
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
কুড়িগ্রামের চিলমারী নদীবন্দরের বাজারে পরিচয় হয় ৪০ বছর বয়সী নূর আলমের সঙ্গে, যিনি জীবন বাজি রেখে আসামে মাছ ধরতে যান। তাঁর বাড়ি কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার রমনা ইউনিয়নের ব্যাপারীপাড়ায়। নূর আলমের মতো মাছ ধরার টানে দেশান্তরি হন এই অঞ্চলের আরও অনেকে। আজ থেকে প্রায় ২৭-২৮ বছর আগে চাচার হাত ধরে প্রথম সীমান্ত পেরিয়ে আসামে গিয়েছিলেন তিনি। সে সময় বর্তমানের মতো পাসপোর্ট ও ভিসার কড়াকড়ি ছিল না। গ্রামের মানুষের পাশাপাশি ছোট ছেলেরাও সে যাত্রায় শামিল হতো। নৌকা ও বাসে টানা দুই দিনের দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে তাঁরা আসামের জোড়হাটে পৌঁছাতেন।
কেন তাঁরা জোড়হাটকে বেছে নিতেন, তার ব্যাখ্যায় নূর আলম জানান, একেক জেলের গন্তব্য একেক জায়গায় হলেও তাঁদের বাপ-দাদারা জোড়হাটে মাছ ধরতেন এবং সেখানকার মানুষের আচরণ বেশ ভালো। এর পেছনে আরেকটি বড় কারণ রয়েছে। সাধারণত অন্য এলাকার জলমহালের মালিক চার-পাঁচজন থাকলেও জোড়হাটে মালিক থাকেন মাত্র একজন। মালিক কম থাকায় জেলের ভাগে মাছ বেশি পড়ে। মাছ বিক্রির হিসাব দিয়ে তিনি জানান, মোট বিক্রির ৪০ শতাংশ নেন জলমহালের মালিক আর বাকি ৬০ শতাংশ পান জেলেরা। চিলমারীতে ব্রহ্মপুত্র নদ থাকা সত্ত্বেও আসামে যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, মাছ সবসময় উজানের দিকে সাঁতার কাটে। এছাড়া আসামে নদীর মাছ সংরক্ষণের স্বার্থে বছরের নির্দিষ্ট কিছু সময় মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। নদীর দুই ধারে বন ও জলাভূমি থাকায় মাছ সহজে বড় হওয়ার পর্যাপ্ত সুযোগ পায়, যার ফলে সেখানে মাছের প্রাচুর্যও বেশি থাকে। পাশাপাশি সেখানে চাল ও সবজির দাম তুলনামূলক কম। নৌকার ভাড়া গুনতে হলেও জাল নিজেদেরই বহন করতে হয়।
মাছ ধরার মৌসুম শেষ হলে বা নিষেধাজ্ঞা জারির সময় তাঁরা আবার নিজ বাড়িতে ফিরে আসেন। ফেরার সময় তাঁদের ব্যবহৃত জালগুলো কোনো পরিচিত মানুষের বাড়িতে নিরাপদে রেখে আসেন, যাতে পরবর্তী মৌসুমে সেগুলো আবার কাজে লাগাতে পারেন। দলবেঁধে মাছ শিকার করে তাঁরা অতীতে কখনো এক লাখ, কখনো দুই লাখ আবার কখনো পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করেছেন। কিন্তু এত বছর ধরে এই কষ্টকর পেশায় থেকেও নূর আলমের জীবনে কোনো স্বস্তি আসেনি। তাঁর একমাত্র সন্তান জন্ম থেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং তাঁর স্ত্রীও শারীরিকভাবে অসুস্থ। স্ত্রী ও সন্তানের চিকিৎসাপত্র চালাতে