
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
প্রযুক্তি জায়ান্ট মেটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এবং জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের সহপ্রতিষ্ঠাতা মার্ক জাকারবার্গের মোট সম্পদের পরিমাণ বর্তমানে ২০০ বিলিয়ন বা ২০ হাজার কোটি ডলারের অঙ্ক অতিক্রম করেছে। অথচ তাঁর তিন কন্যা উত্তরাধিকার সূত্রে এই বিশাল সম্পত্তির অর্ধেকের বেশি তো দূরের কথা, সিংহভাগ অংশই নিজেদের অধিকারে পাবে না। নিজ জীবনের পুরো সময়টাতে ফেসবুকের ৯৯ শতাংশ শেয়ার মানবকল্যাণমূলক এবং জনহিতকর নানা কাজে ব্যয় করে দেওয়ার ব্যাপারে আগেই প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন মার্ক জাকারবার্গ।
আজ থেকে প্রায় এক দশক আগে ২০১৫ সালে এসে এই ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তটি গ্রহণ করেছিলেন মার্ক জাকারবার্গ। তাঁর ওই সুনির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত মোতাবেক, ব্যক্তিগত উত্তরাধিকার হিসেবে সন্তানদের হাতে বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি তুলে না দিয়ে সেই অর্থ সমাজের সাধারণ মানুষের কল্যাণের পেছনে খরচ করা হবে।
মার্ক জাকারবার্গ ও তাঁর সহধর্মিণী প্রিসিলা চ্যান দম্পতির ঘরে জন্ম নেওয়া তিন কন্যার নাম যথাক্রমে ম্যাক্সিমা, অগাস্ট এবং অরেলিয়া। তাঁদের প্রথম কন্যাসন্তানের পৃথিবীতে আসার ঠিক পরপরই নিজেদের সম্পত্তির বিশাল একটি অংশ জনহিতকর ও দাতব্য কাজে ব্যয় করার এই পরিকল্পনার কথা প্রকাশ্যে নিয়ে এসেছিলেন এই প্রভাবশালী দম্পতি। সে সময় মার্ক জাকারবার্গের ব্যক্তিগত সম্পদের পরিমাণ ছিল মোটামুটিভাবে প্রায় ৪৫ বিলিয়ন বা ৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার। প্রখ্যাত সংবাদমাধ্যম ফরচুন ম্যাগাজিনের বরাত দিয়ে সেলেব ডটকম এই চাঞ্চল্যকর ও কৌতূহলদ্দীপক তথ্যটি প্রকাশ করেছে।
২০১৫ সালের পহেলা ডিসেম্বর তারিখে জাকারবার্গের কোলজুড়ে যখন তাঁদের জ্যেষ্ঠ কন্যা ম্যাক্সিমার জন্ম হয়, তখন তাকে উদ্দেশ করে একটি সুদীর্ঘ খোলাচিঠি লিখেছিলেন মার্ক জাকারবার্গ এবং প্রিসিলা চ্যান। সে সময় ওই খোলাচিঠিতে এই দম্পতি লিখেছিলেন, পৃথিবীর অন্যান্য সব সাধারণ বাবা-মায়ের মতো তাঁরাও একান্তভাবেই কামনা করেন যেন তাঁদের সন্তান আজকের এই পৃথিবীটার তুলনায় আরও অনেক বেশি সুন্দর ও উন্নত একটি পৃথিবীতে বড় হয়ে উঠতে পারে।
ওই একই চিঠির বিভিন্ন অংশে তাঁরা আরও বিস্তারিতভাবে উল্লেখ করেছিলেন যে, সাধারণ মানুষের ভেতরের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার পরিপূর্ণ বিকাশ এবং সমাজে পুরোপুরি সমতা প্রতিষ্ঠার মহান লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তাঁরা তাঁদের নিজেদের সম্পত্তির বিরাট একটা অংশ বিভিন্ন খাতে বিনিয়োগ করতে চান। তাঁদের সুদৃঢ় বিশ্বাস রয়েছে যে, শিক্ষা খাত, চিকিৎসাব্যবস্থা, বিজ্ঞানভিত্তিক নানা গবেষণা এবং আধুনিক প্রযুক্তির সার্বিক উন্নয়নে যদি এই অর্থ বিনিয়োগ করা যায়, তবে তা আগামী প্রজন্মের জন্য তুলনামূলকভাবে আরও অনেক বেশি নতুন সুযোগের দুয়ার উন্মুক্ত করে দিতে পারবে।
নিজেদের সেই সুনির্দিষ্ট অঙ্গীকার ও প্রতিশ্রুতি সঠিকভাবে বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে এই দম্পতি পরবর্তীতে চ্যান জাকারবার্গ ইনিশিয়েটিভ বা সংক্ষেপে সিজেডআই নামক একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। এই বিশেষ সংস্থাটির মাধ্যমেই মূলত সমাজের বিভিন্ন স্তর থেকে উঠে আসা সামাজিক এবং বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনামূলক নানা উদ্যোগের পেছনে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের নিখুঁত পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলেন তাঁরা দুজনে।
মার্ক জাকারবার্গ এবং তাঁর সহধর্মিণী প্রিসিলা চ্যানের এই সাহসি ও ব্যতিক্রমী সিদ্ধান্তটি তাঁদের বিশ্বজুড়ে অবস্থান করা শীর্ষস্থানীয় দাতাদের অত্যন্ত সম্মানজনক কাতারে নিয়ে এসে দাঁড় করিয়েছে। ইতিপূর্বে বিশ্বের খ্যাতনামা ধনী ব্যক্তি যেমন বিল গেটস, ওয়ারেন বাফেট এবং মাইকেল ব্লুমবার্গের মতো ব্যক্তিত্বরাও তাঁদের নিজ নিজ অর্জিত সম্পত্তির বড় একটি অংশ মানবকল্যাণমূলক বিভিন্ন কাজে ব্যয় করার চমৎকার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন। তাঁদের মূল এবং অভিন্ন লক্ষ্য হলো, এই বিপুল পরিমাণ সম্পদ যেন কেবল ভবিষ্যতের একটি মাত্র প্রজন্মের হাতেই কেন্দ্রীভূত হয়ে আটকে না থাকে, বরং তা যেন বৃহত্তর সমাজের সার্বিক কল্যাণে ও উপকারে আসে।
