
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
রাতের শেষভাগের সময়টিতে ইবাদত করার অত্যন্ত বড় তাৎপর্য রয়েছে। মহান আল্লাহর অতি প্রিয় বান্দারা এই সময়টাতে বিছানা ছেড়ে উঠে বিভিন্ন ধরনের ইবাদত-বন্দেগীতে মশগুল হন। সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানব মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জীবনেও এই বিশেষ সময়টির অত্যন্ত গুরত্বপূর্ণ ও অনন্য ভূমিকা ছিল।
ইসলাম ধর্মের বিধান অনুযায়ী আল্লাহর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশের অন্যতম একটি চমৎকার মাধ্যম হলো ইবাদত। দিনের রাতের এই নিস্তব্ধ ও নির্জন সময়ে মাত্র দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করার মাধ্যমেও একজন সাধারণ মুমিন বান্দা এই মহান সুন্নাহর অনুশীলন খুব সহজেই শুরু করতে পারেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) যে সমস্ত ইবাদত নিয়মিত পালন করতেন, সেগুলোর মধ্যে অত্যন্ত উল্লেখযোগ্য ও প্রধান একটি আমল ছিল পবিত্র তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করা। মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে তাঁকে সরাসরি উদ্দেশ্য করে এরশাদ করেছেন যে, রাতের কিছু নির্দিষ্ট অংশে তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করুন। এটি আপনার জন্য একটি অতিরিক্ত ইবাদত হিসেবে গণ্য হবে এবং আশা করা যায় যে আপনার মহান প্রতিপালক আপনাকে এক মহামহিম প্রশংসিত স্থানে উন্নীত ও অধিষ্ঠিত করবেন। সুরা বনি ইসরাইল নামক পবিত্র আন্ডারের ৭৯ নম্বর আয়াতে এই চমৎকার নির্দেশনার কথা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মুমিনদের জননী উম্মুল মুমিনিন হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেছেন যে, মহান নবীজি রাতের বেলায় অত্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে নামাজ আদায় করতেন। তাঁর এই দীর্ঘ ইবাদতের ফলে তাঁর পবিত্র দুটি পা মোবারক ফুলে যেত। একবার তাঁকে বিনীতভাবে জিজ্ঞাসা করা হলো যে, আল্লাহ তাআলা তো আপনার জীবনের আগের এবং পেছনের সমস্ত ছোট-বড় ত্রুটি ও ভুলত্রুটি পূর্বেই ক্ষমা করে দিয়েছেন, তবুও আপনি কেন নিজের ওপর এত বেশি কষ্ট ও ক্লান্তি ডেকে আনেন? উত্তরে তিনি পরম বিনয়ের সঙ্গে বললেন, আমি কি আমার প্রতি আল্লাহর শুকরিয়া আদায়কারী একজন কৃতজ্ঞ বান্দা হব না? এই বিখ্যাত হাদিসটি সহিহ বুখারি শরিফের ৪৮৩৭ নম্বর হাদিস হিসেবে সংকলিত হয়েছে।
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর রাতের দীর্ঘ নামাজের পদ্ধতিটি ছিল নিখাদ ধীরস্থিরতার একটি অপূর্ব ও অনন্য দৃষ্টান্ত। বিশিষ্ট সাহাবি হজরত হুযাইফা (রা.) একবার রাতের বেলায় প্রিয়নবী (সা.)-এর পবিত্র ইক্তাদায় বা পেছনে দাঁড়িয়ে অত্যন্ত সৌভাগ্যবান হয়ে নামাজ আদায় করছিলেন। সেই সময় নবীজি নামাজে দাঁড়িয়ে পবিত্র কোরআনের দীর্ঘ সুরা বাকারা তিলাওয়াত করা শুরু করলেন। তখন সাহাবি হুযাইফা (রা.) মনে মনে ধারণা করেছিলেন যে, নবীজি সম্ভবত এই সুরার মাত্র এক শ আয়াত তেলাওয়াত করার পরেই রুকুতে চলে যাবেন। কিন্তু আশ্চর্যজনকভাবে নবীজি তেলাওয়াত থামালেন না বরং অত্যন্ত সুন্দরভাবে তিলাওয়াত চালিয়ে যেতে লাগলেন।
তিনি সুরা বাকারা শেষ করে ক্রমান্বয়ে পবিত্র সুরা নিসা এবং সুরা আলে ইমরান তেলাওয়াত সম্পন্ন করলেন। অত্যন্ত শান্ত ও ধীরস্থিরভাবে তিনি পবিত্র কোরআনের অমূল্য বাণীসমূহ পাঠ করছিলেন। যখনই কোনো তাসবিহের আয়াত তাঁর পবিত্র জবানে আসত, তিনি তখনই পবিত্র তাসবিহ পাঠ করতেন। যখন কোনো বিশেষ প্রার্থনার আয়াত আসত, তখন তিনি আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে প্রার্থনা করতেন। আবার যখনই কোনো আশ্রয় প্রার্থনার আয়াত আসত, তিনি আল্লাহর মহান দরবারে তা থেকে আশ্রয় কামনা করতেন। এই গুরুত্বপূর্ণ হাদিসটি সহিহ মুসলিম শরিফের ৭৭২ নম্বর হাদিস হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।
