
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
ইসলামের শুরুর দিকের ইতিহাসের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকা ‘ইবনে জাদআনের ঘর’ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সবার আগে এর মালিক আবদুল্লাহ ইবনে জাদআন ইবনে আত-তায়মি আল-কুরাশি আল-কিনানি সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে হয়। তিনি কুরাইশ বংশের বিশিষ্ট নেতাদের একজন ছিলেন এবং কায়েস আইলানের বিরুদ্ধে সংঘটিত ‘ফিজার যুদ্ধে’ বনু কিনানা গোত্রের সামগ্রিক নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। তৎকালীন সময়ে তিনি নিজ উদারতা ও অতিথি আপ্যায়নের জন্য অত্যন্ত খ্যাতি অর্জন করেছিলেন। ঐতিহাসিক বর্ণনামতে, জীবনের শুরুর দিকে তিনি বেশ দরিদ্র ছিলেন এবং সেভাবে পরিচিত ছিলেন না, তবে পরবর্তী সময়ে যৌবনের সোনালি সময়ে তিনি প্রচুর সম্পত্তির মালিক হয়ে ওঠেন। ঐতিহাসিকদের মতে, সিরিয়ার দিকে তিনি বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে কাফেলা পরিচালনা করতেন, কিংবা মক্কার কোনো এক পাহাড়ের গোপন গুহায় জুরহুমের পরিত্যক্ত গুপ্তধনের খোঁজ পাওয়ার নানা গল্পও ইতিহাসে প্রচলিত রয়েছে।
বংশগত পরিচয়ের দিক থেকে আবদুল্লাহ ইবনে জাদআন ছিলেন বিশিষ্ট সাহাবি হজরত আবু বকরের বাবা আবু কুহাফার চাচাতো ভাইয়ের সন্তান। এই আত্মীয়তার সুবাদে ধারণা করা যায় যে ইবনে জাদআনের ঘরটি সম্ভবত হজরত আবু বকরের নিজের বাড়ির সঙ্গেই কিংবা তার ঠিক পাশেই অবস্থিত ছিল। হিজরি তৃতীয় শতকে মক্কার ইতিহাসবিদ আল-ফাকিহির রচিত ‘আখবারু মক্কা’ গ্রন্থ থেকে এই ধারণার সত্যতা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওই গ্রন্থে হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদিস উল্লেখ করার পরপরই ইবনে জাদআনের ঘরের মালিকানা হাতবদল হওয়ার দীর্ঘ ইতিহাস তুলে ধরা হয়েছে।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, মহানবী যখন সাওর পাহাড়ের গুহার দিকে চলে গেলেন, তখন তিনি কোনো সংবাদদাতার সন্ধান পেতে এবং কারো কাছ থেকে কোনো খবর পাওয়া যায় কি না তা দেখতে বের হয়েছিলেন। তিনি এক পর্যায়ে আবু বকরের বাড়িতে উপস্থিত হন এবং সেখানে হাতে লাঠি নিয়ে বের হয়ে আসা আবু কুহাফাকে দেখতে পান। আবু কুহাফা তাঁকে দেখামাত্র তেড়ে আসেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করে বলতে থাকেন, যেসব উঠতি বয়স্ক ছেলে তাঁর সন্তানকে নষ্ট করেছে, এ হলো তাদেরই একজন।
ফাকিহি তাঁর বর্ণনায় আরও যোগ করেছেন যে, সেই বাড়িটি ছিল মূলত দারু ইবনে জাদআন বা ইবনে জাদআনের ঘর। দুই আজয়াদ অর্থাৎ আস-সাগির ও আল-কবিরের মধ্যবর্তী উপত্যকার উধ্বাংশে একটি পথ ছিল। পরবর্তীতে তাদের বংশেরই আবদুস সামাদ ইবনে আলী সেই সম্পত্তি বিক্রি করে দেন। যদিও পরবর্তীতে সেই বিক্রয় প্রক্রিয়া বাতিল করা হয় এবং তাদের পূর্বের মালিকানা সফলভাবে ফিরিয়ে আনা হয়। পরবর্তীতে যখন মাসজিদুল হারাম সম্প্রসারণের কাজ শুরু হয়, তখন এই অংশটিকে মক্কার মূল উপত্যকার অন্তর্ভুক্ত করে নেওয়া হয়।
মসজিদ চত্বর অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পর দেখা যায় যে দারু ইবনে জাদআনের সামান্য বর্ধিত কিছু অংশ বাদে ওই উপত্যকা পুরোপুরি মানুষের বসতি ও ঘরবাড়িতে পূর্ণ হয়ে গিয়েছিল। এর মধ্যে আবু উজারা মক্কির বাড়ি এবং মুহাম্মদ ইবনে ইবরাহিম মক্কির বাড়ির মতো স্থাপনাগুলো আল-আব্বাস ইবনে মুহাম্মদের ঘরের প্রায় কাছাকাছি অবস্থিত ছিল। পরবর্তী সময়ে এই সমস্ত মালিকদের কাছ থেকে ওই সম্পত্তিগুলো কিনে নেন মক্কার তৎকালীন প্রশাসক মুহাম্মদ ইবনে সোলাইমান আজ-জাইনাবি।
এরপর সেই প্রশাসক সম্পত্তিটি খলিফার ক্রীতদাস আবু ইয়াজদাদের কাছে বিক্রি করেন, যা পরবর্তীতে সিঁড়ির রূপ ধারণ করে। এটি মূলত সেই ঐতিহাসিক ঘরেরই অবশিষ্টাংশ, যার ভেতরে একসময় বিখ্যাত ‘হিলফুল ফুজুল’ চুক্তি অনুষ্ঠিত হয়েছিল। খলিফা আল-মাহদি মসজিদুল হারামের আয়তন বৃদ্ধির কাজের সময় এই চত্বরকে মসজিদের সীমানার ভেতর অন্তর্ভুক্ত করে নেন এবং ইবনে জাদআনের ঘরটি চত্বরে রূপান্তরিত হয়। পরবর্তী সময়ে হিজরি নবম শতকের বিশিষ্ট গবেষক তাকিউদ্দিন মুহাম্মদ ইবনে আহমাদ আল-ফাসিও এই বর্ণনাটি আরও পরিষ্কার করে গেছেন।
