
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
মার্গারেট অ্যাটউড, জেডি স্মিথ এবং ইয়ান ম্যাকইওয়ানের মতো বিশ্বখ্যাত কথাসাহিত্যিকরা তাঁদের আসন্ন উপন্যাসে কোনো একটি চরিত্রের নামকরণের অধিকার উন্মুক্ত নিলামে বিক্রির সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার দুর্গত মানুষদের পাশে দাঁড়াতে এবং তাঁদের পুনর্বাসনের জন্য তহবিল সংগ্রহের মহৎ উদ্দেশ্যেই মূলত এই বিশেষ আয়োজন করা হয়েছে।
এই ব্যতিক্রমী নিলামে অংশ নিয়ে যেকোনো আগ্রহী ব্যক্তি কাঙ্ক্ষিত লেখকের আগামী বইয়ের চরিত্রের নাম নিজেদের পছন্দমতো নির্ধারণ করার সুযোগ কিনে নিতে পারবেন। প্রতিযোগিতায় যিনি সবচেয়ে বেশি আর্থিক মূল্য বা সর্বোচ্চ দর প্রস্তাব করবেন, লেখক তাঁর নাম কিংবা তাঁর বাতলে দেওয়া নামানুসারেই উপন্যাসের একটি চরিত্রের নামকরণ করবেন।
ফ্রিডম ফ্রম টর্চার নামক একটি দাতব্য প্রতিষ্ঠানের দশম বর্ষপূর্তি উদ্যাপনের অংশ হিসেবে এই চ্যারিটি নিলামের পরিকল্পনা করা হয়েছে। আগামী ১১ নভেম্বর ব্রিটিশ রাজধানী লন্ডনের ঐতিহ্যবাহী লন্ডন লাইব্রেরিতে এই সংস্থাটির বর্ণাঢ্য সাহিত্য উৎসব অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে।
নির্ধারিত এই সাহিত্য উৎসবে খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিকদের পাশাপাশি নানা ধরনের নির্যাতন সহ্য করেও অলৌকিকভাবে বেঁচে ফেরা মানুষেরাও সশরীরে উপস্থিত থাকবেন। অনুষ্ঠানটিতে কবিতা আবৃত্তি প্রতিযোগিতার পাশাপাশি বিশেষ সাহিত্য পাঠের আকর্ষণীয় আয়োজনও রাখা হয়েছে বলে আয়োজকরা জানিয়েছেন।
এবারের এই মহৎ উৎসবকে সফল করতে বিশ্বের ৭৫ জনের বেশি প্রথিতযশা লেখক, কবি ও শিল্পী নৈতিক ও প্রত্যক্ষ সমর্থন যুগিয়েছেন। মূল নিলাম পর্বে যুক্ত থাকছে বিখ্যাত শিল্পী কুয়েন্টিন ব্লেকের মনোরম শিল্পকর্ম এবং উইলিয়াম ব্লেকের শৈল্পিক অলংকরণে মেরি ওলস্টোনক্রাফটের গল্পের একটি অমূল্য ও দুর্লভ গ্রন্থ।
এছাড়াও প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক লুইস ডাউটির সঙ্গে সরাসরি বসে পাঠচক্রের আলোচনা ও আড্ডায় অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকছে এই আয়োজনে। পাশাপাশি সাহিত্যিকদের নিজ হাতে নকশা করা ত্রিশের অধিক বিশেষ বুকমার্ক নিয়ে একটি আকর্ষণীয় লটারির ড্র অনুষ্ঠিত হবে।
লটারিতে বিজয়ীদের জন্য উপহার হিসেবে থাকবে সংশ্লিষ্ট লেখকের নিজের স্বাক্ষরিত একটি করে আকর্ষণীয় বই। সব মিলিয়ে সাহিত্যপ্রেমীদের জন্য এই উৎসব এক অন্যরকম মিলনায়তনে পরিণত হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
উৎসবের মূল আকর্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে নিপীড়ন থেকে প্রাণে বেঁচে ফেরা মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সংগ্রামের ওপর ভিত্তি করে আয়োজিত বিশেষ কবিতা প্রতিযোগিতা। বুকার পুরস্কার বিজয়ী বরেণ্য কথাসাহিত্যিক অ্যালান হলিংহার্স্ট এবং বিশিষ্ট কবি র্যাচেল অ্যালেন এই প্রতিযোগিতার বিচারকের দায়িত্ব পালন করবেন।