গিয়ে তাঁর প্রায় ১৪-১৫ লাখ টাকা খরচ হয়ে গেছে। নিজের কোনো স্থায়ী জমি কিংবা ঘরবাড়ি ছিল না। পরবর্তীতে বড় ভাইয়ের দেওয়া মাত্র সাড়ে তিন শতক জমির ওপর একটি ছোট ঘর তুলে কোনোমতে দিন কাটাচ্ছেন। বড় মেয়ের বিয়ে দিলেও তাঁর ছোট মেয়ের বয়স মাত্র এক বছর। জীবিকার তাগিদে তিনি এখন পুরোপুরি বেকার এবং মাঝেমধ্যে স্থানীয় বালুর ট্রলারে শ্রমিকের কাজ করে দিন পার করেন।
অন্যদিকে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবন সংগ্রামের গল্প ৩৬ বছর বয়সী আদমের, যাঁর বাবা রফিকুল ইসলাম। তাঁদের আদি বাড়ি রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ফরিদাবাদ ডাক্তারপাড়ায় হলেও তিনি বর্তমানে কুড়িগ্রাম শহরের ‘ঐশী রেস্তোরাঁ’য় কর্মরত আছেন। বাবুর্চি হিসেবে তিনি এমন অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেছেন যে কুড়িগ্রামের মতো মফস্বল শহরেও তাঁর দৈনিক মজুরি দেড় হাজার টাকা, যার মাসিক হিসাব দাঁড়ায় প্রায় ৪৫ হাজার টাকায়। শুধু তাই নয়, আসন্ন মাস থেকে তাঁর এই দৈনিক মজুরি বেড়ে দুই হাজার একশ টাকায় উন্নীত হওয়ার জোর সম্ভাবনা রয়েছে। নিয়মিত এই আয়ের বাইরেও তিনি প্রতি মাসে বিভিন্ন বিয়ের রান্নার কাজ পেয়ে থাকেন। গড়ে প্রতি মাসে চার থেকে পাঁচটি বিয়ের অনুষ্ঠানে বাবুর্চি হিসেবে কাজ করেন এবং প্রতিবার পারিশ্রমিক পান পাঁচ হাজার টাকা করে। বিয়ের এই মৌসুমী রান্না থেকে তাঁর মাসিক আয় আরও ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা অতিরিক্ত যোগ হয়। এই বাড়তি অর্থ তিনি অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে জমিয়ে রাখেন।
ভবিষ্যৎ সঞ্চয় ও জীবনদর্শন নিয়ে আদম বলেন, সরকারি চাকরিতে যেমন নিশ্চিত পেনশনের ব্যবস্থা থাকে, তাঁর জীবনও ঠিক সে রকম। এই চাকরি ছেড়ে দিয়ে তিনি অন্য কিছু করবেন কি না, তা নিয়ে তাঁর ভাবনা ভিন্ন। বাড়িতে যে টাকা পাঠান, তা পারিবারিক কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। নিজে নতুন কিছু করতে গেলে মা হয়তো বলবেন এটা করা অনুচিত, বাবা বলবেন থাক দরকার নেই, আর ছোট ভাইও মনঃক্ষুণ্ন হতে পারে। তাই পরিবারের ওপর ভরসা রেখেই তিনি নিজের পুঁজি জমাচ্ছেন এবং সৃষ্টিকর্তা সুস্থ রাখলে আগামী দুই বছর পর নিজের বাড়িতে স্থায়ীভাবে ফিরে যাবেন।
