
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
লর্ডস ক্রিকেট স্টেডিয়ামের ঐতিহ্যবাহী ব্যালকনিতে জার্সি খুলে উল্লাসের সেই অবিস্মরণীয় মুহূর্তটি আজও ভারতীয় ক্রিকেটের স্বর্ণালী পাতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। ২০০২ সালের ১৩ জুলাই তারিখে ন্যাটওয়েস্ট ট্রফির ফাইনালে পরাক্রমশালী ইংল্যান্ডকে পরাস্ত করে শিরোপা উঁচিয়ে ধরেছিল টিম ইন্ডিয়া।
দীর্ঘ ২৪ বছর পর ঠিক সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তটিই এখন বড় পর্দার দুটি ভিন্ন চলচ্চিত্রকে ঘিরে আইনি জটিলতা ও বিরোধের জন্ম দিয়েছে। ভারতের সাবেক সফল অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলীর স্পষ্ট অভিযোগ, তাঁর নাম, সুপরিচিতি এবং খেলোয়াড়ি জীবনের বিশেষ মুহূর্তগুলোর কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই বাণিজ্যিক স্বার্থ হাসিলের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হচ্ছে।
বিতর্কের মূল কেন্দ্রে রয়েছে হিন্দি ভাষার পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘দুসরা: ইন্ডিয়াস আদার ফ্রিডম স্ট্রাগল’, যা পরিচালনা করেছেন অভিনব দেও। ছবিটি নির্ধারিত সময় অনুযায়ী গত ২৩ অক্টোবর প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। যদিও এটি সৌরভের কোনো বায়োপিক বা জীবনীভিত্তিক চলচ্চিত্র নয়, তবুও এর মূল কাহিনি গড়ে উঠেছে রাজস্থানের একটি রক্ষণশীল পরিবারের তরুণী তারা চরিত্রটিকে কেন্দ্র করে।
ছবির প্রধান চরিত্র প্লাবিতা বোরঠাকুর অভিনীত তারা নিজের জীবনের নানা প্রতিকূলতা ও সামাজিক কড়াকড়ির বিরুদ্ধে লড়াই করার সময় সৌরভ গাঙ্গুলীর গৌরবময় ক্রিকেট ক্যারিয়ার থেকে প্রেরণা খুঁজে নেয়। চলচ্চিত্রটির পরিচালকের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে এটি কোনো বায়োপিকের আওতাভুক্ত নয়, বরং একটি ঐতিহাসিক ক্রিকেটীয় মুহূর্ত কীভাবে সাধারণ মানুষের জীবনে গভীর প্রভাব ফেলতে পারে, সেটাই এই ছবির মূল উপজীব্য।
তবে এই ছবির প্রচারণামূলক প্রচারণায় সৌরভের নাম, পরিচিতি ও ন্যাটওয়েস্ট ফাইনালের বিখ্যাত উদযাপনের দৃশ্য যত্রতত্র ব্যবহারে তীব্র আপত্তি জানিয়েছেন খোদ ভারতের সাবেক অধিনায়ক। তাঁর নিয়োজিত আইনজীবীদের জোরালো দাবি অনুযায়ী, ছবিটির অফিশিয়াল ট্রেলারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জুড়েই রয়েছে সৌরভের বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের নানা গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
শুধু ট্রেলারেই নয়, বরং অভিযোগ উঠেছে যে সিনেমাটির দ্বিতীয়ার্ধেও ন্যাটওয়েস্ট ফাইনালের ম্যাচ ও তাঁর ক্রিকেট জীবনের বিভিন্ন সোনালী অধ্যায় অত্যন্ত জোরালোভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। এর অর্থ দাঁড়ায়, যে ছবিটি কোনো বায়োপিক নয় বলে দাবি করা হচ্ছে, সেই সিনেমার ভেতরেও ঘুরেফিরে সেই সৌরভেরই উপস্থিতি রয়েছে, ঠিক যেমনটি তিনি অতীতে লর্ডসের ব্যালকনিতে আবির্ভূত হয়েছিলেন।
