
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বা বিইআরসি গত ২ নভেম্বর গৃহস্থালিতে সর্বাধিক ব্যবহৃত ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করলেও, রাজধানীর বাজারে তা ২ হাজার ৩৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত মূল্যে বিক্রি হচ্ছে। ঢাকার বিভিন্ন এলাকার খুচরা দোকানগুলো ঘুরে দেখা গেছে, কোথাও কোথাও ক্রেতাদের সরকার নির্ধারিত দামের তুলনায় অন্তত ৩০০ থেকে ৪৪০ টাকা পর্যন্ত বেশি গুনতে হচ্ছে। একই সঙ্গে ৪৫ কেজির বড় সিলিন্ডারেও অতিরিক্ত ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে।
নতুন মূল্য নির্ধারণের প্রক্রিয়ায় আমদানিকারকদের মজুত ও বোতলজাতকরণ বাবদ খরচ প্রায় ৮২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। এছাড়া পরিবেশকদের কমিশন ৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৮৫ টাকা এবং খুচরা বিক্রেতাদের কমিশন ৪৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৭০ টাকা করা হয়েছে। তবে পরিবেশক ও খুচরা ব্যবসায়ীদের দাবি, নির্ধারিত এই বর্ধিত কমিশনে তাঁদের ব্যবসায়িক খরচই উঠছে না।
শীর্ষস্থানীয় আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলোর দাবি, তারা বাজারে এলপিজির সরবরাহ পর্যাপ্ত পরিমাণে বাড়িয়েছেন এবং যারা অতিরিক্ত দাম নিচ্ছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। অন্যদিকে পরিবেশকদের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়েছে যে বাজারে গ্যাসের সরবরাহে কিছুটা ঘাটতি রয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে কিছু কোম্পানিও অতিরিক্ত দাম আদায় করছে।
বিইআরসির চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানান, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ তাদের কাছে রয়েছে এবং এ বিষয়টি নিয়ে কমিশন কাজ করছে। শিল্প খাতে এলপিজির ব্যবহার অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে কি না, তা যাচাই করা হচ্ছে এবং কমিশনের দু'জন সদস্য সরাসরি মাঠপর্যায়ে পরিদর্শনে গেছেন। যারা সরাসরি আমদানি না করে অন্যদের কাছ থেকে গ্যাস কিনছেন, মূলত তারাই বাজারে বেশি দামে বিক্রি করছেন বলে জানিয়েছে বিইআরসি।
দেশে বর্তমানে এক কোটিরও বেশি গ্রাহক এলপিজি গ্যাস ব্যবহার করছেন, যার প্রায় ৮০ শতাংশই গৃহস্থালি রান্নার কাজে খরচ হয়। ২০১৫ সাল থেকে বাসা বাড়িতে পাইপলাইনের গ্যাস সংযোগ বন্ধ থাকায় দেশে এলপিজির চাহিদা তীব্রভাবে বৃদ্ধি পায় এবং বর্তমানে বার্ষিক চাহিদা ছাড়িয়েছে ১৮ লাখ টন। এই খাতের প্রায় ৯৯ শতাংশই বেসরকারি আমদানিকারকদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং মাত্র ১ শতাংশ সরকারি কোম্পানির মাধ্যমে উৎপাদিত হয়ে সরবরাহ করা হয়।
এলপিজি অপারেটরস অব বাংলাদেশ বা লোয়াব ও বিইআরসির তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট মাসে দেশে ১ লাখ ৫৮ হাজার মেট্রিক টন এলপিজি আমদানি হয়েছিল। পরবর্তীতে সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এবং অক্টোবরে আমদানির পরিমাণ কমে ১ লাখ ৪২ হাজার টনের নিচে নেমে আসে। তবে ৪ নভেম্বরের মধ্যেই দেশে আরও প্রায় ৪০ হাজার ২০০ টন নতুন এলপিজি এসে পৌঁছায় এবং লোয়াবের পক্ষ থেকে ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত দামে গ্যাস বিক্রি না করার বিষয়ে বারবার সতর্ক করা হয়েছে।