এবার আমরা নবীজির সিরাত বা জীবনের সেই অধ্যায়ে প্রবেশ করতে পারি, যা সরাসরি এই স্থানের সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। মহানবী (সা.)-এর পবিত্র জীবনে ইবনে জাদআনের ঘরের স্মৃতি একাধিকবার বিভিন্নভাবে উঠে এসেছে, যার মধ্যে তাঁর বিশ বছর বয়সকালীন ঘটনাটি সবচেয়ে বেশি উল্লেখযোগ্য। তালহা ইবনে আবদিল্লাহ ইবনে আউফ থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে স্বয়ং নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন যে, তিনি আবদুল্লাহ ইবনে জাদআনের ঘরে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকারনামার অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন। সেই চুক্তির বিপরীতে যদি তাঁকে লাল রঙের উটও পুরস্কার হিসেবে দেওয়া হতো, তবুও তিনি তা পছন্দ করতেন না। এমনকি ইসলামের যুগেও যদি তাঁকে এমন কোনো চুক্তির দিকে আহ্বান জানানো হয়, তবে তিনি তাতে নিশ্চিতভাবেই সাড়া দেবেন।
এই চুক্তির পেছনের মূল প্রেক্ষাপট ছিল সেকালের আরব জাহিলিয়াতের অন্যতম আলোচিত ‘হারবুল ফিজার’ বা পাপীদের যুদ্ধ। আরবদের ইতিহাসে এমন চারটি যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল নবীজির বয়স যখন চৌদ্দ থেকে বিশ বছর পর্যন্ত ছিল। বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ইবনে কাসিরের মতে, এই ধারাবাহিক যুদ্ধের সর্বশেষ সংঘাতটি হয়েছিল নাখলাহ ও উকাজের নির্দিষ্ট এলাকায়। তবে সেই যুদ্ধে মহানবী (সা.) সরাসরি কোনো আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্যে গিয়েছেন বলে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য পাওয়া যায় না।
বরং তিনি তাঁর চাচা জুবাইর ইবনে আবদুল মুত্তালিব ও আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের যুদ্ধব্যূহের পেছনে অবস্থান নিয়ে এই যুদ্ধে শরিক হয়েছিলেন। এ প্রসঙ্গে নবীজি নিজেই বলেছেন যে তিনি তাঁর চাচাদের সঙ্গে সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের পক্ষে তির নিক্ষেপ করেছিলেন। তিনি আরও জানান যে এই কাজটি না করাটা তাঁর কাছে মোটেও পছন্দনীয় ছিল না।
বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ইবনে হিশাম উল্লেখ করেছেন যে মহানবী (সা.) কখনোই কাউকে আক্রমণ করেননি। সুহাইলি অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় বর্ণনা করেছেন যে তিনি মূলত কোনো যুদ্ধ করেননি, কারণ তখন যুদ্ধের উপযুক্ত বয়সই তাঁর ছিল না। তাছাড়া সংঘাতটি সংঘটিত হয়েছিল নিষিদ্ধ মাসগুলোতে, এবং নবীজির লড়াই কেবল আল্লাহর নির্ধারিত জীবনব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার জন্যই হয়ে থাকে, যা এই ঘটনার ক্ষেত্রে অনুপস্থিত ছিল।
সুহাইলি এই দাবির সমর্থনে ইবনুল জাওজির গ্রন্থ থেকে একটি হাদিস উদ্ধৃত করেছেন, যেখানে বলা হয়েছে যে ফিজারের যুদ্ধের দিনগুলোতে তিনি কেবল তাঁর চাচাদের নিক্ষিপ্ত তিরগুলো কুড়িয়ে দিচ্ছিলেন। বদর যুদ্ধের সমাপ্তির মুহূর্তগুলোতেও নবীজি ইবনে জাদআনের ঘরে ঘটে যাওয়া অতীতের সেই বিশেষ দিনের একটি স্মৃতি অত্যন্ত স্পষ্টভাবে স্মরণ করেছিলেন।
বদর যুদ্ধের পর যখন আবু জাহেলের মরদেহটি কোথাও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না এবং কেউ তাকে শনাক্ত করতে পারছিল না, তখন মহানবী (সা.) সাহাবিদের উদ্দেশে বলেছিলেন যে নিহতদের ভিড়ে তাকে খুঁজে দেখতে। তিনি আরও জানান যে তাকে খুব সহজেই তার হাঁটুর ওপর থাকা ক্ষতের চিহ্ন দেখে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। নবীজি বলেন যে ইবনে জাদআনের ভোজের আসরের সময় সে এবং তিনি একত্রে ভিড় করেছিলেন। সেই ভিড়ে তিনি তাকে ধাক্কা দিয়ে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলেন এবং একপর্যায়ে সে তার নিজের হাঁটুর ওপর পড়ে গিয়ে তা মচকে ফেলেছিল, যার ফলে সেই স্থায়ী চিহ্ন আজও তার হাঁটুতে রয়ে গেছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।