এই বিশিষ্ট দম্পতির নিজস্ব চিন্তাভাবনা ও দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, সমাজের পেছনে করা যেকোনো ধরনের বিনিয়োগ কেবল বর্তমান প্রজন্মের দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর গণ্ডির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। বরং ভবিষ্যতে যারা এই পৃথিবীতে নতুন করে জন্ম নেবে, তাদের সামগ্রিক জীবনমানের উন্নয়ন ঘটাতে হলে ঠিক এখন থেকেই সুদূরপ্রসারী বিনিয়োগ শুরু করতে হবে।
সচরাচর প্রচলিত থাকা ব্যক্তিমালিকানাধীন প্রথাগত দাতব্য ফাউন্ডেশনগুলোর মতো না চালিয়ে, সিজেডআই প্রতিষ্ঠানটিকে তুলনামূলক সীমিত পরিসরে করপোরেট কোম্পানির আদলে অত্যন্ত সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। এর ফলে দাতব্য ও মানবকল্যাণমূলক কাজে বিভিন্ন ধরনের সহায়তার পাশাপাশি সরাসরি ব্যবসায় বিনিয়োগ করা এবং বিভিন্ন নীতিনির্ধারক উদ্যোগের ক্ষেত্রেও অর্থ জোগান দিতে পারছে এই প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠা লাভের একদম শুরুর দিনগুলোতে সিজেডআইয়ের বিভিন্ন কার্যক্রমের পরিধির মধ্যে সাধারণ মানুষের আবাসন খরচ উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে আনা, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কার সাধন এবং শিক্ষা ও চিকিৎসার মতো মৌলিক বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল। তবে সময়ের গড়ায় এই সংস্থার প্রধান অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রগুলোও পরিবর্তিত হয়েছে। বর্তমানে তারা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি সফলভাবে ব্যবহার করে চিকিৎসাবিজ্ঞানের জটিল গবেষণা এবং বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগ নিরাময়ের নানা উদ্যোগের ওপর সবথেকে বেশি গুরুত্ব আরোপ করছে।
অবশ্য নিজেদের অর্জিত সম্পদের প্রায় ৯৯ শতাংশই দাতব্য খাতে খরচ করে ফেলার এই সুদৃঢ় অঙ্গীকারের মানে এই নয় যে মার্ক জাকারবার্গ নিজের কোম্পানির সম্পত্তির ওপর থেকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ গুটিয়ে নিচ্ছেন। বর্তমান মেটা প্ল্যাটফর্মেও তাঁর নিজের প্রায় ১৩ শতাংশ শেয়ার অক্ষুণ্ণ রয়েছে। এই পরিমাণ শেয়ার নিজ অধিকারে থাকার কারণে ওই প্রযুক্তি জায়ান্টের ওপর তাঁর নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটাধিকার এখনও বজায় রয়েছে। সেই সঙ্গে তাঁর মালিকানায় রয়েছে বিশাল পরিমাণ ব্যক্তিগত আবাসন সম্পদও।
সব মিলিয়ে মার্ক জাকারবার্গ এবং প্রিসিলা চ্যানের চূড়ান্ত পরিকল্পনাটি হলো, তাঁদের দীর্ঘ পরিশ্রমে অর্জিত বিপুল পরিমাণের সম্পত্তির অধিকাংশ অংশই কন্যাসন্তানদের উত্তরাধিকার হিসেবে না দিয়ে বরং সার্বিক জনকল্যাণমূলক খাতের পেছনে ব্যয় করা।
বিশ্বখ্যাত ফোর্বস ম্যাগাজিনের নির্ভরযোগ্য তথ্যানুসারে জানা যায় যে, ২০০৪ সালের দিকে মাত্র ১৯ বছর বয়সের এক তরুণ হিসেবে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের ব্যবহারের জন্য ফেসবুক প্ল্যাটফর্মটি চালু করেছিলেন মার্ক জাকারবার্গ। মূলত বিশ্ববিদ্যালয়ের সহপাঠীদের নাম এবং তাদের ছবি দেখে খুব সহজে চিনে ফেলার একটি অনলাইন মাধ্যম হিসেবেই এই ওয়েবসাইটটির দীর্ঘ যাত্রা শুরু হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০১২ সালের দিকে এসে ফেসবুক আনুষ্ঠানিকভাবে শেয়ারবাজারে নিজেদের নাম তালিকাভুক্ত করে। এরও বহু পরে ২০২১ সালের দিকে সামাজিক যোগাযোগের এই মাধ্যমটিকে ছাপিয়ে ভার্চুয়াল জগত বা মেটাভার্সে ব্যবসার পরিধি আরও বহুগুণ বাড়িয়ে তোলার সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে ফেসবুকের নাম বদলে নতুন নামকরণ করা হয় মেটা। যদিও পরবর্তী সময়ে সেই প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানটির কৌশলগত অগ্রাধিকারের ক্ষেত্রে আবারও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা সংক্ষেপে এআই প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নয়ন ঘটানোর ওপরই সবচেয়ে বেশি জোর দিচ্ছে মেটা কর্তৃপক্ষ।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।