বিশ্ববিখ্যাত উপন্যাস গার্ল উইথ আ পার্ল ইয়াররিংয়ের রচয়িতা ট্রেসি শেভালিয়ারও অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে এই দাতব্য নিলাম প্রক্রিয়ায় নিজের সম্পৃক্ততা ঘোষণা করেছেন। তিনি দীর্ঘ ২০০৬ সাল থেকে শুরু করে অদ্যাবধি এই মানবিক উদ্যোগের সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত আছেন।
অবশ্য ট্রেসি শেভালিয়ার স্বীকার করেছেন যে, একেবারেই অপরিচিত কোনো ব্যক্তিকে নিজের কাল্পনিক উপন্যাসের চরিত্রের নাম নিজে থেকে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া নিয়ে তাঁর মনে প্রথম দিকে কিছুটা দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল।
শেভালিয়ারের মতে, উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রের নামকরণ তাঁর কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, কারণ একটি নির্দিষ্ট চরিত্রকে ফুটিয়ে তুলতে তাঁকে বছরের পর বছর ধরে গভীর ভাবনাচিন্তা করতে হয়।
তবে তিনি আনন্দের সঙ্গে স্মরণ করেছেন যে, প্রথম নিলামে বিজয়ী লরা ডিভাইনের নামটি তিনি তাঁর একটি উপন্যাসে সার্কাসকর্মী চরিত্রের জন্য ব্যবহার করে দারুণ সন্তুষ্ট হয়েছিলেন। এমনকি সেই ঘটনার সূত্র ধরেই পরবর্তীতে তাঁদের দুজনের মধ্যে গভীর বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল।
শেভালিয়ার জোরালো মতামত ব্যক্ত করে বলেছেন যে, প্রত্যেক মানুষেরই নিজের জীবনের নানামুখী কষ্টকর ও কঠিন অভিজ্ঞতা নিজের ব্যক্তিগত ভাষায় খোলাখুলি প্রকাশ করার পূর্ণ স্বাধীনতা থাকা উচিত।
তিনি নিজের অভিবাসী পরিচয় তুলে ধরে মন্তব্য করেছেন যে, তিনিও মূলত একজন অভিবাসী, কিন্তু যুক্তরাজ্যে স্থায়ীভাবে বসবাস করার অধিকার নিয়ে তাঁকে অতীতে কখনো কেউ কোনো প্রশ্ন করেনি, যার প্রধান কারণ তিনি শ্বেতাঙ্গ ও আমেরিকান।
ফ্রিডম ফ্রম টর্চার সংস্থার দায়িত্বশীল কর্মকর্তা স্যামুয়েল মর্টন উদ্বেগ প্রকাশ করে জানিয়েছেন যে, বর্তমান সময়ে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রগুলোতে আশ্রয়প্রার্থী মানুষের আইনি সুরক্ষার কাঠামো দুর্বল করার একটি বিপজ্জনক প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
তিনি সতর্ক করে বলেছেন যে, আইনি সুরক্ষার এই ঘাটতির ফলে নিজ দেশ ও সমাজ থেকে নির্যাতন এড়াতে পালিয়ে আসা অসহায় মানুষগুলো ভবিষ্যতে পুনরায় তাদের নির্মম নির্যাতনকারীদের ঠিকানায় ফেরত যাওয়ার চরম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন।
নিপীড়িত মানুষের অধিকার নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্যামুয়েল মর্টন আরও স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, কোনো ধরনের সংকীর্ণ রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের লোভে পড়ে নির্যাতন থেকে সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যাওয়া এসব মানুষের মৌলিক আইনি সুরক্ষা কোনোভাবেই খর্ব বা দুর্বল করা সমীচীন হবে না।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।