
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
যশোরের অভয়নগর উপজেলার পাঁচটি সড়কের দুই পাশ থেকে এক হাজার ৫৪টি গাছ অপসারণের প্রক্রিয়া চলছে। ইতোমধ্যে নওয়াপাড়া পৌরসভার সীমানায় থাকা ২৭৫টি গাছ কাটার জন্য বন বিভাগের আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র মিলেছে। বাকি ৭৭৯টি গাছ কাটতেও বন বিভাগের অনুমতি নেওয়ার কার্যক্রম চলমান। তবে এর মধ্যেই পৌরসভা এলাকার নির্দিষ্ট সীমানা থেকে ২৩টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এই বিপুল সংখ্যক গাছ একসাথে কেটে ফেললে স্থানীয় পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে নষ্ট হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মানুষ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
যে পাঁচটি সড়ক থেকে গাছগুলো সরানোর পরিকল্পনা করা হয়েছে, তার পুরোটাই যশোরের জলাবদ্ধতা জর্জরিত ভবদহ অঞ্চলের অন্তর্ভুক্ত। সুন্দলী গ্রামের এক কলেজশিক্ষক কানু বিশ্বাস সংবাদমাধ্যমকে জানান, এই গাছগুলো ভবদহের মতো পানিবন্দী এলাকার জলাবদ্ধতা ও বর্ষার সময় তীব্র পানির চাপ থেকে সড়কগুলোকে সুরক্ষা দিয়ে থাকে। গাছগুলো যদি ধ্বংস করা হয়, তবে পানির প্রবল স্রোতে রাস্তাগুলো ভেঙে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার প্রবল ঝুঁকি রয়েছে। তাই গাছগুলো না কেটে বরং যেকোনো মূল্যে সংরক্ষণ করা অত্যন্ত বাঞ্ছনীয় বলে তিনি মনে করেন।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আর্থিক সহায়তায় প্রচলিত কাজের বিনিময়ে খাদ্য প্রকল্পের মাধ্যমে এই গাছগুলো রোপণ করা হয়েছিল। তখন নির্ধারিত কুড়ি বছর মেয়াদি চুক্তির মেয়াদ ২০১৩ সালেই শেষ হয়ে গেছে। বর্তমানে এসব গাছের বয়স ত্রিশ বছর ছাড়িয়ে গেছে। সামাজিক বনায়ন কর্মসূচির সাথে জড়িত নারী সদস্যদের চুক্তিমতো পাওনা টাকা বুঝিয়ে দেওয়ার জন্যই মূলত তড়িঘড়ি করে গাছগুলো বিক্রির এই আয়োজন চলছে।
বন বিভাগ ও একটি বেসরকারি সংস্থার নথিপত্র ঘেঁটে জানা যায়, ১৯৯৩ সালের পহেলা জুলাই স্বাক্ষরিত ত্রিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় নওয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদ, উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা এবং বনায়ন প্রকল্পের বাহান্নজন নারী সদস্য কাজ শুরু করেন। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির সহায়তায় এবং ডিপির তত্ত্বাবধানে তেরো কিলোমিটার দীর্ঘ পাঁচটি সড়কের উভয় পাশে বিভিন্ন প্রজাতির ছাব্বিশ হাজারের বেশি চারা রোপণ করা হয়েছিল। চারাগুলোর দেখভাল ও নিরাপত্তার দায়িত্বে ছিলেন বনায়ন প্রকল্পের নারী সদস্যরা।
পূর্বের চুক্তি অনুযায়ী গাছ বিক্রির আয়ের একটি নির্দিষ্ট অংশ পাওয়ার কথা ছিল সবার। এই গাছগুলো এখন পরিপক্ক রূপ নিয়েছে। অপসারণের তালিকায় রয়েছে মেহগনি, রেইনট্রি, শিশু, ইপিলইপিল, বাবলা ও কড়ই গাছ। প্রশাসনিক সীমানা পরিবর্তনের ফলে নওয়াপাড়া ইউনিয়ন ভেঙে পৌরসভা ও নতুন ইউনিয়ন গঠিত হয়। যার মধ্যে নওয়াপাড়া পৌর এলাকায় ২৭৫টি এবং সুন্দলী ইউনিয়নে ৭৭৯টি গাছ পড়েছে। ইতোমধ্যে পৌরসভার ড্রেন নির্মাণের সময় মেহগনি, রেইনট্রি ও ইপিলইপিল মিলিয়ে তেইশটি গাছ কাটা হয়েছে।
গত পহেলা নভেম্বর নির্দিষ্ট সড়কগুলো ঘুরে দেখা যায়, রাস্তার দুইধারে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলোর গায়ে লালকালি দিয়ে ক্রমিক নম্বর লিখে রাখা হয়েছে। উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার নির্বাহী পরিচালক কানিজ শবনম গত বছরের নয় সেপ্টেম্বর পৌরসভার প্রশাসকের কাছে গাছগুলো বিক্রির অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন। এরপর তৎকালীন পৌর প্রশাসক এস এম শাহীন দশ সেপ্টেম্বর বিভাগীয় বন কর্মকর্তার কাছে চিঠি পাঠান। পরবর্তীতে বর্তমান পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ সালাউদ্দীন গাছ বিক্রি করে লভ্যাংশ বন্টনের অনুমতি চেয়ে ষোল নভেম্বর বন বিভাগের কাছে আবেদন করেন। এই আবেদনের প্রেক্ষিতে বিভাগীয় বন কর্মকর্তা অমিতা মণ্ডল নির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে গাছ কাটার অনুমতি প্রদান করেন।
বন কর্মকর্তা অমিতা মণ্ডল গণমাধ্যমকে জানান, আবেদন পাওয়ার পর গাছের সঠিক মূল্য নির্ধারণ ও নতুন গাছ লাগানোর পূর্বশর্ত সাপেক্ষে এই গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে বর্তমান পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শেখ সালাউদ্দীন জানান, তিনি যোগদানের পর পরিস্থিতি পুরোপুরি অনুধাবন করার আগেই গাছ কাটার আবেদন করেছিলেন। এখন বিষয়টি পরিষ্কার হওয়ায় তিনি আর গাছগুলো কাটতে দিতে চান না। তার মতে, গাছ প্রকৃতির অমূল্য সম্পদ এবং জলবায়ু পরিবর্তন রোধে এদের গুরুত্ব অপরিসীম। গাছগুলো কাটা হলে ওই এলাকা সম্পূর্ণ বিবর্ণ হয়ে পড়বে। তাই তিনি এখন অনুমতি না দেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, গাছ বিক্রির চূড়ান্ত অনুমতির জন্য মন্ত্রণালয়েও চিঠি পাঠানো হয়েছিল। মন্ত্রণালয় একটি গাছ কাটার বিপরীতে তিনটি নতুন গাছ রোপণের শর্তে অনুমোদন দেয়। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এখন অনুমতি প্রদানে বাধা দেওয়ায় গাছগুলো বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
ভবদহ পানিনিষ্কাশন সংগ্রাম কমিটির প্রধান উপদেষ্টা ইকবাল কবির জাহিদ বলেন, যেকোনো মূল্যে পরিবেশ রক্ষায় গাছ কাটা বন্ধ করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ভবদহ এলাকার জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই গাছগুলো টিকিয়ে রাখা বাধ্যতামূলক। সরকারের বিকল্প কোনো তহবিল থেকে সুফলভোগী নারীদের পাওনা বুঝিয়ে দিয়ে এই বৃক্ষগুলো রক্ষা করার ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।