
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বলিউড অভিনেতা শাহরুখ খানের আসন্ন ‘কিং’ সিনেমার নতুন গান ‘তু মিল যায়ে’ মুক্তি পাওয়ার পর থেকেই দর্শক-শ্রোতাদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। ইন্টারনেট দুনিয়ায় গানটির জনপ্রিয়তা এতটাই তুঙ্গে পৌঁছেছে যে, মাত্র পাঁচ দিনের ব্যবধানে কেবল ইউটিউবেই এর ভিউয়ের সংখ্যা ছয় কোটি ছাড়িয়ে গেছে।
তবে এই বিপুল সাফল্যের পাশাপাশি গানটি ঘিরে একটি নতুন বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। বহু মানুষের প্রশংসার পাশাপাশি একদল শ্রোতার পক্ষ থেকে গানটির সুরের মৌলিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এবং সরাসরি সুর চুরির গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।
এক সচেতন শ্রোতার দাবি অনুযায়ী, প্রকাশিত নতুন এই হিন্দি গানটির সুরের সঙ্গে পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতনামা সংগীতশিল্পী মৌসুমী ভৌমিকের অত্যন্ত জনপ্রিয় বাংলা গান ‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি’-র সুরের চমৎকার মিল রয়েছে। এই মিল খুঁজে পাওয়ার পর ওই শ্রোতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গায়িকা মৌসুমী ভৌমিককে বিশেষভাবে ট্যাগ করেন।
সামাজিক মাধ্যমে শ্রোতার এই পোস্ট এবং সুর চুরির বিষয়টি মৌসুমীর নজরে আসার পর থেকেই তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। ভক্তের করা এমন দাবির প্রেক্ষিতে মৌসুমী ভৌমিক যে প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন, তা ইতিমধ্যেই সংগীতপ্রেমীদের মাঝে আলাদা মনোযোগ আকর্ষণ করেছে।
ভারতীয় গণমাধ্যমের বিভিন্ন সূত্রে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, মৌসুমী ভৌমিকের এক অনুরাগী সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘তু মিল যায়ে’ গানের সঙ্গে তাঁর গাওয়া ‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি’ গানের মিল পাওয়ার কথাটি তুলে ধরেন। সেই পোস্টে গায়িকাকে ট্যাগ করার মাধ্যমে বিষয়টি তাঁর দৃষ্টিগোচর করা হয়।
সুর চুরির এই অভিযোগের জবাবে মৌসুমী সরাসরি কোনো ক্ষোভ প্রকাশ করেননি বা অভিযোগটি পুরোপুরি সমর্থনও করেননি। বরং তিনি নিজের সংগীতভাবনা এবং তাঁর গানে ব্যবহৃত সুরের মূল উৎস সম্পর্কে একটি দীর্ঘ ও মননশীল ব্যাখ্যা উপস্থাপন করেছেন।
সামাজিক মাধ্যমে নিজের মন্তব্যে মৌসুমী ভৌমিক লিখেছেন যে, তাঁর অনুরাগী তাঁকে বিষয়টি জানাতে চেয়েছেন বলেই তিনি তাকে ট্যাগ করেছেন। তিনি আরও জানান যে গানটি এর আগে তাঁর শোনা ছিল না, অনুরাগী বলবার পরেই তিনি সেটি শুনেছেন; কিন্তু শ্রোতার মতো তাঁর নিজের কাছে গান দুটির সুর এক রকম বলে মনে হয়নি।
সুর নিয়ে নিজের ভাবনা স্পষ্ট করে মৌসুমী উল্লেখ করেন যে, ঘুরেফিরে আমরা সংগীতের সাথে জড়িত সকলে মূলত একই ধরনের স্বর নিয়ে খেলা করে থাকি। একই সুরের বিভিন্ন ধরনের পারমিউটেশন ও কম্বিনেশন বা বিন্যাসই বারবার ঘুরেফিরে আসে। নতুন এই গানে তাঁর নিজের গানের কোনো বিশেষ ছায়া রয়েছে বলে তাঁর ব্যক্তিগতভাবে একটুও মনে হয়নি।
পাশাপাশি মৌসুমী নিজের সৃষ্টিকে এমন কোনো মৌলিক বা অভূতপূর্ব সৃষ্টি বলে দাবি করেননি যা আগে কখনো কেউ তৈরি করেননি। তিনি বরং বাংলা লোকসংগীত এবং ঐতিহ্যবাহী পাঁচালীর সুরের কাঠামোর সঙ্গে তাঁর নিজের গানের সুরের গভীর যোগসূত্রের কথা অত্যন্ত স্পষ্ট ভাষায় তুলে ধরেছেন।
