
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
দেশের সার্বিক রূপান্তরটা কোথায় ঘটছে, একজন তরুণী হিসেবে সেই উত্তরটি নিজের আগামীর সঙ্গে মিলিয়ে মেলানোর চেষ্টা করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী প্রথমা সিংহ। তাঁর কাছে পরিবর্তনের মূল মাপকাঠি হলো—শিক্ষা সমাপ্তির পর নিজের যোগ্যতার ভিত্তিতে কাজের সন্ধান পাওয়া, কোনো রকম ভয় ছাড়াই স্বাধীনভাবে নিজের মতামত প্রকাশ করার সুযোগ থাকা এবং রাজপথ কিংবা জনপরিসরে সম্পূর্ণ নিরাপদে চলাচল করতে পারা। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা এই তরুণীর বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের পাট এখন শেষের পথে, আর ঠিক এই মুহূর্তে তাঁর ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনাগুলো আরও বেশি তীব্র আকার ধারণ করছে। নিজের পায়ে স্বাবলম্বী হয়ে দাঁড়িয়ে নিজের জীবনের প্রতিটি সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তাঁর রয়েছে, তবে সমসাময়িক বাস্তবতায় সেই কাঙ্ক্ষিত পথটি আদতে কতটা উন্মুক্ত, বিশেষ করে একজন নারীর জন্য তা কতটা অনুকূল, সেই প্রশ্নটি তাঁকে প্রতিনিয়ত ভাবিয়ে তোলে।
বর্তমান তরুণ প্রজন্মকে সচরাচর জেন-জি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যারা যেকোনো বিষয়ে প্রশ্ন করতে ভালোবাসে, নিজস্ব মতামত জানায় এবং কোনো ধরনের অন্যায় বা অবিচার দেখলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে চায়। সমাজ ব্যবস্থার সার্বিক কল্যাণের জন্যই এমন একটি প্রবনতা বা মানসিকতা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করেন প্রথমা। বয়োজ্যেষ্ঠদের কথা তারা মনোযোগ দিয়ে শুনবে এবং তাঁদের দীর্ঘদিনের জীবনঅভিজ্ঞতা থেকেও শিক্ষা গ্রহণ করবে, কিন্তু তার মানে এই নয় যে কোনো একটি রীতি বছরের পর বছর ধরে চলে আসছে বলেই তা কোনো রকম প্রশ্ন না করে অন্ধের মতো মেনে নিতে হবে। যে নির্দিষ্ট নিয়মগুলো মানুষের মৌলিক অধিকারকে খর্ব বা সংকুচিত করে কিংবা যে আচরণগুলো কোনো মানুষকে ছোট বা অবমূল্যায়ন করে, সেই বিষয়গুলো বদলানোর দাবি অত্যন্ত জোরালো ভাষায় উচ্চারণ করতেই হবে।
রাজনৈতিক ব্যবস্থার কাছেও এই তরুণ প্রজন্মের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রত্যাশা রয়েছে, যার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সাধারণ মানুষের কথা শোনার জন্য কতটুকু অবকাশ রাখা হচ্ছে তা দেখা। ভিন্ন কোনো মত প্রকাশ করা হলে সেই মতামতকে কর্তৃপক্ষ কীভাবে গ্রহণ করছে এবং কোনো অন্যায়ের শিকার হলে তার যথাযথ প্রতিকার মানুষ সময়মতো পাচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে লক্ষ্য করতে চান তাঁরা। প্রথমার মতে, যেকোনো রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রকৃত সুফল সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক ও দৈনন্দিন জীবনে পৌঁছে যাওয়াটা সর্বাগ্রে প্রয়োজন। ক্ষমতায় যেকোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিই থাকুন না কেন, তাঁদের গৃহীত নীতিগত সিদ্ধান্ত ও কার্যপদ্ধতি নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার অধিকার প্রতিটি সচেতন নাগরিকের অবধারিতভাবে থাকা উচিত।
একই সঙ্গে দেশের তরুণ প্রজন্মের কাঁধেও সুনির্দিষ্ট কিছু গুরুদায়িত্ব অর্পিত রয়েছে বলে মনে করেন তিনি, কারণ নিজের পক্ষ থেকে মত প্রকাশের অবাধ স্বাধীনতা যদি কেউ পেতে চান, তবে অন্য দশজনের ভিন্ন মতামত শোনার মতো মানসিক ধৈর্যও তাঁকে রাখতে হবে। বর্তমান যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের সুবাদে যেকোনো বিষয়ে অত্যন্ত দ্রুত গতিতে নিজস্ব প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করাটা ভীষণ সহজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু যে তথ্যটি ছড়ানো হচ্ছে তা আদৌ সত্য কি না, সেই তথ্য বা মন্তব্যের মাধ্যমে অন্য কাউকে কোনোভাবে আঘাত করা হচ্ছে কি না কিংবা ভিন্নমতের মানুষকে কোনো হীন প্রতিপন্ন করা হচ্ছে কি না, সেই বিষয়গুলোও গভীরভাবে বিবেচনা করা আবশ্যক। প্রতিবাদের জন্য যেমন বুকভরা সাহসের প্রয়োজন হয়, ঠিক তেমনি এর পাশাপাশি এই নানামুখী দায়িত্ববোধটুকুও সমানভাবে জরুরি।
সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করতে গেলে প্রথমার কাছে সবার আগে যে বিষয়টি সামনে চলে আসে তা হলো পড়াশোনার প্রাতিষ্ঠানিক খরচ এবং পরবর্তীতে সম্মানজনক কাজের সুযোগ। যাতায়াত বাবদ ব্যয়, প্রতিদিনের খাবারের খরচ, পড়াশোনার বই কেনা কিংবা আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজনীয় বিভিন্ন জিনিসের খরচ—এই সবকিছুই একজন শিক্ষার্থীর নিরবচ্ছিন্নভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গে ওতোপ্রতোভাবে জড়িত। সংশ্লিষ্ট পরিবারটির আর্থিক সচ্ছলতা যদি কম থাকে, তবে এই খরচের বহরই শিক্ষার পথে অন্যতম প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়াতে পারে। তাই উচ্চশিক্ষার সুযোগ বলতে কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তির সুযোগ পাওয়ার বিষয়টি বুঝলে চলবে না, বরং পুরো শিক্ষাজীবন সফলভাবে শেষ করার আর্থিক সামর্থ্য থাকাও নিশ্চিত করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাট চুকিয়ে বের হওয়ার পর সম্মানজনক পেশায় নিয়োগ পাওয়ার নিশ্চয়তা নিয়েও যথেষ্ট অনিশ্চয়তা কাজ করে তরুণদের মনে, যেখানে সনদের পাশাপাশি ব্যবহারিক কাজ শেখার সুযোগ অত্যন্ত জরুরি। চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কেবল যোগ্যতার সঠিক মূল্যায়ন করা হোক, এমনটাই প্রত্যাশা এই তরুণীর। বিশেষ করে বন্দরনগরী চট্টগ্রামেই যেন একজন তরুণ কিংবা তরুণী তাঁদের নিজেদের পেশাগত ভবিষ্যৎ সাফল্যের সঙ্গে গড়ে তুলতে পারেন, সেই উপযোগী সুযোগের পরিধি আরও বেশি মাত্রায় বৃদ্ধি করা প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
তবে নারীর ক্ষেত্রে পেশাগত বা ব্যক্তিগত অগ্রগতির এই দুর্গম পথের সঙ্গে আরও কিছু বাড়তি সামাজিক বাধা এসে যুক্ত হয়, যার ফলে কোনো ক্ষেত্রে সুযোগ পেলেও নারীরা তা সহজে গ্রহণ করতে পারেন না। কর্মক্ষেত্রে যাতায়াতের জন্য নিরাপদ কোনো যাতায়াত ব্যবস্থা প্রস্তুত আছে কি না, কর্মস্থলে কোনো ধরনের হয়রানির শিকার হলে তার উপযুক্ত অভিযোগ জানানোর পর তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না এবং কাজের সার্বিক পরিবেশ সম্মানজনক কি না, এই বিষয়গুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। অনেক সময় নিরাপত্তার তীব্র উদ্বেগজনিত কারণে নারীদের পড়াশোনা, চাকরি কিংবা বাইরে চলাচলের সিদ্ধান্তগুলো কঠোরভাবে সীমিত হয়ে যায়। কিন্তু নারীদের জন্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পরিবর্তে তাঁদের সুযোগের পরিধি কমিয়ে দেওয়াটা কোনোভাবেই সঠিক বা গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।
একজন নারী হিসেবে প্রথমা নিজে কখনোই নিজেকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে মনে করেন না, কারণ কেবল গভীর রাতে নয়, প্রকাশ্য দিনের আলোতেও ঘরের বাইরে চলাফেরা করা নিয়ে তাঁর মনে নানা দুশ্চিন্তা কাজ করে। অথচ স্বাধীনভাবে ও স্বাভাবিক নিয়মে বাইরে চলাফেরা করতে পারাটা প্রতিটি মানুষের জন্মগত ও মৌলিক অধিকারের অংশ। সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকার তাগিদে একজন নারীকে কেন বারবার নিজের পোশাকের ধরন, ঘরের বাইরে বের হওয়ার সময় কিংবা গন্তব্যস্থল নিয়ে অযাচিত জবাবদিহি করতে হবে, সেই প্রশ্নটি তাঁর মনে জাগে।