আমদানিকারকদের একাংশের মতে, বিশ্ববাজারে এলপিজির বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে এবং মধ্যপ্রাচ্য থেকে সরবরাহ প্রায় পুরোপুরি বন্ধ বললেই চলে। আফ্রিকার দেশগুলো থেকে নামমাত্র সরবরাহ পাওয়া যাওয়ায় বর্তমানে দেশের চাহিদার সিংহভাগ এলপিজিই যুক্তরাষ্ট্র থেকে আমদানি করতে হচ্ছে এবং চড়া দাম দিয়ে তা কিনতে হচ্ছে। সেই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র থেকে এলএনজি ও গ্যাস আমদানির ক্ষেত্রে জাহাজ ভাড়াও অনেক বেশি পড়ছে।
মেঘনা ফ্রেশ এলপিজি কোম্পানির প্রধান বিপণন কর্মকর্তা আবু সাঈদ রাজা জানান, তাঁদের চারটি প্ল্যান্ট থেকে সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠান নিজে আমদানি করতে পারছে না, তাদেরও চাহিদামতো সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে, ফলে বাজারে গ্যাসের সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার কথা। তবে বাজার নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরদারি আরও বাড়ানো দরকার বলে তিনি মন্তব্য করেন।
লোয়াবের সাবেক সভাপতি আজম জে চৌধুরী বলেন, বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিতে দামের চেয়ে এলপিজির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করাটাই সবচেয়ে বেশি জরুরি। বাড়তি মূল্যে আমদানি করেও তা বিইআরসির নির্ধারিত দামে সরবরাহ করা হচ্ছে, কারণ গ্যাসের দাম বাড়লে গ্রাহক কমে যাবে যা অপারেটররা চান না। তবে দেশের আনাচে-কানাচে যত্রতত্র যেভাবে খুচরা দোকানে এলপিজি বিক্রি হচ্ছে, তা রোধে কঠোর নজরদারি নিশ্চিত করার ওপর তিনি জোর দেন।
অন্যদিকে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির ভাষ্যমতে, আমদানিকারকদের যেভাবে নানা সুবিধা দেওয়া হয়েছে, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের সেই তুলনায় কোনো পর্যাপ্ত সুবিধা দেয়নি বিইআরসি। তাঁদের দাবি, কমিশনের যে বৃদ্ধি ঘটানো হয়েছে তা প্রয়োজনের তুলনায় বেশ কম এবং বাজারে এখনো পর্যাপ্ত সরবরাহ বৃদ্ধি পায়নি। কোম্পানির প্ল্যান্টে গিয়ে ট্রাক নিয়ে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হওয়ায় তাঁদের পরিবহন খরচ অনেক বেড়ে গেছে।
সমিতির কোষাধ্যক্ষ আবু তাহের কোরেশী জানান, বিইআরসি নির্ধারিত কমিশন অনুযায়ী ঢাকার বাইরে কোনোমতে সরবরাহ করা সম্ভব হলেও ঢাকার ভেতরে তা কোনোভাবেই করা যায় না। রাজধানী ঢাকায় ট্রাকের পরিবহন খরচ অত্যধিক হওয়ায় পরিবেশকেরা কোনোভাবেই সরকারি নির্ধারিত দামে গ্যাস বিক্রি করতে পারছেন না বলে তিনি দাবি করেন।
বাজার নিয়ন্ত্রণে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ভূমিকা প্রসঙ্গে মহাপরিচালক মো. জহিরুল ইসলাম জানান, নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির সুনির্দিষ্ট তথ্য তাঁদের দপ্তরে আসছে। অনেক ব্যবসায়ী বিষয়টি গোপনে রেখে গ্যাস বিক্রি করলেও ইতিমধ্যে বিভিন্ন স্থানে নিয়মিত অভিযান চালিয়ে জরিমানা করা হয়েছে এবং এই ধরনের তদারকি কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
মিরপুরের শেওড়াপাড়া এবং উত্তরার ১২ নম্বর সেক্টরের বেশ কয়েকটি খুচরা দোকান ও ডিলার পয়েন্টে সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, সব জায়গাতেই ২ হাজার ৩৫০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় সিলিন্ডার বিক্রি করা হচ্ছে। এমনকি অনেক বিক্রেতা ভোক্তা অধিকার বা সাংবাদিকদের ভয়ে অপরিচিত ক্রেতাদের কাছে গ্যাস বিক্রি করতে চাচ্ছেন না এবং স্টক থাকা সত্ত্বেও গ্যাস নেই বলে ফিরিয়ে দিচ্ছেন। ঢাকার বাইরের পাঁচটি উপজেলার বিভিন্ন বাজারেও সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে প্রায় ৪০ থেকে ২৪০ টাকা পর্যন্ত বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রির চিত্র দেখা গেছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।