আদমের জীবন সংগ্রামের শুরুটা বেশ নাটকীয় ও করুণ। ২০০২ সালে মাত্র ১১ বছর বয়সে পরিবারের একটি ছোট কাজের নির্দেশ অমান্য করে তিনি ঘর ছাড়েন। তখন তাঁদের সংসার ছিল চরম অভাবের, যেখানে সারা দিনেও ঠিকমতো দুবেলা খাবার জুটত না। বাড়ি থেকে পালিয়ে তিনি প্রথমে তারাগঞ্জ বাজারে দুই দিন কাটিয়ে তৃতীয় দিনে রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। এরপর একে একে দিনাজপুর, রংপুর, নারায়ণগঞ্জ, সিলেট ও গাইবান্ধা ঘুরে শেষ পর্যন্ত কুড়িগ্রামে এসে থিতু হন। ছোটবেলায় রংপুর কিংবা দিনাজপুর সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণাই ছিল না। রংপুরের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়ে ভুলবশত তিনি পৌঁছান দিনাজপুরে। সেখানে একটি স্থানীয় হোটেলে ১০-১২ দিন কাজ করার পর বাসস্ট্যান্ডের কাছে ‘মায়ের দোয়া’ নামের একটি ছোট রেস্তোরাঁতেও শ্রম দেন। সেই হোটেলের মালিক তাঁকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ করতেন। কিন্তু মনের অদম্য টানে সেখান থেকেও বাসে চড়ে আবার রংপুরে ফিরে আসেন তিনি।
সে সময় কিশোর বয়সে চারপাশ ঘুরে দেখার প্রচণ্ড ইচ্ছা ছিল তাঁর। ভ্রমণের নেশায় একসময় নিজের কাছে থাকা সব জমানো টাকা ফুরিয়ে গেলে তিনি বাধ্য হয়ে বিভিন্ন হোটেলে কাজ শুরু করেন। রাতের বেলা হোটেলের কাজে সময় দিলেও বিকেলের অবসর সময়ে তিনি শহর ঘুরে দেখতেন। তখন তাঁদের পারিবারিক অবস্থাও ছিল অত্যন্ত শোচনীয়। নিজেদের কোনো কৃষিজমি ছিল না, এমনকি যে হালের গরু ছিল সেটিও ছিল তাঁর দাদার মালিকানাধীন। চাচার সংসার ছিল আলাদা এবং তাঁদের সংসারও চলত পৃথকভাবে। তাঁদের মাথাগোঁজার একমাত্র ঠাঁই ছিল খড়ের তৈরি একটি কুঁড়েঘর। সেই ঘরের একপাশে গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি রাখা হতো এবং অন্যপাশে বাবা-মা ও তিন ভাইবোন মিলে গাদাগাদি করে বসবাস করতেন।
অতীতের সেই দিনগুলোর স্মৃতিচারণা করে আদম জানান, বর্ষার দিনে ছাদ দিয়ে সরাসরি বৃষ্টির পানি তাঁদের গায়ে এসে পড়ত। কালবৈশাখী ঝড় কিংবা তুফান শুরু হলে তাঁরা সবাই ভয়ে খাটের নিচে গিয়ে লুকিয়ে থাকতেন, পাছে কখন ঘরের চাল উড়ে যায় বা ঘর ভেঙে পড়ে। তবে সময়ের পরিক্রমায় সেই দুঃসহ দিনগুলো এখন কেবলই অতীত। মহান আল্লাহর রহমতে তাঁরা এখন একটি পাকা বাড়িতে বসবাস করছেন। প্রায় পাঁচ-ছয় বছর পর তাঁর প্রবাস থেকে বাবাও বাড়িতে ফিরে আসেন। বর্তমানে তাঁদের পরিবারের মূল চালিকাশক্তি হলেন তাঁর মা। টিনের ঘর তোলার পর বড় বোনের বিয়ে দিয়েছেন, দুই ভাই কর্মক্ষম হয়ে উঠেছে এবং বর্তমানে তাঁরা চার রুমের একটি ছাদঢালাই করা পাকা বাড়ি নির্মাণ করেছেন। পাশাপাশি বর্তমানে তাঁদের প্রায় ৬০ শতক জমি রয়েছে, যার মধ্যে প্রায় ৫১ শতক ধানের জমি এবং বাকি অংশ বাড়িভিটা হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
