
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক হরিশংকর জলদাস ১৯৫৫ সালের ১২ অক্টোবর চট্টগ্রামের উত্তর পতেঙ্গার জেলেপল্লিতে জন্ম নেন। তাঁর বহুল পঠিত উপন্যাসসমূহের মধ্যে রয়েছে জলপুত্র, দহনকাল এবং নোনাজলে ডুবসাঁতার, যেখানে জেলেসমাজের জীবনসংগ্রামের নানা দিক ফুটে উঠেছে। বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার, প্রথম আলো বর্ষসেরা বই পুরস্কার এবং একুশে পদকসহ জীবনে বহু prestigious সম্মাননা তিনি অর্জন করেছেন। তাঁর এই বর্ণাঢ্য জীবন ও সাহিত্যসাধনা নিয়ে সম্প্রতি একটি সাক্ষাৎকার নেওয়া হয়েছে, যেখানে তাঁর শৈশব ও সংগ্রামের নানা অজানা কথা উঠে এসেছে।
উত্তর পতেঙ্গার যে জেলেপল্লিতে তিনি বড় হয়েছেন, সেখানে তিনিই সম্ভবত প্রথম স্কুলে যাওয়া শিশু ছিলেন। পড়াশোনা করতে গিয়ে তাঁকে নানা সামাজিক বাধার মুখোমুখি হতে হয়েছিল। জেলেপল্লিতে আগামী দিনের খাবারের চিন্তাই ছিল প্রধান বিষয়। টেকনাফ থেকে হাতিয়া পর্যন্ত জেলেসমাজের কোথাও তখন কোনো শিক্ষিত মানুষ ছিলেন না। হরিশংকর জলদাস মূলত তাঁর বাবার জেদের কারণেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পেরেছিলেন। তাঁর বাবা যুধিষ্ঠির জলদাস পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করতে পেরেছিলেন।
বাবার যখন আড়াই বছর বয়স, তখন তাঁর দাদা চন্দ্রমণি জলদাস সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে নৌকা ডুবে মারা যান। তখন তাঁর ঠাকুরদি পরানেশ্বরীর বয়স ছিল মাত্র উনিশ বছর এবং তিনি সেই বয়সেই মাথায় ঝাঁকা নিয়ে মাছ বিক্রি শুরু করেছিলেন। হরিশংকর জলদাসের বাবা এই ঘটনা সহজে মেনে নিতে পারেননি এবং সমুদ্রের প্রতি তাঁর মনে গভীর ক্ষোভের জন্ম হয়েছিল। তাঁদের বাড়ির পশ্চিমে সমুদ্র থাকায় তিনি বলতেন যে ছেলেমেয়েদের তিনি পশ্চিমে পাঠাবেন না, যার অর্থ তিনি তাদের সমুদ্রে মাছ ধরতে যেতে দেবেন না।
তাঁদের পরিবারে ছয় ভাই ও দুই বোন মিলে মোট আট ভাইবোন ছিলেন এবং তাঁরা ছিলেন একটি বড় পরিবার। অনেক জেলে পরিবারে তখন সতেরোটি পর্যন্ত সন্তান থাকত এবং জেলেরা কেবল মাছ ধরার লোক বাড়ানোর প্রয়োজনেই বেশি সন্তান নিতেন। বাবা সাগরে ছেলেদের পাঠাবেন না বলে স্থির করলেও ঐতিহ্য অনুযায়ী তিনিও আট সন্তানের জনক হন। ১১ জনের এত বড় সংসারের সবার খাবার জোগাড় করা তাঁর একার পক্ষে অসম্ভব ছিল।
সংসারের টানে এগারো-বারো বছর বয়স থেকেই তাঁকে বাধ্য হয়ে সাগরে মাছ ধরতে যেতে হয়েছিল। তখন তাঁরা বইঠা বাওয়া নৌকায় সাগরে দুই থেকে তিন কিলোমিটার গভীরে গিয়ে জাল ফেলতেন। মাছ ধরা শেষ হলে তিনি ঠাকুরদির সঙ্গে মাছ বিক্রি করতে বাজারে যেতেন। এর মধ্যেই পতেঙ্গার একটি স্কুলে তাঁর পঠনপাঠন শুরু হয়, যেখানে অধিকাংশ শিক্ষার্থীই ছিল হিন্দুপাড়ার।
পঞ্চম শ্রেণির পরীক্ষার ফল প্রকাশের দিন ঠাকুরদি মাছের ঝাঁকা নিয়ে সরাসরি স্কুলে উপস্থিত হয়েছিলেন। একটি গাছের নিচে বসে তিনি হেডমাস্টারের ফল ঘোষণার প্রতীক্ষায় ছিলেন। একসময় হেডমাস্টার ঘোষণা করেন যে হরিশংকর জলদাস প্রথম স্থান অধিকার করেছেন। সেই ঘোষণা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই একজন অভিভাবক তীব্র আপত্তিকর মন্তব্য করে বলে ওঠেন যে জাইল্লার পোয়া কেন ফার্স্ট হইবে। এই অপমান অবধারিত ছিল এবং এটিই তাঁকে আরও পড়াশোনা করতে ও সামনে এগিয়ে যেতে গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছিল।
তিনি উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন, গবেষণা করেছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ডিগ্রি লাভ করেছেন এবং পরবর্তী সময়ে অধ্যাপনা পেশার সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। কিন্তু তিনি এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন যে শিক্ষকতা করার সময়ও তিনি রাতে নিয়মিত মাছ ধরতে যেতেন। এর কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন যে তাঁদের পরিবারে এগারো জন সদস্য থাকায় জীবনের বহু বছর ধরে পেট ভরে ভাত খাওয়ার স্বস্তি তারা কখনো অনুভব করতে পারেননি।
