
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
শারীরিক গঠনকে কখনো দুর্বলতা হিসেবে গ্রহণ না করে বরং তাকে নিজের সবচেয়ে বড় শক্তিতে রূপান্তর করেছেন লিজি ভেলাস্কেজ। সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়ে ভেঙে পড়ার বদলে বিশ্বজুড়ে সাহস, আত্মবিশ্বাস ও প্রতিবাদের এক অনন্য দীক্ষায় পরিণত হয়েছে তাঁর পুরো জীবন।
যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যের অস্টিন শহরে জন্ম নেওয়া এলিজাবেথ অ্যান ভেলাস্কেজের জন্মতারিখ ছিল ১৯৮৯ সালের ১৩ মার্চ। পৃথিবীতে আসার সময় তাঁর শারীরিক ওজন ছিল সাকুল্যে ১ দশমিক ২ কেজির মতো। চিকিৎসকেরা জন্মের পরপরই আঁচ করতে পেরেছিলেন যে তাঁর শারীরিক গঠন অন্য দশটি সুস্থ শিশুর থেকে একেবারেই আলাদা। নিয়নেটাল প্রোজেরয়েড সিনড্রোম কিংবা মারফানয়েড-প্রোজেরয়েড-লিপোডিস্ট্রফি সিনড্রোম নামের অত্যন্ত বিরল একটি জিনগত ব্যাধিতে আক্রান্ত ছিলেন তিনি।
এই বিশেষ রোগটির কারণে তাঁর শরীরে প্রাকৃতিকভাবে চর্বি সঞ্চিত হওয়ার কোনো সুযোগ থাকে না। যে কারণে প্রচুর পরিমাণে খাবার খাওয়া সত্ত্বেও তাঁর শরীরের ওজন স্বাভাবিক নিয়মে বৃদ্ধি পায় না। শরীরের স্বাভাবিক শক্তির চাহিদা মেটানোর জন্য তাঁকে প্রতিদিন প্রায় পাঁচ হাজার থেকে আট হাজার ক্যালরি শক্তির খাবার খেতে হয়। এ ছাড়া তাঁর ডান চোখ সম্পূর্ণ অন্ধ এবং বাম চোখেও রয়েছে সীমিত দৃষ্টিশক্তি। কিন্তু এতসব মারাত্মক শারীরিক প্রতিকূলতা কখনোই তাঁর অগ্রযাত্রাকে থামিয়ে রাখতে পারেনি।
২০০৬ সালের কোনো একদিন আকস্মিকভাবে ইন্টারনেট ঘাঁটতে গিয়ে ইউটিউবে নিজের একটি ভিডিও নজরে আসে ১৭ বছর বয়সী কিশোরী লিজির। 'দ্য ওয়ার্লডস আগলিয়েস্ট উয়োম্যান' শিরোনামের ওই ভিডিওটি সম্পূর্ণ কোনো ধরনের অনুমতি ছাড়াই তাঁকে নিয়ে তৈরি করা হয়েছিল। লাখ লাখ দর্শক সেটি দেখছিলেন এবং ভিডিওর নিচে তাঁর চেহারা নিয়ে উপহাস করার পাশাপাশি তাঁকে পৃথিবী থেকে চিরতরে সরিয়ে দেওয়ার মতো ভয়ানক মন্তব্য করা হয়েছিল। এমনকি তাঁর বাবা-মায়ের বিরুদ্ধেও কুরুচিপূর্ণ অভিযোগ তুলেছিলেন অনেকে।
বয়স তখন মাত্র ১৭ বছর হওয়ায় এই নৃশংস ঘটনাটি তাঁর মনে গভীর মানসিক আঘাত হেনেছিল। তবে লিজি তখনই দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন যে অন্যের বিষাক্ত মন্তব্য তাঁর জীবনকে নির্ধারণ করতে পারবে না। তিনি নিজের অদম্য পড়াশোনা চালিয়ে যান এবং পরবর্তীতে টেক্সাস স্টেট ইউনিভার্সিটি থেকে যোগাযোগ বিষয়ে সাফল্যের সঙ্গে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন।
পরবর্তী সময়ে ২০১৩ সালে তাঁর বিখ্যাত 'হাউ ডু ইউ ডিফাইন ইয়োরসেলফ' শীর্ষক টেড এক্স বক্তৃতা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোড়ন তৈরি করে। সেই মঞ্চে তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেন যে মানুষ তাঁকে কীভাবে অবলোকন করছে, সেটি তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। তবে তিনি নিজের জীবনকে কোন দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখবেন এবং কীভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যাবেন, সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ তাঁর নিজের হাতেই রয়েছে।