সমাজের যেকোনো পর্যায়ে নারীর নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে যখনই কোনো আলোচনা শুরু হয়, তখন তৎক্ষণাৎ সেই নারীর নিজস্ব আচরণ বা চলাফেরা নিয়ে চুলচেরা বিচারকার্য শুরু হয়ে যায়। এর ফলে মূল অপরাধী বা হয়রানিকারীর আসল দায় ও অপরাধ আড়ালে চলে যাওয়ার সুযোগ পায়। প্রথমা পরিষ্কার ভাষায় জানান যে, কোনো অপ্রীতিকর ঘটনার শিকার হয়ে প্রতিকার চাইতে গিয়ে কোনো নারীকে যেন উল্টো সামাজিক অপমান বা লাঞ্ছনার শিকার হতে না হয়। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র পর্যন্ত সর্বত্র অভিযোগ গ্রহণের উপযুক্ত প্রক্রিয়া এবং তার দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থাটি কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। পাশাপাশি গণপরিবহন এবং জনবহুল স্থানগুলোতেও নারীর নিরাপদ ও স্বাচ্ছন্দ্যময় উপস্থিতি নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
নারীর সার্বিক সুযোগের বিষয়টি কেবল বাইরের দুনিয়া নয়, বরং পরিবারের চার দেয়ালের ভেতর থেকেও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। পরিবারের দৈনন্দিন ঘরের কাজ এবং অন্যান্য স্বজনদের যত্ন নেওয়ার পূর্ণ দায়িত্বটি যদি কেবল একজন নারীর ওপরই এককভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে বাইরের পেশাগত কাজে সমান তালে এগিয়ে চলা তাঁর জন্য অত্যন্ত কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তাই পরিবারের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই দায়িত্বগুলো সঠিকভাবে ভাগ করে নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। কর্মক্ষেত্রে নারীদের জন্য বিশেষ মাতৃত্বকালীন সুযোগ-সুবিধা এবং শিশুদের যথাযথ দেখভালের জন্য ডে কেয়ার বা শিশুযত্নের সুব্যবস্থা থাকাটাও জরুরি। নারীকে নামমাত্র কাজের সুযোগ দিয়ে সেই কাজ ধারাবাহিকভাবে চালিয়ে যাওয়ার উপযোগী কর্মপরিবেশ যদি তৈরি করা না হয়, তবে সমাজ বা রাষ্ট্রে প্রকৃত সমতা কীভাবে আসবে?
চট্টগ্রামের সামগ্রিক সাংস্কৃতিক জীবন ও চর্চা নিয়েও নিজের সুনির্দিষ্ট কিছু প্রত্যাশা ব্যক্ত করেছেন এই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। তরুণেরা নিয়মানুযায়ী বই পড়বেন, নাটক উপভোগ করবেন, গান গাইবেন এবং নিজেদের বহুমুখী ভাবনা নিয়ে বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা করবেন—এমন একটি সহজলভ্য ও উন্মুক্ত পরিসর আরও বেশি পরিমাণে বৃদ্ধি পাক। নারীরাও যেন এই ধরনের নানামুখী সাংস্কৃতিক আয়োজনে কোনো রকম সংকোচ ছাড়া স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নিতে পারেন, সেই পরিবেশ দরকার। সমৃদ্ধ সংস্কৃতিচর্চা মানুষের মনের পরিধি বাড়িয়ে ভিন্ন ভিন্ন অভিজ্ঞতা ও চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়, যা আমাদের আরও বেশি সহনশীল হতে শিক্ষা দেয়।
প্রথমা এমন একটি সাম্যবাদী সমাজ দেখতে চান, যেখানে নিজের ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে কোনো বড় সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রাক্কালে একজন তরুণীকে কোনো ধরনের ভয়ভীতি বা সামাজিক বাধার হিসাব আগেভাগে কষতে হবে না। এমন একটি সমাজ যেখানে নারীর মেধা, পরিশ্রম এবং সুচিন্তিত মতামতের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে। পড়াশোনা শেষ করে নিজের পায়ে শক্তভাবে দাঁড়িয়ে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্নটার কথা যখন তিনি ভাবেন, তখন দেশের সার্বিক পরিবর্তনকে তিনি ঠিক এই দৃষ্টিকোণ থেকেই বিচার করেন যে তাঁর সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথটা ঠিক কতখানি প্রশস্ত হচ্ছে।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।