তিনি তাঁর বক্তব্যে আরও ব্যাখ্যা করেন যে, তিনি নিজে এমন কোনো অমোঘ সৃষ্টি করেন নামক যা পৃথিবীর কেউ কখনো দেখেনি। কিংবা এতই আনকোরা কোনো মিউজিক্যাল ফ্রেজ তিনি তৈরি করেননি যা আগে কখনো কেউ ব্যবহার করেনি। এই নির্দিষ্ট স্বরের সমষ্টি বা বিন্যাস বাংলা পাঁচালীর সুরেও শুনতে পাওয়া যায়।
‘আমি শুনেছি সেদিন তুমি’ গানটি যেভাবে শুরু হয়, তার সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে সেটি মূলত একটি পাঁচালীর মিউজিক্যাল ফ্রেজ। তবে মৌসুমীর গানটি শুধু সেই পাঁচালীতেই আটকে থাকে না, বরং সেই ছোট্ট বীজ থেকে ক্রমান্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ গাছ হিসেবে বেড়ে ওঠে।
তিনি সচেতনভাবে কোনো পাঁচালী ভাবার চেষ্টা করেননি জানিয়ে বলেন যে, তাঁর নিজের শোনার অভিজ্ঞতার ভেতরে যা যা অবচেতন মনে জমা ছিল, সম্ভবত তার মধ্য থেকেই তাঁর নিজের গানের সুরের জন্ম হয়েছে।
নিজের দীর্ঘ সংগীতজীবনের একটি পুরোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও এই আলোচনার সময় ভাগ করে নিয়েছেন প্রবীণ এই শিল্পী। একবার তাঁর একটি গান শুনে এক বন্ধু তাঁর মধ্যে বিখ্যাত বিদেশি শিল্পী জোয়ান বায়েজের গানের কথা মনে করিয়ে দিয়েছিলেন। অথচ মৌসুমী যখন সেই গানটি তৈরি করছিলেন, তখন তাঁর মনে বিন্দুমাত্র জোয়ান বায়েজের কথা ছিল না।
অন্যের সৃষ্টিতে পরিচিত কোনো সুরের ছায়া খুঁজে পাওয়ার এই মানসিক প্রবণতা এবং জটিল বিষয়টি তিনি এই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার মাধ্যমেই অত্যন্ত সুন্দরভাবে ব্যাখ্যা করেছেন।
মৌসুমী ভৌমিকের সুচিন্তিত মতে, শিল্পীরা জেনেশুনে অথবা কোনো রকম পূর্বসচেতনতা ছাড়াই তাঁদের শোনা এবং চেনা জানা বিভিন্ন সুরের প্রভাব নিজেদের অজান্তে বহন করে চলেন। এই সত্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন যে, এই ছায়া আসলে আমরা কমবেশি সবাই বহন করি, তা আমরা জেনে করি কিংবা না জেনেরেই করি।
তিনি নিজে এবং তাঁর শ্রোতারাও এর বাইরে নন বলে মন্তব্য করেন। মৌসুমীর মতে, আমরা যা কিছু ভালো করে চিনি এবং যাঁদের আমরা চিনে রাখি, সাধারণত তাঁদেরই কাজের একটি অদৃশ্য ছায়া আমরা অন্যের মুখে বা সৃষ্টিতে দেখতে পাই।
ভক্তের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন যে, শ্রোতার গানটি দেখতে বা শুনতে পাওয়ার মধ্যে কোনো ধরনের ভুল নেই, কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে নতুন এই হিন্দি গানটির সঙ্গে তাঁর নিজের পুরোনো বাংলা গানটির কোনো ধরনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পর্ক রয়েছে।
সবশেষে তিনি যোগ করেন যে, যদি সত্যিই হুবহু কেউ জেনেশুনে অন্য একজনের কাজ থেকে কিছু অংশ চুরি করে নিজের বলে চালিয়ে দেয়, তবে নিশ্চিতভাবে বিষয়টি নিয়ে ভাবা উচিত। কিন্তু সামান্য সাদৃশ্য পেলেই এভাবে অহেতুক ভেবে অস্থির হওয়া ঠিক নয়।
সুর চুরির মতো একটি সংবেদনশীল অভিযোগকে কেন্দ্র করে যখন বিভিন্ন মহলে বিতর্ক চলছে, তখন মৌসুমী ভৌমিকের এই অত্যন্ত সংযত, পরিপক্ব ও উদার প্রতিক্রিয়া সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দারুণ প্রশংসিত হচ্ছে।
অভিযোগকারী সাধারণ শ্রোতার আবেগ বা অনুভূতির প্রতি কোনো রকম অসম্মান না দেখিয়ে, এবং একই সঙ্গে নিজের গানের সঙ্গে নতুন হিন্দি গানের মিলের দাবিও পুরোপুরি মেনে না নিয়ে তিনি যেভাবে শিল্প ও সৃষ্টিশীলতার অন্তর্নিহিত প্রভাবের বিষয়টি সামনে এনেছেন, তা অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।