
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কুমিল্লা জেলার ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলায় রাষ্ট্রীয় কোনো ধরনের সম্মাননা বা গার্ড অব অনার প্রদান ছাড়াই পরলোকগমন করেছেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সাত্তার। তাঁর বয়স হয়েছিল আটাত্তর বছর। এই অভূতপূর্ব ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ জানিয়েছেন প্রয়াতের পরিবারবর্গ এবং স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধারা। দাফনকার্য সম্পন্ন হওয়ার সময় উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন না, যার ফলে তাকে এই সম্মান জানানো হয়নি বলে জানিয়েছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
গত বৃহস্পতিবার অর্থাৎ পাঁচ নভেম্বর সকালের দিকে রাজধানী ঢাকায় চিকিৎসাধীন বা অবস্থানকালীন শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন এই বিশিষ্ট ব্যক্তি। তাঁর নিজ বসতভিটা অবস্থিত উপজেলার সদর ইউনিয়নের মহালক্ষ্মীপাড়া গ্রামে। কর্মজীবনে তিনি একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে দেশের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি নিজ ছেলের সঙ্গে ঢাকায় বসবাস করে আসছিলেন।
ওই দিনই অর্থাৎ বৃহস্পতিবার সকাল এগারোটায় রাজধানীতে প্রথম জানাজার নামাজ অনুষ্ঠিত হয়। এরপর তাঁর মরদেহ গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার মহালক্ষ্মীপাড়ায় ফিরিয়ে আনা হয়। বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে তাঁর কফিনবাহী গাড়ি গ্রামের বাড়িতে এসে পৌঁছায়।
নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাষ্ট্রীয় সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে আব্দুস সাত্তারকে শেষবিদায় জানানোর জন্য তারা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করেছিলেন। পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা ঘটনাস্থলে উপস্থিত হলেও শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের কোনো দায়িত্বশীল কর্মকর্তা সেখানে আসেননি। পরবর্তীতে কোনো গার্ড অব অনার ছাড়াই মাগরিবের নামাজের পর জানাজা সম্পন্ন হয় এবং পারিবারিক কবরস্থানে এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে চিরনিদ্রায় শায়িত করা হয়।
প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধার ভাই মো. শাহজাহান গভীর আক্ষেপ প্রকাশ করে গণমাধ্যমকে জানান, তারা অত্যন্ত আন্তরিকভাবে চেয়েছিল তাদের ভাইকে শেষ সম্মানটুকু প্রদর্শন করে চিরবিদায় দিতে। কিন্তু নানা জটিলতায় তা আর সম্ভব হয়ে ওঠেনি। যে মানুষটি দীর্ঘ নয় মাস অস্ত্র ধারণ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য যুদ্ধ করেছিলেন, সেই মানুষটিই মৃত্যুর পর তার প্রাপ্য সম্মান থেকে বঞ্চিত হলেন।
এই পুরো বিষয়টি নিয়ে ব্রাহ্মণপাড়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অর্থাַৎ ওসি মো. ফারুক হোসেন শুক্রবার সন্ধ্যায় জানান, তারা গার্ড অব অনার প্রদানের জন্য পুলিশ দল পাঠিয়েছিলেন। এমনকি পুলিশ লাইন থেকে শোকের বিউগলের সুর বাজানোর জন্যও একটি দল সেখানে উপস্থিত হয়েছিল। তবে উপজেলা প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বা প্রতিনিধি উপস্থিত না থাকায় পুলিশ একা একা সেই গার্ড অব অনার প্রদান করতে পারেনি।
শুক্রবার সন্ধ্যায় এই ঘটনার ব্যাপারে বক্তব্য জানতে ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুন্নী ইসলামের সরকারি মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি। তবে পরবর্তীতে তিনি স্থানীয় সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে জানান, সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত গার্ড অব অনার প্রদর্শন করা হয়ে থাকে এবং সন্ধ্যার পরে এই সম্মান জানানোর কোনো নিয়ম নেই। তিনি আরও দাবি করেন, তারা প্রস্তুতি নিলেও ঢাকা থেকে মৃতদেহ আনা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের মধ্যে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল এবং মাগরিবের নামাজের পর কেউ তাদের সঙ্গে আর যোগাযোগ করেনি, যে কারণে তা দেওয়া সম্ভব হয়নি। তিনি দাবি করেন বিষয়টি জানতে পারলে তারা অবশ্যই সেখানে যেতেন।
অন্যদিকে, ব্রাহ্মণপাড়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার ইদ্রিস মিয়া ভিন্ন কথা বলেছেন। তিনি জানান, তারা উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে শুরু থেকেই সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছিলেন এবং গার্ড অব অনার ও সশস্ত্র সালাম প্রদর্শনের জোরালো অনুরোধও জানিয়েছিলেন। কিন্তু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বা ইউএনও তাদের স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছিলেন যে সন্ধ্যার পর গার্ড অব অনার দেওয়ার কোনো বিধান বা নিয়ম নেই।
কুমিল্লা জেলার জেলা প্রশাসক রোজী আকতার এই বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে জানান, সাধারণত সূর্যোদয় থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্তই গার্ড অব অনার প্রদর্শনের বিধান রয়েছে। তবে তিনি এও যোগ করেন যে, তার কোনো প্রতিবেশী মারা গেলে তিনি কখনো ঘরে বসে থাকতে পারেন না। এই ধরনের স্পর্শকাতর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কিংবা তাঁর কোনো না কোনো প্রতিনিধির অবশ্যই সেখানে উপস্থিত থাকা উচিত ছিল। তাদের উচিত ছিল বীর মুক্তিযোদ্ধার শোকাহত পরিবারের প্রতি যথাযথ সম্মান ও সহানুভূতি প্রদর্শন করা।
জেলা প্রশাসক মহোদয় আরও জানান, ব্রাহ্মণপাড়ার এই অনভিপ্রেত ঘটনাটির বিষয়ে ইতোমধ্যে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ অর্থাৎ ক্যাবিনেট এবং সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় কমিশনারকে বিস্তারিত অবিহিত করা হয়েছে। পাশাপাশি, ব্রাহ্মণপাড়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে এই সমগ্র বিষয়ের ওপর একটি সুনির্দিষ্ট প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরবর্তী প্রয়োজনীয় আইনানুগ ও প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।