উনিশশো চৌাত্তর-পঁচাত্তর সালের দিকে দেশে চরম খাদ্যাভাব দেখা দিয়েছিল। তাঁদের পুকুরপাড়ে কলমি ও হেলেঞ্চার শাক হতো এবং তাঁর মা সেগুলো তুলে আনতেন। প্লেটভর্তি সেই শাকের সঙ্গে সামান্য ভাত খেয়ে তাঁদের দিন কাটাতে হতো। তিনি যখন কলেজে শিক্ষকতা শুরু করেন, তখনও অবস্থার বিশেষ কোনো পরিবর্তন হয়নি। ভাইবোনেরা তখন ছোট ছিল এবং পড়াশোনা করত। বড় ছেলে হিসেবে তাই তাঁকেই বাবার সঙ্গে মাছ ধরতে যেতে হতো।
কখনো কখনো তিনি সারা রাত সাগরে মাছ ধরে সকালে গোসল করে সরাসরি কলেজে চলে যেতেন। তিনি যখন লেখালেখি শুরু করেন, তখন তিনি আর একেবারে তরুণ বয়সে ছিলেন না। একজন কৈবর্ত সমাজের মানুষ কীভাবে বাংলা সাহিত্যের অগ্রগণ্য লেখক হয়ে উঠলেন, তা এক দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। চট্টগ্রামের বিখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা আহসাব উদ্দিন আহমদের জন্মভিটা দেখতে তিনি একবার বাঁশখালী গিয়েছিলেন।
সেখানে এক বয়স্ক আত্মীয়র দেউড়ি ঘরে বসে সাম্প্রতিক বন্যা নিয়ে আলাপ হচ্ছিল। সেই বন্যায় ওই এলাকার বেশ কিছু মানুষ মারা গিয়েছিলেন। সেই বয়স্ক ব্যক্তিটি ঘটনার বিবরণ দিতে গিয়ে জানান যে তাঁদের এলাকার দশ জন মানুষ আর তিনজন ডোম মারা গেছে। নদীর অপর পাড়ের মানুষ তখন জেলেদের অবজ্ঞা করে ডোম বলে ডাকত এবং জাইল্লা শব্দটির চেয়ে ডোম শব্দটি ছিল অনেক বেশি তাচ্ছিল্যপূর্ণ।
নিম্নবর্গের মানুষদের সমাজ তখন এই দৃষ্টিতেই দেখত এবং তাদের মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হতো না। এই ধরনের কথা শুনতে শুনতে তিনি অভ্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন। কলেজে পড়ানো শুরু করার পর এক নারী প্রিন্সিপালও তাঁকে পেছন থেকে জাইল্লার ছেলেটা ক্লাস নিতে গেছে বলে সম্বোধন করতেন। এই ধরনের অপমানের পেছনের কারণ কী, তা জানতে তাঁর তীব্র ইচ্ছা হতো।
তাঁর মনে প্রশ্ন জাগত যে জেলে সম্প্রদায় আসলেই কি কোনো অন্যায় করেছে। সেই ভাবনা থেকেই তিনি বাংলা উপন্যাসে কৈবর্তজীবন নিয়ে পিএইচডি গবেষণা শুরু করেন। গবেষণা শুরু করার পর তিনি দেখতে পান যে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পদ্মা নদীর মাঝি কিংবা সমরেশ বসুর উপন্যাসে জেলেজীবনকে যেভাবে দেখানো হয়েছে, তা আদل প্রকৃত চিত্র নয়। বরং অদ্বৈত মল্লবর্মণের তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসটি অনেক বেশি বাস্তবানুগ ছিল।
তখন তিনি নিজের জীবন ও অভিজ্ঞতা থেকে নিজে লেখার সিদ্ধান্ত নেন এবং সেভাবেই তাঁর সাহিত্যযাত্রা শুরু হয়। বলা চলে যে জীবনের অপমান ও গ্লানিই তাঁকে দিয়ে কলম ধরে লিখিয়ে নিয়েছিল। জলপুত্র প্রকাশের পর তাঁর কোনো বড় খ্যাতি ছিল না, কিন্তু দহনকাল প্রকাশিত হওয়ার পর প্রথম আলো বর্ষসেরা পুরস্কার লাভ করে তিনি রাতারাতি সাহিত্যিক খ্যাতি অর্জন করেন।
এর বাইরে অতীত ও বর্তমান মিলিয়ে তিনি আজও সাধারণ একজন মানুষ হিসেবেই জীবন যাপন করছেন। তাঁর নোনাজলে ডুবসাঁতার বইটি তাঁর জেলেজীবনের আত্মকথা, যেখানে তিনি সবকিছু অত্যন্ত খোলাখুলি তুলে ধরেছেন। এমনকি একজন শিক্ষকের দ্বারা যৌন নিপীড়নের শিকার হওয়ার চেষ্টার কথাও তিনি সেখানে অবলীলায় প্রকাশ করেছেন। জেলেপল্লি, চা-বাগান কিংবা হরিজন সম্প্রদায়ের ছোট ছোট পল্লি থেকে অনেকেই পড়াশোনা শিখে সমাজে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
উঠে আসা প্রতিটি মানুষের জীবনই একেকটি উপন্যাসের সমতুল্য। তিনি যখন রামগোলাম উপন্যাস লিখছিলেন, তখন হরিজন সম্প্রদায়ের বিভিন্ন কলোনিতে ঘুরে বেড়িয়েছেন। সেখানে তিনি অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর দেখা পেয়েছেন যাদের পেছনে দাঁড়ানোর মতো কেউ নেই। তারা জীবনে সফল হতে পারবে, এই আত্মবিশ্বাসটুকু জোগানোর মতোও কেউ তাদের পাশে ছিল না।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।