ওই বক্তৃতায় তিনি নিজের দীর্ঘ লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা শেয়ার করে আত্মপরিচয় গঠন, আত্মবিশ্বাস অর্জন এবং ইতিবাচক মানসিকতার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করেন। তাঁর বার্তার মূল মর্মার্থ ছিল এই যে, নিজের জন্মগত সীমাবদ্ধতা কিংবা অন্যের ছুঁড়ে দেওয়া নেতিবাচক কথা দিয়ে কখনোই নিজের মূল্যায়ন করা উচিত নয়। এর পরিবর্তে নিজের নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং মহৎ কাজের মাধ্যমেই প্রতিটি মানুষকে নিজস্ব পরিচয় গড়ে তুলতে হবে।
এর পর থেকেই লিজি সাইবার বুলিং ও সাধারণ বুলিংয়ের বিরুদ্ধে চলমান আন্তর্জাতিক আন্দোলনের অত্যন্ত পরিচিত এক মুখ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বিশ্বমঞ্চে যোগ দিয়ে তিনি তরুণ প্রজন্মকে নানাভাবে সাহস জুগিয়ে চলেছেন। বিশেষ করে অনলাইন দুনিয়ায় কাউকে তাঁর বাহ্যিক চেহারা, শারীরিক গঠন কিংবা ব্যক্তিগত কোনো বৈশিষ্ট্য ধরে উপহাস বা অপমান না করার পক্ষে জোরালো সচেতনতা তৈরি করছেন তিনি।
নিজের জীবনের রূঢ় বাস্তবতাকে সামনে রেখে একাধিক মৌলিক বই রচনা করেছেন এই সংগ্রামী নারী। তাঁর প্রকাশিত উল্লেখযোগ্য বইগুলোর মধ্যে রয়েছে 'লিজি বিউটিফুল', 'চুজিং হ্যাপিনেস', 'বি বিউটিফুল বি ইউ' এবং 'ডেয়ার টু Cাইন্ড'। তাঁর এই সাহিত্যকর্মগুলোতে আত্মমর্যাদাবোধ, সৌন্দর্যের গতানুগতিক ধারণা পরিবর্তন, পারস্পরিক সহমর্মিতা এবং নিজের প্রতি ভালোবাসার বাণী গুরুত্বের সঙ্গে ফুটে উঠেছে।
তাঁর বর্ণিল ও সংগ্রামমুখর জীবন নিয়ে ২০১৫ সালে নির্মিত হয় প্রামাণ্যচিত্র 'আ ব্রেভ হার্ট: দ্য লিজি ভেলাস্কেজ স্ট으রি'। এই প্রামাণ্যচিত্রে তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের বেঁচে থাকার লড়াই, সাইবার বুলিংয়ের নির্মম অভিজ্ঞতা এবং সেই বেদনাকে একটি ইতিবাচক সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়ার পুরো গল্পটি অত্যন্ত সুন্দরভাবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে।
লিজির এই জীবনালেখ্য আমাদের বারবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে সৌন্দর্য কোনো নির্দিষ্ট শারীরিক কাঠামো কিংবা চেহারার ফ্রেমে আবদ্ধ থাকতে পারে না। বর্তমান যুগের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোয় যখন একটিমাত্র ছবি বা মন্তব্য যেকোনো মানুষকে মুহূর্তের মধ্যে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে, ঠিক তখনই লিজির গল্প আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। অন্যকে ছোট করে তুচ্ছ আনন্দ পাওয়ার পরিবর্তে সবার প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করাই যে প্রকৃত মানবিকতা, লিজি ভেলাস্কেজের জীবন তারই উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তিনি কেবল নিজের অধিকারের জন্যই লড়াই করেননি, বরং তাঁর মতো অনুরূপ পরিস্থিতির শিকার হওয়া বিশ্বের লাখ লাখ মানুষের জন্য সাহসের এক মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।