
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সম্প্রতি উচ্চমাধ্যমিক ও সমমানের মূল্যায়ন প্রকাশ পাওয়ার পর থেকেই অসংখ্য তরুণ ও তাদের অভিভাবকেরা পরবর্তী গন্তব্য নিয়ে নানা পরিকল্পনা শুরু করেছেন। দেশের ভেতরে পড়াশোনার পাশাপাশি বিদেশ বিভুঁইয়ে ডিগ্রি অর্জনের স্বপ্ন দেখা শিক্ষার্থীদের জন্য উত্তর আমেরিকার দেশটি অন্যতম একটি লোভনীয় ও চমৎকার গন্তব্য হতে পারে। তবে নিখুঁত ছক, পর্যাপ্ত অর্থনৈতিক সংস্থান এবং সঠিক তথ্যের অভাব থাকলে এই দীর্ঘ ও জটিল পথ পাড়ি দেওয়া অত্যন্ত দুরূহ হয়ে দাঁড়ায়। নিজের বাস্তব অভিজ্ঞতা এবং দেশটির প্রশাসনের সাম্প্রতিক আইনকানুন বিশ্লেষণ করে এই নিবন্ধে পুরো প্রক্রিয়াটির বিশদ বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।
তিনটি ভিন্ন দেশের শিক্ষাপদ্ধতি কাছ থেকে দেখার দীর্ঘ অভিজ্ঞতা থেকে বলা যায়, সেখানকার অ্যাকাডেমিক পরিবেশের প্রধান শক্তি হলো উন্নত ল্যাবরেটরি সুবিধা, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, বৈশ্বিক অংশীদারিত্ব এবং মুক্তবুদ্ধির চর্চা। তবে সেখানে কেউ কাউকে হাত ধরে সঠিক পথ চিনিয়ে দেয় না, বরং সাফল্য পেতে হলে প্রয়োজন হয় তীব্র পরিশ্রম, আত্মনির্ভরশীলতা এবং সময়ের সঠিক ব্যবহার। ভালো ফলাফল অবশ্যই দরকারি, কিন্তু সফল শিক্ষার্থীদের মাঝে কৌতূহল, যোগাযোগের পারদর্শিতা ও জটিল সমস্যা সমাধানের বিশেষ গুণগুলো সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা যায়।
সাধারণত সেখানে মূল শিক্ষাবর্ষের সূচনা হয় সেপ্টেম্বর মাসে, যদিও কিছু প্রতিষ্ঠানে জানুয়ারি কিংবা মে মাসেও শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর ব্যবস্থা রাখা হয়। সেপ্টেম্বর সেশনের জন্য দরখাস্ত পাঠানোর প্রক্রিয়া সাধারণত আগের বছরের শেষ ভাগ থেকেই শুরু হয়ে যায়, আর ভিনদেশি শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে সময়সীমা আরও অনেক আগে শেষ হয়। তাই অন্তত দশ থেকে বারো মাস হাতে রেখে আগাম পরিকল্পনা করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।
স্থানীয় উচ্চমাধ্যমিকের সনদপত্র দিয়েই সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ব্যাচেলর বা স্নাতক প্রোগ্রামে ভর্তির জন্য আবেদন করা সম্ভব হয় এবং সাধারণত একটি ডিগ্রি শেষ করতে তিন থেকে চার বছর সময় লাগে। বিজ্ঞান বিভাগ থেকে কম্পিউটার বিজ্ঞান, প্রকৌশল, বায়োটেকনোলজি, ফার্মেসি ও স্বাস্থ্যবিজ্ঞান, কৃষি এবং পরিবেশবিজ্ঞানে পড়ার চমৎকার সুযোগ রয়েছে। ব্যবসায় শিক্ষা থেকে হিসাববিজ্ঞান, ফিন্যান্স, বিপণন, ব্যবসায় প্রশাসন এবং মানবিক বিভাগ থেকে অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের পথ খোলা রয়েছে।
অনেক প্রখ্যাত প্রতিষ্ঠানে ভিনদেশি শিক্ষার্থীরা উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পেয়ে থাকেন, তবে শুধু প্রতিষ্ঠানের সুনাম দেখে কোনো অন্ধ সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। নির্দিষ্ট কোনো বিষয়ে পাঠ্যক্রমের মান, টিউশন ফি, শহরের জীবনযাত্রার খরচ এবং ভবিষ্যতের ক্যারিয়ার গড়ার সম্ভাবনা সবকিছু একসঙ্গে মিলিয়ে বিবেচনা করা জরুরি। অনেক সময় কম পরিচিত কোনো প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্ট একটি বিভাগই সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর জন্য সবচেয়ে বেশি উপযোগী ও ফলপ্রসূ প্রমাণিত হতে পারে।
