ানার একটি জনসভায় রাহুল গান্ধীকে এই পাল্টা চ্যালেঞ্জ জানিয়ে অমিত শাহ বলেন যে রাস্তাঘাটে নয়, সাহস থাকলে সংসদে এসে বিতর্কে অংশ নেওয়া উচিত। সেই উদ্দেশ্যে তারা সংসদের একটি বিশেষ অধিবেশন ডাকতেও প্রস্তুত রয়েছেন বলে জানান। তবে শাহর এই চ্যালেঞ্জ বিদেশি মদদ বা কোনো ধরনের বিদেশি যোগাযোগ নিয়ে বিতর্কের জন্য ছিল না। তিনি রাহুলকে সরাসরি এসআইআর বা ভোটার তালিকা সংশোধন সংক্রান্ত বিষয়ে খোলামেলা সংসদীয় বিতর্কের চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। রাহুলের নাম ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন যে তিনি যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছেন, তখন তার উচিত মোদিজিকে একটি চিঠি লেখা। সরকার এসআইআর নিয়ে সংসদের বিশেষ অধিবেশন ডাকতে রাজি আছে এবং তিনি যেন সেই সংসদীয় বিতর্কে যোগ দেন।
উল্লেখ্য, ভোট চুরি এবং এসআইআরের মাধ্যমে ভোটার তালিকায় কারচুপি করার গুরুতর অভিযোগ তুলে রাহুল গান্ধী দাবি করে আসছেন যে এই সমস্ত কর্মকাণ্ড করা হচ্ছে একমাত্র বিজেপিকে নির্বাচনে জয়ী করার অসৎ উদ্দেশ্যে। রাহুলকে এই বিষয়ে আক্রমণ করে অমিত শাহ বলেন যে ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের সময় তো এসআইআর ছিল না, তবুও কংগ্রেস হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছিল। ২০১৯ সালের নির্বাচনেও এসআইআর ছিল না, তখনো তারা হেরেছিল। এমনকি ২০২৪ সালেও এসআইআর ছিল না এবং তারা আবারও পরাজিত হয়েছে। সম্প্রতি হরিয়ানা ও মহারাষ্ট্র বিধানসভা নির্বাচনের সময়েও কোনো এসআইআর ছিল না, অথচ ওই দুই রাজ্যেও কংগ্রেস শোচনীয়ভাবে হেরেছে। তাই এসআইআরের ওপর অনর্থক দোষ চাপানো বন্ধ করার পরামর্শ দেন তিনি।
অন্যদিকে, মোদি ও শাহর বিরুদ্ধে সংসদ এড়ানোর গুরুতর অভিযোগ করে আসছে কংগ্রেস দল। সংসদ অধিবেশন চলাকালীন দিনের পর দিন সংসদে অনুপস্থিত থাকা, অধিবেশন চলাকালে বিদেশ সফর করা এবং সংসদে সুনির্দিষ্ট প্রশ্নের উত্তর না দেওয়ার মতো বিষয়গুলো নিয়ে বিরোধীরা দীর্ঘদিন ধরে সরব রয়েছে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ মূলত সেই সংসদকেই সামনে রেখে রাহুলের চ্যালেঞ্জের এই রাজনৈতিক জবাব দিলেন। প্রকাশ্য বা রাস্তার বিতর্কের প্রসঙ্গ সম্পূর্ণ এড়িয়ে গিয়ে তিনি রাহুলের উদ্দেশে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেন যে রাস্তাঘাটে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা নৈরাজ্য সৃষ্টি না করে বরং সংসদে এসে কথা বলা উচিত। বিতর্ক করতে হলে তা সংসদেই করতে হবে এবং যদি কেউ রাস্তাঘাটে বিশৃঙ্খলা তৈরির চেষ্টা করেন, তবে বিজেপির কর্মীরা তার উপযুক্ত জবাব দিতে প্রস্তুত আছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।