এই পুরো আইনি দ্বন্দ্বে হুট করেই জড়িয়ে পড়েছে সম্পূর্ণ আলাদা আরেকটি চলচ্চিত্র, যার শিরোনাম ‘দাদা: দ্য সৌরভ গাঙ্গুলী স্টোরি’। এটি মূলত সৌরভের নিজের জীবন নিয়ে নির্মিত হতে যাওয়া একমাত্র অনুমোদিত বায়োপিক। বিগত ২০২১ সালের ৫ আগস্ট লভ ফিল্মস এলএলপির সঙ্গে এসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
সেই চুক্তি অনুযায়ী সৌরভের ব্যক্তিগত জীবন, বর্ণাঢ্য পেশাগত যাত্রা, অভিজ্ঞতা ও নানাবিধ অর্জনকে পাথেয় করে যেকোনো ধরনের অডিওভিজ্যুয়াল কনটেন্ট তৈরি এবং তা বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের একচ্ছত্র বা একক অধিকার লাভ করে ওই প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটি। এই প্রকল্পে বলিউড তারকা রাজকুমার রাও অভিনয় করছেন এবং এর বায়োপিকের শুটিংয়ের কাজ ইতিমধ্যে পুরোপুরি সম্পন্ন হয়েছে।
চলচ্চিত্রটির বর্তমান মুক্তির নির্ধারিত তারিখ ঠিক করা হয়েছে ২০২৭ সালের ১৪ মে। লভ ফিল্মস কর্তৃপক্ষের দাবি, তারা এই বিশাল প্রকল্পে প্রচুর অর্থ বিনিয়োগ করেছে এবং এর বাণিজ্যিক স্বত্ব নিয়ে বিভিন্ন তৃতীয় পক্ষের সঙ্গেও কাজ শুরু করেছে। তাদের প্রবল আশঙ্কা, ‘দুসরা’ সিনেমায় সৌরভের নাম ও ক্যারিয়ারের মুহূর্তগুলো যথেচ্ছ ব্যবহার হলে তাদের অনুমোদিত বায়োপিকের বাণিজ্যিক মূল্য মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হতে পারে।
মূলত ক্রিকেট কিংবদন্তির জীবন ও পরিচিতি নিয়ে তৈরি হওয়া এই জটিল পরিস্থিতি দেখে সহজেই বলা যায় যে, মূল নায়কের বায়োপিক নিয়ে এখন আইনি লড়াই চলছে খোদ নায়কের নামেই। ভারতীয় আদালতের দোরগোড়ায় সৌরভ এবং লভ ফিল্মসের যৌথ উদ্যোগে দায়ের করা এই আবেদনে শুধু ব্যক্তিত্ব স্বত্ব লঙ্ঘনের অভিযোগই আনা হয়নি, বরং চুক্তিবদ্ধ একচ্ছত্র অধিকার নষ্ট হওয়ার বিষয়টিও অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
বাদী পক্ষের মূল চাওয়া ছিল যেন ‘দুসরা’ চলচ্চিত্রের প্রেক্ষাগৃহ এবং ডিজিটাল মাধ্যমসহ সকল প্রকার মুক্তি ও বাণিজ্যিক প্রদর্শনী সম্পূর্ণভাবে বন্ধ রাখা হয়। একই সঙ্গে ছবিটির সব ধরনের প্রচারণামূলক উপকরণ ও ভিডিও ক্লিপ ব্যবহারের ওপরও নিষেধাজ্ঞা আরোপের আবেদন জানানো হয়েছিল।
অন্যদিকে ছবিটির নির্মাতাদের পক্ষ থেকে সাফ জানানো হয়েছে যে ছবিতে মূলত একজন বিখ্যাত ক্রিকেটারের সাফল্য ও প্রতিবাদী চরিত্র থেকে অনুপ্রেরণা নেওয়ার বিষয়টি ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যা তাঁর জীবনের কোনো পূর্ণাঙ্গ গল্প নয়। ‘দুসরা’ ছবির আইনজীবী মধু গাডোদিয়া সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসকে জানিয়েছেন যে ছবিতে প্রদর্শিত ন্যাটওয়েস্ট সিরিজের ম্যাচের অরিজিনাল ফুটেজ ব্যবহারের জন্য বিসিসিআই এবং ইসিবি-র কাছ থেকে যথাযথ অনুমতি নেওয়া হয়েছে।