সবচেয়ে আদর্শ পদ্ধতি হলো পাবলিক পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হওয়ার আগেই পূর্ণাঙ্গ প্রস্তুতি গ্রহণ শুরু করা এবং প্রথম ধাপে নিজের আগ্রহের বিষয়, প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা ও পরিবারের অর্থনৈতিক সামর্থ্য যাচাই করে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের একটি তালিকা তৈরি করা। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের অফিসিয়াল পোর্টালে গিয়ে দেখতে হবে স্থানীয় সনদ কীভাবে মূল্যায়ন করা হয়, কোন বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক এবং ন্যূনতম কত নম্বর প্রয়োজন। মনে শুধু রাখা দরকার যে কেবল জিপিএ-৫ থাকলেই ভর্তি বা বৃত্তি নিশ্চিত হয় না, বরং প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রগুলোতে বিষয়ভিত্তিক নম্বরও অত্যন্ত গভীরভাবে যাচাই করা হয়।
অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই ভাষাগত দক্ষতার প্রমাণ হিসেবে আইইএলটিএস একাডেমিক, টোয়েফল আইবিটি বা প্রতিষ্ঠানস্বীকৃত সমমানের কোনো পরীক্ষার ফলাফল জমা দিতে হয়। স্নাতক স্তরে সাধারণত সামগ্রিকভাবে নির্দিষ্ট একটি স্কোর চাওয়া হয়, তবে বিভাগভেদে এই চাহিদার তারতম্য ঘটে এবং প্রতিটি অংশে আলাদাভাবে ন্যূনতম নম্বর অর্জনের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। ফরাসিভাষী অঞ্চলে শিক্ষাগ্রহণ করতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ভাষার ওপরও যথেষ্ট দখল থাকার প্রয়োজন হতে পারে।
শুধু ভালো স্কোর অর্জনের পেছনে না ছুটে বাস্তবে ইংরেজিতে পড়াশোনা, লেখালেখি, ভাব বিনিময় ও আলোচনার দক্ষতা অর্জন করা অত্যন্ত জরুরি। সেখানকার ক্লাসরুমে অ্যাসাইনমেন্ট, দলভিত্তিক বিভিন্ন প্রকল্প, প্রেজেন্টেশন এবং সরাসরি ক্লাসে উপস্থিতির ওপর একটি বড় অংশের নম্বর নির্ভর করে থাকে। প্রথম সেমিস্টারে যাঁরা নানা জটিলতায় পড়েন, তাঁদের অনেকের ক্ষেত্রেই মূল সমস্যাটি মেধার নয় বরং ভাব বিনিময়ের দুর্বলতা।
প্রতিষ্ঠানগুলোর অফিশিয়াল ওয়েবসাইটের আন্ডারগ্র্যাজুয়েট অ্যাডমিশন অংশ থেকে ভিনদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত নির্দেশিকা সংগ্রহ করা সম্ভব। কোনো কোনো অঞ্চলে নির্দিষ্ট কেন্দ্রীয় ব্যবস্থার মাধ্যমে দরখাস্ত পাঠাতে হয়, আবার অন্য অঞ্চলে সরাসরি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানেই আবেদনপত্র জমা দিতে হয়। এসএসসির ও এইচএসসির সনদপত্র, নম্বরপত্র, পাসপোর্ট, ভাষা পরীক্ষার ফল এবং প্রয়োজন সাপেক্ষে ব্যক্তিগত বিবৃতি বা পোর্টফোলিও প্রস্তুত রাখতে হয়।
যোগ্য বিবেচিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে অফিশিয়াল ভর্তির চিঠি বা লেটার অব অ্যাকসেপ্ট্যান্স পাঠানো হয়। প্রশাসন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের স্টাডি পারমিটের সংখ্যার ওপর নির্দিষ্ট সীমা আরোপ করায় স্নাতক স্তরের অধিকাংশ আবেদনকারীকে প্রাদেশিক অনুমোদনপত্র বা পিএএল সংগ্রহ করতে হয়। এই বিশেষ ছাড়পত্র ছাড়া ভিসার আবেদন প্রক্রিয়া শুরু করা যায় না এবং নির্দিষ্ট কোনো অঞ্চলে পড়তে চাইলে সমমানের বিশেষ অনুমোদনেরও প্রয়োজন পড়ে।
সমস্ত কাগজপত্রের কাজ শেষ হলে অনলাইনে কানাডা সরকারের নির্দিষ্ট দপ্তরে স্টাডি পারমিটের জন্য আবেদন করতে হবে। সেখানে ভিনদেশি শিক্ষার্থীদের শিক্ষালাভের খরচ তুলনামূলকভাবে বেশি হওয়ায় পরিবারের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা অপরিহার্য। সংশ্লিষ্ট পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নির্ধারিত শিক্ষাবর্ষে আন্তর্জাতিক স্নাতক শিক্ষার্থীদের গড় বার্ষিক টিউশন ফি বেশ চশমাড় অঙ্কের হয়ে থাকে, যা অঞ্চল, প্রতিষ্ঠান ও বিষয়ভেদে কমবেশি হতে পারে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।