
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মাত্র এক টাকা অর্থদণ্ড পরিশোধের জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থীকে ব্যাংকে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে। গ্রন্থাগার থেকে গ্রন্থ হস্তান্তরে সাত থেকে আট দিন বিলম্ব ঘটার ফলেই তরুণ শিক্ষার্থীদের এমন বিড়ম্বনার মুখোমুখি হতে হয়। বর্তমান ডিজিটাল যুগে এই অদ্ভুত নিয়ম অনেকের কাছেই বেশ অবিশ্বাস্য ঠেকে। অথচ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল গ্রন্থাগার এবং এর অধীনস্থ বিজ্ঞান পাঠাগারে বছরের পর বছর ধরে এই পুরোনো প্রথাই চলে আসছে। বিদ্যাপিঠের অন্যান্য অনেক কার্যক্রম ডিজিটাল করা হলেও পাঠাগারের এই অর্থদণ্ড দেওয়ার নিয়মটি অদ্যাবধি অপরিবর্তিত রয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার এই বিষয়টি পুনরায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের এক শিক্ষার্থী নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আইডিতে একটি পোস্ট দেন। নাবিলা হক নামের ওই শিক্ষার্থী জানান যে গ্রন্থ হস্তান্তরে আট-নাইন দিন বিলম্ব হওয়ায় বিজ্ঞান পাঠাগার থেকে তাকে এক টাকা জরিমানা করা হয়েছে। ওই অর্থ ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্র সংলগ্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে জমা দিতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিজ্ঞান পাঠাগার মূল গ্রন্থাগারের অধীনে পরিচালিত হলেও বিভিন্ন আবাসিক হল ও বিভাগীয় পাঠাগার নিজস্ব বিধিমালার মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
শিক্ষার্থীর প্রকাশিত পোস্টের সাথে পাঠাগার থেকে দেওয়া একটি রসিদের ছবিও যুক্ত রয়েছে। সেখানে শিক্ষার্থীর নাম, বিভাগ, আবাসিক হল এবং কার্ড সংক্রান্ত তথ্যের পাশাপাশি অর্থদণ্ডের পরিমাণ এক টাকা লেখা রয়েছে। গত তিন নভেম্বর পাঠাগারের একজন কর্মকর্তা ওই কাগজটিতে স্বাক্ষর করেছিলেন। বর্তমানে সাধারণ লেনদেনে এক টাকার কাগজের নোট সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না। বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন নোটের যে তালিকা প্রকাশ করেছিল, সেখানে এই নোট না থাকলেও ধাতব মুদ্রা বা কয়েন এখনও চালু রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেওয়া শিক্ষার্থী সংবাদমাধ্যমকে জানান যে দুর্গাপূজার ছুটির মধ্যে গ্রন্থ হস্তান্তরে নির্দিষ্ট সময় পেরিয়ে যাওয়ায় তিনি যথাসময়ে তা জমা দিতে পারেননি। তাঁর মতে, সামান্য এক টাকার জন্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের শরণাপন্ন হওয়াটাই অত্যন্ত বিরক্তিকর একটি অভিজ্ঞতা। কেন্দ্রীয় পাঠাগারের নিয়মিত পাঠক এবং একটি হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মোহাম্মদ মোস্তাকিম জানান, বিশ্ববিদ্যালয় চাইলে এই অর্থ পরিশোধের পদ্ধতিটি ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে পারে। সামান্য এক টাকা জমা দিতে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানো তরুণদের জন্য একধরনের বড় ভোগান্তি বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ওই শিক্ষার্থী আরও বলেন যে বিদ্যাপিঠের বহু সেবা এখন ডিজিটালি সম্পন্ন করা সম্ভব হচ্ছে। অর্থদণ্ড দেওয়ার প্রক্রিয়াটিও যদি ডিজিটাল মাধ্যমে করা যায়, তবে শিক্ষার্থীদের বহুমুখী সময় ও কষ্ট উভয়ই হ্রাস পাবে। তবে মূল কেন্দ্রের ওয়েবসাইট ঘেঁটে গ্রন্থ হস্তান্তরে বিলম্বের নিয়মে ভিন্নতা দেখা গেছে। ওয়েবসাইটের বিবরণীতে বিলম্বের প্রথম দুই সপ্তাহে পঞ্চাশ পয়সা এবং পরবর্তীতে এক থেকে তিন টাকা জরিমানের কথা বলা হলেও তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে পুরোনো বিধিমালার চতুর্দশ ধারায় প্রতি সপ্তাহে প্রতি গ্রন্থে পঁচিশ পয়সা অর্থদণ্ডের কথা বলা আছে, যা হিসাব দপ্তরে নগদে আদায়ের কথা বলা হলেও বর্তমানে আর্থিক প্রতিষ্ঠানে পাঠানো হচ্ছে।
অন্যান্য সকল ফি ডিজিটাল পদ্ধতিতে নেওয়া হলেও এক টাকা জমা দেওয়ার জন্য এই ঝামেলার বিষয়টি নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। চলতি বছরের মে মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল যে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন জামানত ও ফি ডিজিটাল মাধ্যমে জমা দিতে পারবেন। শিক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘব করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল যাতে তাঁদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে না হয়। অর্থাৎ যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাংশে এই যুগোপযোগী ব্যবস্থা চালু হয়েছে, সেখানে কেন্দ্রীয় পাঠাগারের সামান্য অর্থ পরিশোধে এখনও আর্থিক প্রতিষ্ঠানই একমাত্র ভরসা হিসেবে টিকে আছে।
চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ বছরের পুরোনো এই নিয়মটিকে সম্পূর্ণ অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেছেন কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক। তিনি সংবাদমাধ্যমকে জানান যে সামান্য অর্থ আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জমা দেওয়ার এই নিয়ম দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। বর্তমানে এটিই একমাত্র পদ্ধতি হলেও অল্প পরিমাণ অর্থ জমা দেওয়ার বিকল্প কোনো মাধ্যম চালু করা যায় কি না, সে বিষয়ে তিনি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করবেন বলে জানিয়েছেন।
অন্যদিকে এই প্রক্রিয়ার পেছনে তরুণদের সতর্ক করার একটি উদ্দেশ্য রয়েছে বলে মনে করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী। তিনি জানান যে সব লেনদেন আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হওয়ায় এই নিয়মও বজায় রাখতে হয়। অল্প জরিমানা দেওয়ার এই প্রক্রিয়াটি একধরনের শাস্তি হিসেবে কাজ করে বলে তিনি মন্তব্য করেন। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ভবিষ্যতে সচেতন হবেন বলে আশা করা হলেও তিনি পুরোনো এই ব্যবস্থা পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। কিউআর কোড ব্যবহার করে অর্থ পরিশোধের ব্যবস্থা চালুর বিষয়েও প্রশাসন কাজ করবে বলে তিনি আশ্বস্ত করেছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।