
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ব্যাংকিং খাতের আলোচিত একটি আর্থিক কেলেঙ্কারির ঘটনার জেরে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনা আকস্মিকভাবে অভিশংসিত হওয়ার পর দক্ষিণ আমেরিকার রাষ্ট্র প্যারাগুয়ের ৫৩তম নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ গ্রহণ করেছেন পেদ্রো আলিয়ানা।
গত শুক্রবার ৫২ বছর বয়সে পেদ্রো আলিয়ানা এই গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং এর মাধ্যমেই দেশটিতে পেনার দীর্ঘ বা সংক্ষিপ্ত ক্ষমতার আনুষ্ঠানিক অবসান ঘটে।
উয়েনো ব্যাংক কেলেঙ্কারিতে সরাসরি নাম জড়িয়ে যাওয়ার পরপরই কঠোর অভিশংসনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অত্যন্ত দ্রুততার সঙ্গে তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয় এবং প্যারাগুয়ের ৪৫ সদস্যবিশিষ্ট উচ্চকক্ষ সিনেটের প্রায় সবাই এই সিদ্ধান্তের পক্ষে অবস্থান নেন।
সিনেটের মোট ৪৪ জন সদস্য তাঁকে প্রেসিডেন্টের পদ থেকে অপসারণ করার পক্ষে তাদের রায় প্রদান করেন এবং কেবল একজনমাত্র সিনেটর এই ভোটাভুটি থেকে বিরত থাকার সিদ্ধান্ত নেন।
চলতি সপ্তাহের একদম শুরুর দিকে প্যারাগুয়ের একটি অত্যন্ত প্রভাবশালী ঋণদাতা আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত উয়েনো ব্যাংকের আকস্মিক পতনের ঘটনার সঙ্গে সরাসরি নাম জড়িয়ে যাওয়ার ফলেই মূলত সান্তিয়াগো পেনার এমন পতন ও বিদায় ঘটে।
গত মঙ্গলবার সকালে মূলত এই বিশাল কেলেঙ্কারির আনুষ্ঠানিক সূত্রপাত হয়েছিল যখন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা দেয় যে উয়েনো ব্যাংক তাদের দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী নির্ধারিত আর্থিক সক্ষমতার কোনো মানদণ্ডই পূরণ করতে সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যাংকটির সমস্ত ঋণ এবং অন্যান্য বিনিয়োগের বিপরীতে পর্যাপ্ত পরিমাণের কোনো জামানত জমা ছিল না, যার ফলে ব্যাংকটির ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
জরুরি সতর্কতামূলক এবং রক্ষাকবচ হিসেবে উয়েনো ব্যাংকের হাতে থাকা অবশিষ্ট সব সম্পদ নিরাপদে দেশের অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছে হস্তান্তর করা হয়, কিন্তু এই ভয়াবহ সংকটের কারণে ব্যাংকের লাখ লাখ গ্রাহক আকস্মিকভাবেই নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাব ও পেনশনের জমানো টাকা তোলার সুযোগ সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলেন।
প্রায় ৩০ লাখের মতো গ্রাহক নিয়ে গঠিত উয়েনো ব্যাংকের সাথে প্যারাগুয়ের মোট প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ মানুষ প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং এই ব্যাংকটিতে দেশের সরকারি পেনশনসহ সরকারের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ তহবিলের বিশাল অঙ্কের অর্থও জমা রাখা হয়েছিল।
চলতি সপ্তাহের শুরুর দিকে ব্যাংকটি আনুষ্ঠানিকভাবে দেউলিয়া ঘোষণা করার প্রক্রিয়া শুরু করার পর থেকেই লাখ লাখ সাধারণ গ্রাহক নিজেদের কষ্টার্জিত ব্যাংক হিসাবের একটি টাকাও তুলতে সক্ষম হচ্ছেন না।
সরকারের অতি উচ্চ মহলের সাথে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের সুযোগ নিয়ে উয়েনো ব্যাংকটি অতীতে সব ধরনের জবাবদিহি এড়াতে সক্ষম হয়েছিল কি না, সেই গুরুতর প্রশ্ন এখন জোরালোভাবে তুলেছেন তদন্তকারী কৌঁসুলিরা।
দেশের গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পেনশন তহবিলের প্রায় ৩৫ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণভাবে এই নির্দিষ্ট ব্যাংকে বিনিয়োগ করা হয়েছিল বলে তথ্যে উঠে এসেছে।
এদিকে এই পুরো ব্যাংকিং কেলেঙ্কারির ঘটনায় যথাযথ তদারকি বা নজরদারি করতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগে প্যারাগুয়ের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাবেক গভর্নর বা প্রধান কার্লোস কারভালোর বিরুদ্ধেও একটি গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে এবং তিনি গত সপ্তাহেই তার পদ থেকে পদত্যাগ করেছিলেন।
উয়েনো ব্যাংকের কার্যক্রমে সরকারি সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে যথাযথ কোনো নজরদারি বা তদারকি করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে তীব্র প্রশ্ন ওঠার পাশাপাশি এই ব্যাংকটির সাথে সদ্যবিদায়ী প্রেসিডেন্ট পেনার নিজের ব্যক্তিগত কোনো স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না, তা নিয়েও জোরালো সন্দেহ দেখা দেয়।
অভিশংসনের এই পুরো প্রক্রিয়ার ঠিক পরপরই আস্থার মারাত্মক অপব্যবহারসহ নানাবিধ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার সন্দেহে সাবেক প্রেসিডেন্ট সান্তিয়াগো পেনাকে কঠোরভাবে গৃহবন্দী করে রাখার স্পষ্ট নির্দেশ প্রদান করেছেন সংশ্লিষ্ট সরকারি কৌঁসুলিরা।
গতকালের ওই বিদায়ের মুহূর্তে বিকেলে নিজের অফিশিয়াল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অ্যাকাউন্ট থেকে পেনা লিখে জানান যে তিনি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেই বিদায় নিচ্ছেন এবং যাঁরা এখনো নিজেদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার অপেক্ষায় প্রহর গুনছেন, তাঁদের বর্তমান কষ্টের বিষয়টি তিনি পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছেন।
উল্লেখ্য যে, ৪৭ বছর বয়সী সান্তিয়াগো পেনা এর আগে ২০২৩ সালের আগস্ট মাসের দিকে লাতিন আমেরিকার দেশ প্যারাগুয়ের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রপতির দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিলেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।