নির্মাতাদের আরও একটি বড় যুক্তি হলো, সৌরভের ব্যক্তিত্ব স্বত্ব থাকার অর্থ এই নয় যে তাঁর কোনো ক্রিকেট ম্যাচের সম্প্রচার স্বত্ব বা ফুটেজের মালিকানা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁর ব্যক্তিগত অধিকারে চলে আসে। তবে সৌরভের আইনি দলের পক্ষ থেকে আদালতে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছে যে, সিনেমায় সৌরভকে একধরনের সুকৌশলী ‘ছদ্ম নায়ক’ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এই ধরনের উপস্থাপনার কারণে সাধারণ দর্শকদের মনে এই ভুল ধারণার জন্ম হতে পারে যে ছবিটির সঙ্গে স্বয়ং সৌরভের সরাসরি কোনো না কোনো সংশ্লিষ্টতা কিংবা পূর্বানুমোদন রয়েছে। তাঁদের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য হলো, একটি ক্রিকেট ম্যাচের ফুটেজের মালিকানা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়, যার সঙ্গে অন্য কোনো বিষয়ের সংঘাত নেই।
কিন্তু সেই ম্যাচের ঐতিহাসিক ফুটেজের সঙ্গে সৌরভের নিজস্ব নাম, সুপরিচিত অবয়ব ও বিখ্যাত উদ্যাপনের চিত্র জুড়ে দিয়ে কোনো সিনেমার গল্প সাজানো এবং প্রচারণায় বাণিজ্যিক ফায়দা লোটা সম্পূর্ণ আলাদা একটি বিষয়। কোনো বিশেষ ফুটেজ ব্যবহারের আইনি অনুমতি পেয়ে গেলেই সংশ্লিষ্ট ক্রিকেটারের ব্যক্তিত্ব বা নাম ব্যবহারের অনুমতিও স্বয়ংক্রিয়ভাবে পাওয়া হয়ে যায় না।
আইনি পরিভাষায় ব্যক্তিত্ব স্বত্ব বা পার্সোনালিটি রাইটস শব্দটা শুনতে কিছুটা ভারী মনে হলেও এর মূল ধারণাটি অত্যন্ত সহজ ও স্পষ্ট। ব্যক্তিত্ব স্বত্ব বলতে সাধারণ অর্থে কোনো ব্যক্তির নাম, নিজস্ব ছবি, শারীরিক অবয়ব, কণ্ঠস্বর, পরিচিতি কিংবা তাঁর সঙ্গে বিশেষভাবে জড়িয়ে থাকা বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের ওপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে বোঝায়।
খুব সহজ ভাষায় বলতে গেলে, এখানে মূলত দুটি আলাদা বিষয় রয়েছে যার একটি হলো কোনো নির্দিষ্ট ক্রিকেট ম্যাচের ফুটেজ ব্যবহারের আইনি অধিকার। আর অন্যটি হলো সেই ম্যাচের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত কোনো বিশ্বখ্যাত ক্রিকেটারের নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও পরিচিতি বাণিজ্যিকভাবে ব্যবহারের আইনগত অধিকার।
চলচ্চিত্রটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তির আগেই সৌরভ গাঙ্গুলী ও লভ ফিল্মস যৌথভাবে দিল্লি হাইকোর্টের শরণাপন্ন হয়েছিলেন। তবে গত ২২ অক্টোবর আদালত নির্ধারিত সময়ে ছবিটির প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি স্থগিত করতে রাজি হননি। বিচারপতি দীনেশ ভাটের অবকাশকালীন বেঞ্চের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ ছিল যে, ছবির মুক্তির দিন মাত্র একদিন বাকি থাকায় সেই মুহূর্তে তা আটকে দিলে সুবিধার ভারসাম্য সামগ্রিকভাবে নির্মাতাদের পক্ষেই চলে যায়।
অবশেষে নির্ধারিত তারিখ অনুযায়ী গত ২৩ অক্টোবর সিনেমাটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়। একই সঙ্গে আদালত নির্মাতাদের নির্দেশ দেন যেন তারা সমস্ত অভিযোগের লিখিত জবাব দেন এবং আদালতে ছবিটির বিশেষ প্রদর্শনের ব্যবস্থা করেন, যাতে অভিযোগের বস্তুগত সত্যতা সরাসরি পরীক্ষা করে দেখা সম্ভব হয়।
