
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে আজ সকালে সারি বেঁধে বসা শিক্ষার্থীদের গায়ে ছিল একই রকম পোশাক এবং তাদের সবার বয়সও প্রায় কাছাকাছি। বড় আকারের একটি ব্যানারে স্পষ্টভাবে লেখা ছিল ‘স্টাডি ট্যুর’, যা দেখলেই সহজে বোঝা যাচ্ছিল যে তারা কোনো একটি একক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকেই এসেছে।
স্টেডিয়ামে প্রবেশের সময় ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে বাংলাদেশ দল তখন বেশ বড় রকমের বিপদের মুখে পড়েছিল। প্রতিপক্ষের আমির জাঙ্গু ও জাস্টিন গ্রিভসের গড়া জুটি স্বাগতিক দলকে ধীরে ধীরে পেছনের দিকে ঠেলে দিচ্ছিল, ঠিক এমন একটি কঠিন মুহূর্তে ত্রাতা হিসেবে আবির্ভূত হন পেসার হাসান মাহমুদ।
ম্যাচে পরপর দুটি বল করে দুটি উইকেট তুলে নেন হাসান মাহমুদ, আর ঠিক তখনই গ্যালারিতে থাকা স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে শুরু হয় জোরালো স্লোগান। তাদের মধ্য থেকে একজন ‘হাসান’ বললেই সঙ্গে সঙ্গে বাকি সবাই সমস্বরে চিৎকার করে বলে ওঠে ‘উইকেট’।
হাসানের করা বলে প্রতিপক্ষের স্টাম্প ভেঙে যাওয়ার অদ্ভুত শব্দ যেন এক অন্যরকম মোহ তৈরি করেছিল তাদের মাঝে। মাঠে সরাসরি উপস্থিত থেকে ক্রিকেট খেলা উপভোগ করার রোমাঞ্চও তখন স্পষ্ট ফুটে উঠেছিল উপস্থিত প্রতিটি শিশুর চোখ ও মুখে।
এই পুরো অনুভূতির ব্যাপারে কথা বলতে গিয়ে ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী সামিরা জাহান তার মুখে এক চিলতে সারল্যের হাসি ফুটিয়ে তুলে নিজের অভিব্যক্তি প্রকাশ করতে শুরু করে। সে জানায় যে এর আগে কখনো তার মাঠে বসে সরাসরি খেলা দেখার সৌভাগ্য হয়নি এবং আজকের এই দিনটি তার জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতা হওয়ায় তার কাছে বিষয়টি অত্যন্ত ভালো লাগছে।
শুধু ওই শিক্ষার্থী একা নয়, সেখানে উপস্থিত প্রায় প্রতিটি শিশুর কথাতেই প্রকাশ পেয়েছিল এই ধরনের দারুণ রোমাঞ্চকর অনুভূতি। মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়ার ভাটেরা গার্লস স্কুল থেকে এই শিক্ষার্থীদের দলটিকে স্টেডিয়ামে নিয়ে এসেছিলেন ওই বিদ্যালয়েরই শিক্ষক রেজওয়ান চৌধুরী।
শিক্ষার্থীদের কেন এই ক্রিকেট মাঠে নিয়ে আসা হলো, সেই বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে শিক্ষক রেজওয়ান চৌধুরী জানান যে তাঁরা প্রতিবছরই মূলত একটি করে শিক্ষাসফরের আয়োজন করে থাকেন এবং শিক্ষার্থীদের প্রতিবার ভিন্ন ধরনের বাস্তব অভিজ্ঞতা দেওয়ার চেষ্টা করেন, যার অংশ হিসেবেই এবার তাদের ক্রিকেট মাঠে নিয়ে আসা হয়েছে।
তাদের এই শিক্ষাসফরের বহরে একই প্রতিষ্ঠানের অধীন কিডস ওয়ার্ল্ড স্কুলের শিক্ষার্থীরাও যুক্ত রয়েছে। এই বিশেষ দিনটি ওই শিশুদের জন্য ছিল প্রথাগত বই-খাতার জগৎ থেকে বেরিয়ে সম্পূর্ণ নতুন কিছু নিজ চোখে দেখার এক চমৎকার সুযোগ।
টেলিভিশনের পর্দায় খেলা দেখার সঙ্গে সরাসরি মাঠে বসে খেলা উপভোগ করার মধ্যে যে আকাশ-পাতাল তফাত রয়েছে, তা তারা প্রথমবারের মতো নিজ অনুভবে বুঝতে পারছিল। সামিরার মতো আরও অনেক শিক্ষার্থীর জন্যই মাঠে বসে খেলা দেখার এটিই ছিল জীবনের প্রথম কোনো ঘটনা।
ষষ্ঠ শ্রেণির অপর এক শিক্ষার্থী নুসরাত আক্তারও ঠিক একই ধরনের অনুভূতির কথা প্রকাশ করে জানায় যে সে এর আগে টিভিতে খেলা উপভোগ করেছে, কিন্তু মাঠে সশরীরে এসে এত কাছ থেকে খেলোয়াড়দের দেখতে পাওয়ার অনুভূতি সম্পূর্ণ আলাদা। সবাই মিলে একসঙ্গে গলা ফাটিয়ে চিৎকার করায় তার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বাসে চড়ে স্টেডিয়ামে এসে পৌঁছান তাদের বেশ কজন অভিভাবকও, যারা খেলা চলাকালীন সময়ে স্টেডিয়ামের বাইরে অপেক্ষা করছিলেন। তাঁদেরই একজন রেহানা বেগম নিজের জীবনের প্রথমবার ক্রিকেট খেলা দেখতে এসেছেন এবং ক্রিকেট খেলাটি সম্পর্কে তাঁর নিজের খুব একটা পরিষ্কার ধারণাও নেই।
তা সত্ত্বেও তিনি মন্তব্য করেন যে পড়াশোনার পাশাপাশি শিশুদের নানা ধরনের খেলাধুলার সঙ্গে পরিচিত হওয়া অত্যন্ত জরুরি এবং এই ধরনের শিক্ষামূলক আয়োজন তাদের জন্য দারুণ একটি অভিজ্ঞতা বয়ে আনে। এখানে এসে শিশুরা শুধু যে খেলা উপভোগ করছে তা নয়, বরং তারা দলবদ্ধভাবে একসঙ্গে সময় কাটানোর বিষয়টিও হাতে-কলমে শিখছে।
মাঠে খেলা চলাকালে একদিকে যেমন কোনো উইকেট পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই গ্যালারি থেকে উল্লাসের আওয়াজ ভেসে আসছে, ঠিক তেমনি কোনো চমৎকার শট দেখলেই শিক্ষার্থীরা হাততালি দিয়ে উৎসাহ জোগাচ্ছে। ক্রিকেটের সমস্ত জটিল নিয়মকানুন হয়তো তাদের অনেকের কাছেই খুব ভালোমতো পরিষ্কার নয়, তবে এই বিষয়গুলো তাদের কাছে মোটেও মুখ্য কোনো বিষয় নয়, কারণ তাদের কাছে আসল ব্যাপারটি হলো আনন্দ উপভোগ করা। ভাটেরা গার্লস স্কুলের প্রায় তিন শ শিক্ষার্থীর কাছে আজকের এই পুরো দিনটিতে ক্রিকেটই হয়ে উঠেছে তাদের একমাত্র শিক্ষাসফর।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।