
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ক্রিপ্টোকারেন্সি এক্সচেঞ্জ প্ল্যাটফর্ম বাইন্যান্স থেকে অবিশ্বাস্য পরিমাণে রেকর্ড ছয়শো ত্রিশ কোটি ডলার অর্থ চুরির ঘটনা তদন্ত করে দেখা হচ্ছে। এই বিশাল অঙ্কের অর্থ খোয়া যাওয়ার পেছনের মূল কারণ ও পদ্ধতি উদ্ঘাটনে সাইবার বিশেষজ্ঞরা নিবিড় অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রাথমিক অনুসন্ধানের তথ্যানুযায়ী, সাইবার আক্রমণকারীরা অত্যন্ত জটিল এবং সুপরিকল্পিত একাধিক ধাপের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের মূল ডিজিটাল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, হ্যাকাররা অত্যন্ত সুকৌশলে ক্ষতিকারক সফটওয়্যার ব্যবহার করে প্রকৌশলীদের ব্যক্তিগত কম্পিউটারগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের মুঠোয় নেয়। এর ফলে ব্যবহারকারীদের নিজস্ব ডিজিটাল ওয়ালেট থেকে শত শত কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পথ সুগম হয়।
এই ঘটনাকে অত্যন্ত গুরুতর ও জটিল নিরাপত্তা লঙ্ঘন হিসেবে চিহ্নিত করে বাইন্যান্স কতৃপক্ষ বিশ্বজুড়ে থাকা তাদের গ্রাহকদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করেছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক আনুষ্ঠানিক বার্তায় প্রতিষ্ঠানটি জানায়, হামলাকারীরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাদের প্রকৌশলী কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু বানিয়েছিল। এই পুরো প্রক্রিয়ায় মূলত সুনিপুণ সামাজিক প্রকৌশল বা সোশ্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং কৌশল প্রয়োগ করা হয়।
এই অভিনব প্রতারণার অংশ হিসেবে একজন প্রকৌশলীর সঙ্গে একটি নির্ভরযোগ্য ও বৈধ চাকরি খোঁজার অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই যোগাযোগ করা হয়েছিল। এরপর ভুয়া কোনো প্রতিষ্ঠানের ভুয়া প্রতিনিধিদের সঙ্গে একটি অনলাইন চাকরি সংক্রান্ত সাক্ষাৎকারে যোগ দেওয়ার আমন্ত্রণ জানানো হয় তাকে।
প্রতারকদের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করাতে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পূর্ণ ভুয়া ও সাজানো ব্যক্তিগত ছবি ব্যবহার করে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে।
দ্বিতীয় দফার সেই সাক্ষাৎকারের সময় একটি নির্দিষ্ট অ্যাসাইনমেন্ট বা কাজের অজুহাত দেখিয়ে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীকে একটি ক্ষতিকারক ম্যালওয়্যার ডাউনলোড করতে বাধ্য করা হয়।
এই ক্ষতিকারক ফাইলের ভেতরে থাকা সুকৌশলে গোপন করা ম্যালওয়্যার কোডটি সহজেই সিস্টেমের নিজস্ব নিরাপত্তা শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া এড়িয়ে সরাসরি মূল নেটওয়ার্কে প্রবেশ করে।
পরবর্তীতে গত অক্টোবর মাসের দিকে হ্যাকাররা ওই প্রকৌশলীর আক্রান্ত কম্পিউটার এবং একটি ক্ষতিগ্রস্ত অভ্যন্তরীণ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই টুল ব্যবহার করে।
এই প্রযুক্তির অপব্যবহার করে তারা আরও দুজন প্রকৌশলীর ব্যক্তিগত ল্যাপটপের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতের মুঠোয় নিয়ে নিতে সক্ষম হয়।
এই ভয়াবহ সাইবার হামলার পরপরই বিশ্বজুড়ে থাকা সমস্ত গ্রাহকদের ক্রিপ্টোকারেন্সি উত্তোলন বা ক্যাশআউট করার সুবিধা সম্পূর্ণভাবে স্থগিত রাখতে বাধ্য হয় প্রতিষ্ঠানটি।
পরবর্তীতে স্থগিতাদেশ তুলে নিয়ে সেবা পুনরায় চালু করা হলে আতঙ্কিত গ্রাহকেরা তাদের নিজেদের অ্যাকাউন্ট থেকে একে একে বিপুল পরিমাণ অর্থ তুলে নেন।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্বনামধন্য অপরাধ তদন্তকারী সংস্থা এফবিআই এবং সিক্রেট সার্ভিস যৌথভাবে বাইন্যান্সকে চুরি যাওয়া এই সমস্ত ক্রিপ্টোকারেন্সি উদ্ধারে সর্বাত্মক সহায়তা করে যাচ্ছে।
সাইবার নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও তদন্তকারী সংস্থাগুলোর মতে, এই নজিরবিহীন সাইবার আক্রমণের পেছনে উত্তর কোরিয়ার সরাসরি সম্পৃক্ততা থাকার অত্যন্ত স্পষ্ট কিছু ইঙ্গিত পাওয়া গেছে।
তবে এই সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করেছেন উত্তর কোরিয়ার শীর্ষস্থানীয় সরকারি কর্মকর্তা এবং দেশটির সর্বোচ্চ নেতা কিম জং উনের বোন কিম ইয়ো জং।
তিনি এই ধরনের সমস্ত অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন উল্লেখ করে একে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে চালানো একটি সুনির্দিষ্ট অপপ্রচারের চেষ্টা বলে তীব্র ভাষায় অভিহিত করেছেন।
উল্লেখ্য যে, এর আগে ২০২৫ সালের দিকে বাইবিট ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ থেকে দেড়শো কোটি ডলার চুরির হ্যাকিংয়ের ঘটনার সঙ্গেও উত্তর কোরিয়ার কুখ্যাত ল্যাজারাস গ্রুপ জড়িত ছিল বলে ধারণা করা হয়েছিল।
বাইন্যান্সের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের সাম্প্রতিক তথ্যপ্রমাণগুলো সরাসরি উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করার দিকটিই স্পষ্টভাবে নির্দেশ করছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ক্ষতিগ্রস্ত গ্রাহকদের উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত তহবিল প্রস্তুত রাখার পাশাপাশি নিজেদের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়নেও কাজ করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটি।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।