
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাজধানীর মিরপুর এলাকার একটি বাসায় ঢুকে ক্ষমতাসীন দলের সহযোগী সংগঠনের এক নেত্রীকে নির্মমভাবে পেটানোর অভিযোগ উঠেছে। গত শুক্রবার সকাল থেকে ফেসবুক ও এক্সে এই সংক্রান্ত একটি ছবিসহ ভুয়া তথ্য ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়ে। যেখানে দাবি করা হয়, এক নারীর পিঠে আঘাতের স্পষ্ট চিহ্ন রয়েছে এবং তাঁকে বাসায় ঢুকে পাশবিক নির্যাতন করা হয়েছে।
ছড়িয়ে পড়া পোস্টগুলোতে দাবি করা হয়, ওই নারীর নাম শ্রীময়ী রীতা রানী এবং তিনি মিরপুর থানা যুব মহিলা লীগের একজন সংগঠক। পোস্টে বলা হয়, তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বী ও রাজনৈতিকভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে তাঁর ওপর হামলা চালানো হয়েছে। তবে ঘটনার সুনির্দিষ্ট কোনো দিনক্ষণের কথা ওইসব পোস্টে উল্লেখ করা হয়নি।
পোস্টগুলোর বর্ণনায় আরও বলা হয়, নির্যাতিত নারী যখন বিচার চাইতে থানায় যান, তখন ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসির পক্ষ থেকে তাঁকে অবমাননাকর মন্তব্য করা হয়। ওসির বক্তব্য হিসেবে প্রচার করা হয় যে, ওই নারীর সৌন্দর্যই তাঁর জীবনের কাল এবং তাঁকে বোরকা পরিধান করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া ওই ছবিটির সত্যতা যাচাই করেছে সংবাদমাধ্যম। অনুসন্ধানে জানা গেছে, অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া আহত পিঠের ওই ছবিটি তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট থানা পুলিশ নিশ্চিত করেছে যে, এমন কোনো অভিযোগ বা ঘটনার বিষয়ে তাদের কাছে কোনো তথ্য নেই।
পোস্টে যাঁকে যুব মহিলা লীগের নেত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়েছে, বাস্তবে তাঁর কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায়নি। এমনকি ছবিটি শেয়ার করেছেন এমন তিন ব্যক্তির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাঁরা ওই নারীর কোনো ঠিকানা, যোগাযোগের মাধ্যম বা থানায় দেওয়া অভিযোগের কপি সরবরাহ করতে পারেননি।
যাচাইয়ে দেখা গেছে, পোস্টদাতারা মূলত অন্যের অ্যাকাউন্ট থেকে তথ্য কপি করে নিজেদের পেজে প্রচার করেছেন এবং ঘটনার আদ্যোপান্ত সম্পর্কে তাঁদের কোনো ধারণাই নেই। তাঁরা স্বীকার করেছেন যে না জেনেই তাঁরা এই কাল্পনিক তথ্য অনলাইনে ছড়িয়ে দিয়েছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করা তথ্যে ফিরোজ নামের এক ব্যক্তিকে এই নির্যাতনের জন্য দায়ী করা হয়েছে। তবে তাঁর পদবি ও পরিচয় নিয়ে একেক পোস্টে একেক রকম বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। কোথাও তাঁকে স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়কের নির্দেশে অপরাধ সংঘটনকারী বলা হয়েছে, আবার কোথাও তাঁকে নিজেই থানা কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
অনলাইন মনিটরিংয়ে দেখা গেছে, গত শুক্রবার বেলা ১১টা ৫৯ মিনিটে ‘এফ কে জয় জয়’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে প্রথম এই ছবিটি পোস্ট করা হয়। পরবর্তীতে মুকুল আহমেদ ও সুমন মল্লিক নামের আরও দুটি অ্যাকাউন্ট থেকেও একই ধরনের ভুয়া দাবি প্রচার করা হয়।
