
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
আধুনিক যুগে এসে মাইক্রোস্কোপ ও আলট্রাসাউন্ড প্রযুক্তির সহায়তায় চিকিৎসাবিজ্ঞান মাতৃগর্ভে মানবভ্রূণের ধারাবাহিক বিকাশের স্তরগুলো সম্পর্কে জানতে পেরেছে। অথচ পবিত্র কোরআনের পাতায় সুদীর্ঘকাল আগেই মাতৃগর্ভে মানবশিশু সৃষ্টির প্রতিটি সূক্ষ্ম ধাপ অত্যন্ত নিখুঁত ও বৈজ্ঞানিক পরিভাষায় বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
মানব সৃষ্টির প্রাথমিক পর্যায় সম্পর্কে পবিত্র কোরআনে বলা হয়েছে যে, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে মিশ্রিত বীর্য বা 'নুতফাতুন আমশাজ' থেকে। আরবি 'আমশাজ' শব্দের অর্থ মিশ্রিত হওয়া, যা বর্তমান বিজ্ঞান দ্বারা প্রমাণিত যে কেবল পুরুষ শুক্রাণু কিংবা কেবল নারী ডিম্বাণু নয়, বরং এই উভয়ের সংমিশ্রণেই মূলত ভ্রূণের শুভসূচনা ঘটে।
গর্ভধারণের পরবর্তী সময়ে ভ্রূণটি জরায়ুর ভেতরের দেওয়ালে দৃঢ়ভাবে আটকে যায় এবং কোরআনের পরিভাষায় এই অবস্থাকে 'আলাকাহ' বলা হয়েছে। আরবি 'আলাকাহ' শব্দের তিনটি আলাদা তাৎপর্য রয়েছে, যার মধ্যে জোঁক, ঝুলন্ত বস্তু এবং জমাটবদ্ধ রক্তের কথা বলা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, গর্ভধারণের ১৫ থেকে ২৪ দিনের মাথায় মানবভ্রূণটির বাহ্যিক অবয়ব একটি জীবন্ত জোঁকের মতো দেখায়। শুধু আকৃতিই নয়, জোঁক যেমন অন্য দেহ থেকে রক্ত চুষে নেয়, তেমনি এই ভ্রূণও মায়ের জরায়ুর দেওয়ালে ঝুলে থেকে সরাসরি মায়ের রক্ত থেকেই নিজের পুষ্টির জোগান নিশ্চিত করে।
আলাকাহ পর্যায়ের পর ভ্রূণটি রূপ নেয় এমন এক আকৃতিতে, যাকে পবিত্র কোরআনে 'মুদগাহ' হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আরবি 'মুদগাহ' শব্দটির সরল অর্থ হলো দাঁতে চিবানো এক টুকরা গোশতপিণ্ড, যা ভ্রূণের পরবর্তী ধাপকে নির্দেশ করে।
পরীক্ষায় দেখা যায়, চার সপ্তাহের ভ্রূণের পিঠে যে সোমাইট বা হাড়ের প্রাথমিক খাঁজগুলো ফুটে ওঠে, তা দেখতে অবিকল দাঁতের কামড়ের দাগের সদৃশ। বিষয়টি এমন মনে হয় যেন কেউ এক টুকরা চুইংগাম কিংবা গোশত চিবিয়ে ফেলে রেখেছে।
চিবানো গোশতপিণ্ডের এই স্তর পার হওয়ার পর ভ্রূণের ভেতরে হাড় ও মাংসপেশি গঠিত হতে শুরু করে। এ বিষয়ে কোরআনে বর্ণিত হয়েছে যে মুদগাহকে প্রথমে হাড়ে বা ইজামে পরিণত করা হয় এবং পরবর্তীতে সেই হাড়গুলোকে মাংসপেশি দিয়ে সুন্দরভাবে আবৃত করা হয়।
বিখ্যাত মুফাসসির ইবনে কাসির তাঁর তাফসিরুল কুরআনিল আজিম গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এই বিশেষ স্তরে ভ্রূণের ভেতরে কংকাল ও হাড়ের শক্ত কাঠামো তৈরি হয় এবং এরপর রগ ও মাংসপেশির মাধ্যমে সেই কাঠামো ঢেকে ফেলা হয়। ভ্রূণতত্ত্ব অনুযায়ী প্রথমে কার্টিলেজ তথা হাড়ের কাঠামো গঠিত হয় এবং এর পরপরই পেশিকলা তৈরি হয়ে হাড়গুলোকে ঢেকে ফেলে।
ভ্রূণটি মায়ের গর্ভে অত্যন্ত সুরক্ষিত একটি প্রকোষ্ঠের ভেতরে ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে। পবিত্র কোরআনে একে মায়ের গর্ভের তিনটি অন্ধকার বা জুলুমাতিন সালাসের মধ্যে পর্যায়ক্রমে সৃষ্টি করার কথা বলা হয়েছে।
মাতৃগর্ভের এই সুরক্ষিত তিনটি অন্ধকার পর্দা বা আবরণের মধ্যে রয়েছে মায়ের পেটের বাইরের দেয়াল, জরায়ুর নিজস্ব দেয়াল এবং ভ্রূণকে ঘিরে থাকা নিজস্ব অ্যামনিওটিক থলি। ভ্রূণের সম্পূর্ণ শারীরিক কাঠামো নিখুঁতভাবে তৈরি হওয়ার পর তাতে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে আত্মা বা রুহ ফুঁকে দেওয়া হয়।
এর ফলে সেই ভ্রূণটি ক্রমান্বয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ ও জীবন্ত মানবশিশুতে রূপান্তরিত হয়, যাকে পবিত্র কোরআনে এক নতুন সৃষ্টিরূপে দাঁড় করানোর সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এই স্তরগুলোর নির্দিষ্ট সময়কাল সম্পর্কে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, সৃষ্টির উপাদান মায়ের গর্ভে প্রথম ৪০ দিন নুতফাহ বা বীর্যরূপে অবস্থান করে। পরবর্তী ৪০ দিন তা আলাকাহ বা জমাট রক্তপিণ্ড এবং তার পরের ৪০ দিন মুদগাহ বা গোশতপিণ্ড হিসেবে থাকে।
এই সুনির্দিষ্ট সময় পার হওয়ার পর সর্বশক্তিমান আল্লাহর পক্ষ থেকে একজন ফেরেশতা পাঠানো হয়, যিনি ওই বর্ধিত ভ্রূণের শরীরে রুহ বা আত্মা ফুঁকে দেন। এভাবে গর্ভধারণের মোট ১২০ দিন পূর্ণ হওয়ার পর ভ্রূণটি আধ্যাত্মিক ও শারীরিকভাবে একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনের মর্যাদা লাভ করে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।