জীবনের এত বড় কষ্ট ও প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আদমের আজকের এই অবস্থানে পৌঁছানোর পেছনে প্রধানত দুটি বিষয় চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে—জীবনের তীব্র ক্ষুধা এবং মায়ের সীমাহীন কষ্ট। মায়ের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে তিনি বলেন, মা যেভাবে কষ্ট করে একমুঠো ভাত জোগাড় করে আমাদের মুখে তুলে দিতেন, তা কোনোদিন ভোলার নয়। অনেক সময় এমন হয়েছে যে মা নিজে না খেয়ে আমাদের খাইয়েছেন। ঘরে একমুঠো ভাত না থাকায় মা আমাদের সেদ্ধ আঁটিকলা খাইয়ে দিন পার করেছেন। মায়ের সেই ত্যাগের স্মৃতি তাঁর আজীবন মনে থাকবে। নিজের এই সাফল্যের পেছনে তিনি তাঁর ওস্তাদ আশরাফের অবদানকেও অত্যন্ত শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। বহু ওস্তাদের সান্নিধ্যে কাজ শিখলেও জীবনের শেষ পর্যায়ে এমন একজন ওস্তাদ তিনি পেয়েছেন, যিনি তাঁকে সন্তানের স্নেহে নিজের হাতে যত্ন করে রান্না শিখিয়েছেন এবং এক থালায় ভাত খাইয়েছেন।
আশরাফ ওস্তাদ একসময় তাঁকে গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জে একটি নতুন হোটেল উদ্বোধনের জন্য দায়িত্ব দিয়ে পাঠান। তাঁর হাতের রান্নার সেই হোটেলটি অত্যন্ত সফলভাবে চলতে শুরু করে এবং প্রতিদিন অন্তত দুই বস্তা চালের ভাত বিক্রি হতো। পরবর্তীতে ওস্তাদের অকৃত্রিম দোয়ায় তিনি নিজের হাতে মোট চারটি দোকান উদ্বোধন করেছেন—কুড়িগ্রামে দুটি, নারায়ণগঞ্জে একটি এবং সুন্দরগঞ্জে একটি। বর্তমানে এই প্রতিটি প্রতিষ্ঠানই অত্যন্ত সফলভাবে পরিচালিত হচ্ছে।
নূর আলম ও আদম—দুজনেই নিজ নিজ পেশায় অত্যন্ত দক্ষ ও পরিশ্রমী এবং দুজনেই জীবিকা নির্বাহ করতে গিয়ে ভালো পরিমাণ অর্থ উপার্জন করেছেন। কিন্তু বাস্তবতার নির্মম সত্য হলো, একজনের সঞ্চয়ের খাতা সম্পূর্ণ শূন্য, আর অন্যজনের সঞ্চয়ের খাতা কানায় কানায় পূর্ণ। এই দুই ভিন্ন মানুষের জীবনের গভীর কথাগুলো পর্যালোচনা করলে স্পষ্ট হয় যে, মানুষের জীবনে কেবল আয়ের পরিমাণটাই বড় কোনো প্রশ্ন নয়, বরং সেই অর্জিত আয় সঠিকভাবে ধরে রাখা বা সংরক্ষণ করাটাই আসল চ্যালেঞ্জ। কার জীবনপাত্র কেন ফুটো আর কার ঝুড়ির তলাই বা নেই—এই মৌলিক প্রশ্নগুলোর সুরাহা না করতে পারলে জাতীয় মাথাপিছু আয় কিংবা জিডিপির বড় বড় অর্থনৈতিক তত্ত্ব কেবল ফাঁকা কলসির মতো অর্থহীন আওয়াজ তুলবে। এই দুটি ভিন্ন মানুষের জীবনকাহিনি মূলত আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরের সেই অব্যবস্থাপনা ও অদৃশ্য ফুটোটিকেই সবার সামনে নির্মমভাবে উন্মোচন করে দেয়।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।