অনুসন্ধানে জানা যায়, এই প্রোফাইলগুলো থেকে নিয়মিতভাবে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের পক্ষে প্রচারণা চালানো হয়ে থাকে। এরপর বিকেল ৪টা ৪৮ মিনিটে নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক এস এম জাকির হোসেন তাঁর নিজস্ব পেজে ছবিটি শেয়ার করেন।
এক্সেও একাধিক বিদেশি ও দেশি অ্যাকাউন্ট থেকে এই মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর বিষয়টি সামনে এসেছে। এর মধ্যে ‘Dr Baidyanath Ghosh’ নামক একটি অ্যাকাউন্টের পোস্ট প্রায় দেড় লাখ বার দেখা হয়েছে। এই অপপ্রচার দেখে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে সত্যতা জানতে গণমাধ্যমে ফোন করেছেন।
ছবিটির সত্যতা যাচাইয়ের জন্য সিন্থআইডি, ওপেনএআইয়ের এআই কনটেন্ট চেকার এবং হাইভ মডারেশনের মতো তিনটি বিশেষ ডিজিটাল টুল ব্যবহার করা হয়। যাচাইয়ের প্রতিটি ধবেই ছবিটি তৈরিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার কারসাজি রয়েছে বলে নিশ্চিত করা গেছে।
তবে পুরো ছবিটিই কৃত্রিমভাবে জেনারেট করা, নাকি আগের কোনো ছবি এআই দিয়ে এডিট করা হয়েছে, তা পরিষ্কার হয়নি। তা সত্ত্বেও ছবিটির উৎস খুঁজতে গিয়ে প্রায় এক মাস আগের ভারতীয় একটি অনলাইন পোস্টের সঙ্গে এর মিল পাওয়া যায়।
ভারতের কেরালায় যৌতুকের দাবিতে এক নববধূর ওপর স্বামীর নির্যাতনের পুরোনো একটি ছবির সঙ্গে বর্তমান মিরপুরের ঘটনার ছবির কিছু সাদৃশ্য রয়েছে। তবে কেরালার সেই ছবি এডিট করেই বর্তমান ভুয়া ছবিটি তৈরি করা হয়েছে কি না, সে বিষয়ে পুরোপুরি নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সংগঠনের দলীয় পরিচয় ও পদের ক্ষেত্রেও ব্যাপক অসঙ্গতি ধরা পড়েছে অনলাইন প্রচারণায়। যুব মহিলা লীগের দায়িত্বশীল একাধিক নেত্রীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের সাংগঠনিক কাঠামোতে ‘সংগঠক’ বলে কোনো পদ বা পরিচয়ের অস্তিত্ব নেই।
ঘটনার সত্যতা যাচাই করতে মিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. হাফিজুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, তাঁদের থানা এলাকায় এমন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি এবং কোনো নারী অভিযোগ নিয়ে থানায় আসেননি।
ঢাকা মহানগর পুলিশের মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার হাসান মোহাম্মদ নাসের রিকাবদারও একই তথ্য নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, তাঁর অধীনস্থ কোনো থানাতেই এমন ঘটনার কোনো রেকর্ড নেই এবং কেউ অভিযোগ করতেও আসেননি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো পোস্টে অভিযুক্ত হিসেবে যাঁকে চিহ্নিত করা হয়েছে, সেই মিরপুর থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সভাপতি ফিরোজ আহমেদ এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি জানিয়েছেন, তিনি এই বিষয়ে সম্পূর্ণ অজ্ঞ এবং ওই নামের কাউকেই তিনি চেনেন না।
ফিরোজ আহমেদ আরও বলেন, বিভিন্ন জায়গায় তাঁর ভিন্ন ভিন্ন পরিচয় উপস্থাপন করে সম্পূর্ণ কাল্পনিক ও বানোয়াট একটি গল্প ছড়ানো হয়েছে। তিনি এই ঘটনার সঠিক তদন্ত ও প্রকৃত সত্য জাতির সামনে উন্মোচন করার দাবি জানিয়েছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।