
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
তরুণ প্রজন্মের যোগাযোগের মাধ্যম ও শব্দভান্ডারে এক অদ্ভুত রূপান্তর দেখা যাচ্ছে। বর্তমানের কিশোর ও শিক্ষার্থীদের লক্ষ্য করলে তাদের আলাদা পরিভাষা স্পষ্ট হয়। কিছুদিন আগে এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান যে দেড় পৃষ্ঠার রচনায় কেবল একটি বাক্য শুদ্ধ ছিল, যেখানে লেখা হয়েছিল 'Shakespeare is the GOAT of English literature'। জেন-জি পরিভাষায় জিওটি অর্থ সর্বকালের সেরা। ব্যাকরণে ভুল থাকলেও নিজেদের শব্দভান্ডার নিয়ে তারা দারুণ গর্ববোধ করে থাকে। মজার বিষয় হলো, সম্পর্কের সমীকরণে তারা যেসব নতুন নামকরণ করেছে, সেগুলোর মূল ধারণাগুলো মোটেও নতুন নয়।
এই বয়স্করা যেসব পরিভাষা ব্যবহার করে তার মধ্যে সিচুয়েশনশিপ, ব্রেডক্রাম্বিং, সাইডচিক, ন্যানোশিপ, বেঞ্চিং, লাভ বম্বিং, ডিলিউশনশিপ ও পকেটিং উল্লেখযোগ্য। একটু গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে বোঝা যায়, ডিজিটাল দুনিয়া বা অন্তর্জালের কারণে তৈরি হওয়া কিছু পরিভাষা ছাড়া বাকি সবই আগে থেকে সমাজে বিদ্যমান ছিল। উদাহরণস্বরূপ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিখ্যাত উপন্যাস শেষের কবিতার অমিত যখন কেতকীকে ঘড়ায় তোলা জল আর লাবণ্যকে জলাশয়ের সঙ্গে তুলনা করেছিল, তখন সে কি মূলত সাইডচিক হিসেবেই লাবণ্যর সান্নিধ্য চাচ্ছিল না? এছাড়া লাবণ্যও তো শোভনলালকে বেঞ্চিং করে ঝুলিয়ে রেখেছিল। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের অমর চরিত্র দেবদাস বিয়ের পর পার্বতীকে লাভ বম্বিংয়ের ব্যর্থ চেষ্টা চালিয়েছিলেন, আর চন্দ্রমুখীকে আজীবন ব্রেডক্রাম্বিংয়ের শিকার বানিয়ে রেখেছিলেন।
পূর্বের প্রজন্মগুলোর সঙ্গে এই তরুণদের প্রেম, বিচ্ছেদ কিংবা বন্ধুত্বের মূল ব্যবধানটি তৈরি হয়েছে ইন্টারনেটের অতিমাত্রায় উপস্থিতির কারণে। আজকের যুগের কিশোর-কিশোরীরা স্টকিং বলতে অনলাইন প্রোফাইল নীরবে অনুসরণ করাকে বুঝে থাকে। অথচ আশির বা নব্বইয়ের দশকে এই অনুসরণ প্রক্রিয়াটি পুরোপুরি বাস্তব জীবনে ঘটত। নব্বইয়ের দশকের শেষভাগে যারা বিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছেন, তারা রিকশার পেছনে সাইকেল চালিয়ে বাড়ি পর্যন্ত অনুরাগীদের আসার দৃশ্য ঠিকই দেখেছেন। ল্যান্ডলাইন ফোনে সাহসী কেউ কেউ যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও অন্য কেউ রিসিভ করলে কথা বলা অসম্ভব হয়ে উঠত।
করোনা মহামারীর সময়কার অবরুদ্ধ দশার পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের খুদে শিক্ষার্থীদের হাতেও স্মার্টফোন পৌঁছে গেছে। ফলে বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের আগের মতো কাঠখড় পোড়াতে হয় না, যোগাযোগ এখন পুরোপুরি হাতের মুঠোয় বন্দী। এই বাধাহীন এবং নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ যেমন সম্পর্ক গড়ে তোলার পথ সুগম করেছে, তেমনি ব্যক্তিগত জীবনকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। তাদের সামনে বিকল্পের অভাব নেই। কাউকে ভুল মনে হলে তাকে দূরে ঠেলে দিয়ে অন্য কারও প্রোফাইল স্টকিং শুরু করে, চাইলে পরবর্তীতে আবার যোগাযোগ করতে পারে। একই সময়ে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কের প্রাথমিক পর্যায়ে থাকাটা খুবই সাধারণ বিষয়। অথচ পূর্বের দিনে একনিষ্ঠ প্রেমিক-প্রেমিকাদের সামান্য একটি কথা বলার জন্য চাতক পাখির মতো অপেক্ষা করতে হতো, এমনকি কারও কারও প্রতিবেশীর বাড়ির টেলিফোন ব্যবহার করার প্রয়োজন পড়ত।