পরবর্তীতে গত ২৯ অক্টোবরের নিয়মিত শুনানিতে আদালতের পক্ষ থেকে সৌরভের আইনজীবীদের সুনির্দিষ্টভাবে নির্দেশ দেওয়া হয় যে ছবির কোন কোন দৃশ্যে তাঁর ব্যক্তিত্ব স্বত্ব লঙ্ঘিত হয়েছে, তার একটি সুনির্দিষ্ট সময় উল্লেখসহ তালিকা যেন জমা দেওয়া হয়। পাশাপাশি আদালত সৌরভের অনুমোদিত বায়োপিক ছবির অফিশিয়াল চিত্রনাট্যটিও সিলগালা অবস্থায় জমা দিতে নির্দেশ দেন।
সবশেষ গতকাল এই মামলার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অন্তর্বর্তীকালীন আবেদনের ওপর নিজেদের সুচিন্তিত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন বিচারপতি তেজস কারিয়া। আদালত প্রাথমিক পর্যালোচনায় একমত হয়েছেন যে, আলোচ্য চলচ্চিত্রটিতে সৌরভের ব্যক্তিত্ব এবং প্রচার স্বত্ব লঙ্ঘনের মতো বেশ কিছু স্পষ্ট উপাদান রয়ে গেছে।
তবে আদালতের মতে, ছবিটির মূল গল্পের মূলস্রোতের সঙ্গে তাঁর পরিচিতি ও ক্যারিয়ারের স্মরণীয় মুহূর্তগুলো এমন ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছে যে সেগুলো চাইলেই সহজে ছেঁটে ফেলা সম্ভব নয়। এই বাস্তবসম্মত কারণে আদালত ছবিটির সার্বিক প্রদর্শন পুরোপুরি বন্ধের কড়া নির্দেশ দেননি।
তবে এর অর্থ এই নয় যে নির্মাতারা সম্পূর্ণ দায়মুক্তি পেয়ে গেছেন। মামলা চলাকালীন সৌরভ গাঙ্গুলীর আইনি স্বার্থ পুরোপুরি সুরক্ষার স্বার্থে আদালত নির্মাতাদের শর্ত দিয়েছেন যে তাদের দুই কোটি টাকার একটি নিঃশর্ত ব্যাংক গ্যারান্টি জমা দিতে হবে। আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে এই গ্যারান্টি আদালতের নিজস্ব রেজিস্ট্রারের কাছে জমা দেওয়ার কড়া নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পাশাপাশি ছবির একদম শুরু অংশে এবং শেষ পর্দায় হিন্দি ও ইংরেজি উভয় ভাষাতেই একটি বাধ্যতামূলক ঘোষণা বা ডিসক্লেমার যুক্ত করতে হবে। সেখানে পরিষ্কার ভাষায় লিখে জানাতে হবে যে সৌরভের নাম ও পরিচিতি ব্যবহার করার ক্ষেত্রে তাঁর কোনো ধরনের পূর্বানুমতি বা সম্মতি নেওয়া হয়নি।
আদালতের এই বিশেষ নির্দেশ কঠোরভাবে বাস্তবায়নের জন্য নির্মাতাদের মাত্র দুই দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে। ফলে সৌরভের তীব্র আপত্তি থাকা সত্ত্বেও আপাতত প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শিত হবে ‘দুসরা’।
তবে ছবির প্রদর্শনী চলার সময় পর্দা জুড়ে ভেসে উঠবে বিশেষ বার্তা যে এই জনপ্রিয় নায়কের কোনো রকম সম্মতি ছাড়াই ছবিটি নির্মিত হয়েছে। এখন বাণিজ্যিক স্বার্থের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং ব্যক্তিত্ব স্বত্ব লঙ্ঘনের এই অমীমাংসিত আইনি প্রশ্নের চূড়ান্ত নিষ্পত্তির জন্য আদালতের চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষায় দিন গুনছেন সৌরভ গাঙ্গুলী।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।