
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সোশ্যাল মিডিয়ায় রিলস প্রকাশ করলেই বিপুল পরিমাণে লাইক ও কমেন্ট পাওয়া জনপ্রিয় কনটেন্ট ক্রিয়েটর সামিউল ভাই অমর একুশে বইমেলায় নিজের একটি বই প্রকাশ করেছেন। তাঁর ফেসবুক পেজে অনুরাগীর সংখ্যা ২১ লাখ ৩ হাজার ৫২৬ জন এবং নামের সঙ্গে ডিজিটাল ক্রিয়েটর ও কনটেন্ট কিং উপাধি যুক্ত করতে করতে তাঁর আঙুলে কড়া পড়ে গেছে। বিপুল এই ভক্তসমাজ দেখে তাঁর মনে লেখক হওয়ার শখ জাগে এবং তিনি ‘জীবনের গতিপথ, যেভাবে বদলায়’ শিরোনামে একটি বই লিখে ফেলেন।
লেখকের এত বিশাল ফ্যানবেজ দেখে প্রকাশনা সংস্থার মালিকের ধারণা হয়েছিল যে, অন্তত এক লাখ অনুরাগীও যদি বইটি সংগ্রহ করে, তবে তিনি রাতারাতি ধনী হয়ে যাবেন। মেলা প্রাঙ্গণে প্যাভিলিয়নের সামনে বড় ব্যানারে সামিউল ভাইয়ের আকর্ষণীয় ছবি টানানো হলেও গোটা বইমেলাজুড়ে তাঁর বইটি মাত্র ৩৩ কপি বিক্রি হয়েছে। এর মধ্যে আবার একটি করুণ পারিবারিক ও স্বজনপ্রীতির ইতিহাস রয়েছে, যার মধ্যে ছোট চাচা ৫ কপি, মামা ৩ কপি এবং খালাতো ভাই দোকানদারের নিকট থেকে বাকিতে ৩ কপি সংগ্রহ করেছে, যার মূল্য পরের সপ্তাহে পরিশোধ করার কথা।
রক্তের সম্পর্কের বাইরের সাধারণ পাঠকদের কাছে সর্বসাকুল্যে মাত্র ২২ কপি বিক্রি হয়েছে এবং তাঁর বন্ধুরা একটি কপিও সংগ্রহ করেনি। মেলা চলাকালে বিকেল চারটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত তাঁর স্টলের সামনে ভক্তদের সেলফি তোলার তীব্র হিড়িক লেগে থাকত এবং তিলধারণের জায়গা থাকত না। অনুরাগীরা এসে বলত যে তারা বস সামিউল ভাইয়ের চরিত্রের ভক্ত এবং একটি সেলফির অনুরোধ করত, তখন লেখক পোজ দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে এক হাতে দাঁত বের করে হেসে অন্য হাতে বইটি বাড়িয়ে দিয়ে বলতেন বইটি উল্টে দেখলেই রিয়েল সাকসেস পাওয়া যাবে।
ভক্তরা উৎসাহ নিয়ে বইটি হাতে নিয়ে দুই পাতা উল্টে চমৎকার প্রিন্টিংয়ের প্রশংসা করে রিলসে তাঁর চুল আরও সুন্দর লাগে বলে মন্তব্য করত এবং আইফোন দিয়ে সেলফি তুলে চলে যেত। তারা ফেসবুকে চেক-ইন দিয়ে বইমেলা জমানোর কথা লিখে মাস্ট রিড ক্যাপশন জুড়ে দিলেও বইটি কেনার কথা তাদের মাথায় আসত না। স্টলের কাউন্টারে বসে ঘাম মুছতে থাকা সামিউল ভাইয়ের কাছে এক তরুণী এসে কাঁদো কাঁদোস্বরে বইটি মাখনের মতো জোশ বলে দাবি করলে তিনি সেরা অধ্যায় কোনটি জানতে চান।
তখন তরুণী দাঁত কেলিয়ে জানায় যে সে বই পড়েনি, বরং লেখকের ছবির পাতাটি ছিঁড়ে ডায়েরিতে লাগিয়ে লাভ ইউ বলে সেলফি তুলে পালিয়ে যায়। এ দৃশ্য দেখে সামিউল ভাইয়ের হাউমাউ করে কাঁদতে ইচ্ছা করলেও মানুষের ভিড়ের কারণে তা সম্ভব হয়নি। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ফেসবুকে নোটিফিকেশনের বন্যা বইতে থাকে এবং ২১ লাখ অনুসারী স্ট্যাটাস দেয় যে তারা মেলায় গিয়ে দারুণ আড্ডা দিয়ে বইয়ের সঙ্গে ছবি তুলেছে এবং বইটি ফাটাফাটি চলছে।
কমেন্ট বক্সে সবাই বাহ্বা দিয়ে আগুনের ইমোজি দিলেও ক্যাশ বাক্সে কেবল ৩৩টি বইয়ের বিক্রয়মূল্যই জমা হয়েছে। সন্ধ্যায় চা খাওয়ার সময় পকেট হাতড়ে সামিউল ভাই বুঝতে পারেন যে তাঁর লেখক হওয়ার স্বপ্ন থাকলেও চায়ের বিল পরিশোধের পর্যাপ্ত অর্থ নেই। মানুষ সেলফি তুলে বাহ্বা দিলেও ফেসবুকের লাইক, কমেন্ট ও শেয়ার দিয়ে তো আর ভাতের হাঁড়ি চড়ে না। পরিশেষে, একুশ লাখ মানুষ তাঁকে অনুসরণ করলেও তাদের মধ্য থেকে এক লাখ মানুষও বই কিনতে রাজি না হওয়ায় সামিউল ভাই মনে মনে প্রতিজ্ঞা করেন যে তিনি আর কখনো বই ছাপাবেন না এবং ফেসবুক ও টিকটকে রিলস বানিয়েই চাল-ডাল কিনবেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।