
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
স্বাভাবিক জীবনযাপনে মানুষ নিয়মিত চোখের পলক ফেলে থাকে। তবে ছোটোরা যখন মুঠোফোনে কোনো ভিডিও দেখতে থাকে কিংবা ভিডিও গেমে ব্যস্ত হয়ে পড়ে, তখন তাদের পলক ফেলার স্বাভাবিক প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়। এর ফলে চোখের ওপর যে আর্দ্রতার স্তর থাকে তা খুব দ্রুত বাষ্পীভূত হয়ে যায়। এর পরিণতিতে চোখে নানা রকম অস্বস্তি দেখা দিতে পারে, যেমন—চোখ জ্বালাপোড়া করা, চোখ লালচে বর্ণ ধারণ করা, খচখচ করা অথবা চোখ দিয়ে অকারণে অতিরিক্ত পানি প্রবাহিত হওয়া।
বর্তমান সময়ে সারা পৃথিবী জুড়েই শৈশবে মায়োপিয়া বা ক্ষীণদৃষ্টির মতো সমস্যা আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এই রোগটিতে আক্রান্ত হলে দূরের কোনো বস্তু বা দৃশ্য স্পষ্টভাবে দেখতে পাওয়ার ক্ষেত্রে জটিলতা তৈরি হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এমন তথ্য উঠে এসেছে যে, দীর্ঘক্ষণ খুব কাছের কোনো বস্তুর দিকে মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকা এবং ঘরের বাইরে মুক্ত আলো-বাতাসে সময় কাটানোর পরিমাণ কমে যাওয়ার সঙ্গে এই ক্ষীণদৃষ্টির সরাসরি সংযোগ রয়েছে। তবে এককভাবে শুধু মুঠোফোন ব্যবহারের ফলেই যে এই রোগটি হয়, এমন কোনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত এখনো গবেষকেরা দেননি, কারণ জিনগত বা বংশগত কারণগুলোও এক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
রাতের বেলা বিছানায় ঘুমাতে যাওয়ার প্রাক্কালে দীর্ঘ সময় ধরে এই ডিভাইসগুলো ব্যবহার করলে ছোটোদের ঘুমিয়ে পড়ার স্বাভাবিক ছন্দে দারুণভাবে ব্যাঘাত ঘটে। ডিজিটাল পর্দার তীব্র উজ্জ্বল আলো এবং নানা ধরনের মনস্তাত্ত্বিক উত্তেজনা সৃষ্টিকারী দৃশ্য বা খেলা ছোটোদের রাতে সহজে ঘুম না আসার প্রধান কারণগুলোর অন্যতম। ঠিকমতো পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুম না হলে তার নেতিবাচক প্রভাব ছোটোদের মনঃসংযোগে, তাদের দৈনন্দিন আচরণে এবং সার্বিক শারীরিক সুস্থতার ওপর পড়তে বাধ্য।
অনেক অভিভাবকের মনে এমন একটি ভীতি কাজ করে যে, এই আধুনিক মুঠোফোনের পর্দা থেকে নির্গত আলো সরাসরি চোখের ভেতরের রেটিনাকে পুড়িয়ে বা নষ্ট করে দিতে পারে। কিন্তু সাধারণ ব্যবহারের ক্ষেত্রে স্ক্রিনের আলো মানুষের চোখের স্থায়ী কোনো ক্ষতি করে থাকে—এমন দাবির সপক্ষে এখনো কোনো শক্ত ও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। মূলত উদ্বেগের মূল বিষয়গুলো হলো দীর্ঘ সময় ধরে খুব কাছে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকা, চোখের তীব্র ক্লান্তি তৈরি হওয়া, ঘুমের স্বাভাবিক চক্র নষ্ট হওয়া এবং ঘরের বাইরে শারীরিক কার্যক্রমের পরিমাণ কমে যাওয়া।
আমেরিকান একাডেমি অব পেডিয়াট্রিকস বা মার্কিন শিশু চিকিৎসকদের সংগঠনের সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকা অনুযায়ী, দুই বছরের কম বয়সসীমার ছোটোদের ক্ষেত্রে ভিডিও চ্যাট বা কথা বলা ছাড়া অন্য কোনো কারণে স্ক্রিন বা পর্দার ব্যবহার যথাসম্ভব বর্জন করা উচিত। এছাড়া দুই থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বয়সীদের জন্য প্রতিদিন বড়জোড় এক ঘণ্টা পর্যন্ত ভালো মানের শিক্ষণীয় বা মানসম্মত বিষয়বস্তু দেখার পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে। একটু বড় বয়সীদের বেলায় তাদের বয়স, পড়াশোনা, ঘুমের প্রয়োজনীয়তা এবং শারীরিক খেলাধুলার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে স্ক্রিনের ব্যবহারের সময়সীমা কঠোরভাবে নির্ধারণ করে দেওয়া একান্ত আবশ্যক।
ছোটোদের চোখের যথাযথ সুস্বাস্থ্য ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য কয়েকটি স্বাস্থ্যকর অভ্যাসে অভ্যস্ত করা অত্যন্ত জরুরি। কোনো শিশু যদি বারবার চোখ ডলতে থাকে, পড়াশোনার বই বা ডিভাইস নাকের খুব কাছে নিয়ে আসে, দূরের কোনো জিনিস বা লেখা দেখতে কষ্ট পায়, প্রায়ই তীব্র মাথাব্যথায় ভোগে কিংবা চোখ কুঁকড়ে বা ট্যারা করে তাকানোর চেষ্টা করে, তবে দেরি না করে অবিলম্বে চক্ষু বিশেষজ্ঞের শরণাপন্ন হওয়া উচিত। প্রয়োজনে একজন অভিজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ ও বিস্তারিত চক্ষু পরীক্ষা করিয়ে নেওয়াই এই ধরনের সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত করার সঠিক পথ।
এই বিষয়ে বিস্তারিত মতামত ও পরামর্শ প্রদান করেছেন দীন মোহাম্মদ আই হসপিটাল, সোবহানবাগ, ঢাকার চক্ষু বিভাগের সম্মানিত কনসালট্যান্ট ডা. মো. আরমান হোসেন রনি।
সূত্র: আজকের পত্রিকা