সাম্প্রতিক সময়ে অনেকেই পর্যবেক্ষণ করছেন যে অল্প বয়সে বৈবাহিক বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিয়ের উপযুক্ত বয়স বিষয়টি আসলে পুরোপুরি আপেক্ষিক। মাত্র এক শতাব্দী আগেও এই উপমহাদেশে বাল্যবিবাহ ছিল অত্যন্ত স্বাভাবিক নিয়ম। রবীন্দ্রনাথের হৈমন্তীর বয়স ছিল মাত্র সতেরো বছর এবং তার স্বামীর বয়স ছিল উনিশ। একটু পেছনে তাকালে দেখা যায়, ইংল্যান্ডেও শারীরিক পূর্ণতা অর্জন করাই ছিল বিয়ের একমাত্র মাপকাঠি। শেক্সপিয়েরের বিখ্যাত চরিত্র জুলিয়েটের বয়স ছিল মাত্র ষোলো—আমাদের মাপকাঠিতে একটি শিশু—অথচ সে গির্জায় গিয়ে গোপনে বিবাহ সম্পন্ন করেছিল।
উনিশ বছর বয়স পর্যন্ত ছেলেমেয়েদের কিশোর হিসেবে গণ্য করার ধারণাটি তুলনামূলকভাবে আধুনিক। আঠারো বছর পূর্ণ হলে মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে কোনো আইনি বাধা থাকে না। তবে আমাদের দেশের শিক্ষাপদ্ধতির বাস্তবতায় উচ্চমাধ্যমিক পাস করে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশ করতে করতে কারও কারও বয়স কুড়ি বছর পেরিয়ে যায়। তাদের দেখতে শিশু মনে হলেও তারা আসলে প্রাপ্তবয়স্ক তরুণ-তরুণী। যেহেতু এই প্রজন্ম সমাজের পরোয়া করে না, তাই তারা ছাত্রাবস্থায় বিয়ে করলেও তা গোপন করতে চায় না। তারা লুকোছাপা করে না বলেই সবার সামনে চলে আসে যে আজকের তরুণেরা যথেষ্ট আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনার পাশাপাশি সংসার শুরু করছে।
পরিচিত এক ব্যক্তির বন্ধুযুগল একই ক্লাসে পড়ার সময় গোপনে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিলেন। পরবর্তীতে পড়াশোনা শেষ করার পর পরিবারের সবার উপস্থিতিতে তারা পুনরায় আনুষ্ঠানিক বিয়ে করেন। এর কিছুদিন পর জাকজমকপূর্ণভাবে তাদের বিবাহোত্তর সংবর্ধনা অনুষ্ঠিত হয়। সেই তৃতীয় আয়োজনে ওই তরুণীকে বলতে শোনা যায় যে একই মানুষকে বারবার বিয়ে করতে করতে তার চরম বিরক্তি ধরে গেছে। একটুও বাড়িয়ে বলা হচ্ছে না, পরিচিত এক ছাত্র পড়াশোনার প্রথম বা দ্বিতীয় বর্ষে থাকতেই বিয়ে করে সবাইকে জানিয়ে দম্পতির মতো ঘুরে বেড়াত। শিক্ষকেরা বিষয়টি জানলেও কোনো আপত্তি করতেন না।
কিশোর-তরুণদের এই দৃঢ় আত্মবিশ্বাস সত্যিই প্রশংসনীয়। ছোটবেলায় বড়রা যা বলতেন, আমরা তাই বিশ্বাস করে ঠকেছি। কিন্তু বর্তমানের বাচ্চাদের ক্ষেত্রে সেই কৌশল খাটানো কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তারা মুখের ওপর যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে দেয় কেন প্রাপ্ত তথ্য সঠিক নয়। এক প্রবীণ বড় বোনকে একবার বলেছিলাম যে নিজের মেয়েকে উপদেশ দেব জীবনে যেন ভুলেও বিবাহ না করে। তা শুনে সেই বোন পাল্টা প্রশ্ন করেন কেন এমন কথা বলতে হবে, কারণ নিজের অভিজ্ঞতা খারাপ হওয়ার অর্থ এই নয় যে অন্য কারও ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটবে।
বিভিন্ন পরিসংখ্যান বলছে যে গোটা বিশ্বজুড়েই বিয়ের হার উদ্বেগজনক হারে হ্রাস পাচ্ছে। বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই আজীবন অবিবাহিত থাকার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আমাদের সমসাময়িক মিলেনিয়ালদের মধ্যে সবাইকে খুশি করার এক ধরনের মানসিকতা কাজ করত। অনেকেই মনেপ্রাণে বিশ্বাস করতেন যে এই প্রথাটি তাদের জন্য নয়, তবুও পরিবারের চাপের মুখে বাধ্য হয়ে বৈবাহিক জীবন যাপন করেছেন। সংসারের নানা দায়িত্ব ও কর্তব্যের চাপে তারা ক্লান্ত ও বিরক্ত। এ ধরনের বোকামি আজকের তরুণদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না।
এই আলোচনা শুনে যথেষ্ট সতর্ক হয়ে গেলাম। আমার তরুণী কন্যা যদি একদিন এসে বলে বসে যে এই প্রতিষ্ঠানটি টিকিয়ে রাখতে হয় এবং আমরা উপযুক্ত না থাকায় ভুল মানুষকে বেছে নিয়েছিলাম, তবে তো সমাজে মানসম্মান আর অবশিষ্ট থাকবে না।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।