পবিত্র এই হাদিসটির সামগ্রিক বিশ্লেষণ থেকে খুব সহজেই বোঝা সম্ভব হয় যে, রাতের গভীর ইবাদতের মাধ্যমে পবিত্র কোরআনুল কারিমের মহাগ্রন্থের সঙ্গে মানবহৃদয়ের সুগভীর সম্পর্ক আরও অনেক বেশি নিবিড় করা যায়।
মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বলেছেন যে, রাতের ঠিক যখন শেষ তৃতীয়াংশ সময় অবশিষ্টাংশ হিসেবে বাকি থাকে, তখন আমাদের পরম করুণাময় প্রতিপালক সরাসরি দুনিয়ার আকাশে অবতরণ করেন। তিনি তখন ঘোষণা করতে থাকেন যে, কে এমন আছে যে আমাকে ডাকবে? আমি তার সেই পবিত্র ডাকে তৎক্ষণাৎ সাড়া দেব। কে এমন আছে যে আমার কাছে কিছু চাইবে? আমি তাকে তার কাঙ্ক্ষিত বস্তু দান করব। আর কে এমন আছে যে আমার দরবারে নিজের জীবনের সমস্ত গুনাহের ক্ষমা চাইবে? আমি তাকে পরম যত্নে ক্ষমা করে দেব। এই অমূল্য বাণীটি সহিহ বুখারি শরিফের ১১৪৫ নম্বর হাদিস থেকে নেওয়া হয়েছে।
উল্লিখিত এই হাদিসটি মূলত রাতের শেষভাগে আল্লাহর দরবারে কায়মনোবাক্যে দোয়ার বিশেষ গুরুত্ব ও ফজিলতকে অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছে। এই মোবারক সময়ে একজন প্রকৃত মুমিন বান্দা নিজের মনের ভেতর ইমানের মজবুত দৃঢ়তা অর্জন, অতীতে ঘটে যাওয়া সমস্ত পাপের মার্জনা, পবিত্র হালাল রিজিক প্রাপ্তি, নিজের পরিবার-পরিজনের সামগ্রিক কল্যাণ এবং দুনিয়া ও আখেরাতের চূড়ান্ত সফলতার জন্য আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ জানাতে পারেন।
তবে ধর্মের মূল বিধান অনুযায়ী আল্লাহর এই অবতরণের সুনির্দিষ্ট বিষয়টি তাঁর নিজস্ব মহান মহিমার সম্পূর্ণ উপযোগী। মানুষের সীমিত বোধগম্য বা সাধারণ অবতরণের মতো কোনো ভ্রান্ত উপায়ে এই বিষয়টি কল্পনা করা যাবে না।
রাতের ইবাদতের সামগ্রিক অংশের মধ্যে পবিত্র বিতর নামাজ একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অংশ। ইসলামিক শরিয়তের পরিভাষায় বিতর নামাজ আদায় করা ওয়াজিব বা অবধারিত। যে নির্দিষ্ট ব্যক্তি রাতের একেবারে শেষভাগে ঘুম থেকে ওঠার ব্যাপারে নিজের মনে শতভাগ নিশ্চিত থাকেন, তার জন্য রাতের শেষেই বিতর নামাজ আদায় করা অত্যন্ত ভালো ও উত্তম কাজ।
বিতর নামাজ রাতের ইবাদতের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ হিসেবে বিবেচিত। শরিয়তের দৃষ্টিতে বিতর নামাজ পড়া ওয়াজিব। যে ব্যক্তি রাতের শেষ ভাগে ওঠার ব্যাপারে পুরোপুরি নিশ্চিত, তার জন্য রাতের শেষভাগে বিতর নামাজ আদায় করা বেশি উত্তম।
মহানবী (সা.) অত্যন্ত স্পষ্টভাবে নির্দেশ দিয়ে বলেছেন যে, তোমরা তোমাদের রাতের সর্বশেষ নামাজ হিসেবে বিতর নামাজকে নির্ধারণ করো বা বানাও। এই অতি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশনামূলক হাদিসটি সহিহ বুখারি শরিফের ৯৯৮ নম্বর হাদিস হিসেবে বর্ণিত আছে।
আমাদের প্রিয় নবীজিও ঠিক এই বিতর নামাজ রাতের একদম শেষ ভাগে নিয়মিত আদায় করতেন। তবে যে ব্যক্তির রাতের শেষ মুহূর্তে ঘুম থেকে জাগতে না পারার প্রবল আশঙ্কা থাকে, সে যেন রাতের ঘুমাতে যাওয়ার আগেই নিজের বিতর নামাজ আদায় করে নেয়। বিশ্বখ্যাত সাহাবি হজরত আবু হোরাইরা (রা.)-কে খোদ নবীজি ঘুমানোর ঠিক আগ মুহূর্তে বিতর নামাজ আদায় করে নেওয়ার বিশেষ উপদেশ প্রদান করেছিলেন। এই সংক্রান্ত হাদিসটি সহিহ বুখারি শরিফের ১১৭৮ নম্বর হাদিস হিসেবে উল্লেখ রয়েছে।
পবিত্র ইসলাম ধর্মে ইস্তিগফার শব্দটির সঠিক অর্থ হলো আল্লাহর কাছে নিজের অপরাধের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা। ইস্তিগফার আদায় করার জন্য নির্দিষ্ট কিছু সুন্দর জিকিরও পবিত্র ধর্মে বাতলে দেওয়া হয়েছে, যার একটি চমৎকার উদাহরণ হলো ‘আস্তাগফিরুল্লাহ’ বলা। আল্লাহর দুনিয়ায় বসবাসকারী অত্যন্ত প্রিয় বান্দাদের একটি অনন্য প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো যে, তাঁরা রাতের শেষভাগে চোখের জলে আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করেন।
মহান আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে দুনিয়ার মুত্তাকি বান্দাদের সঠিক পরিচয় তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন যে, তারা রাতের খুব সামান্য অংশই গভীর ঘুমে কাটিয়ে দিত এবং রাতের একেবারে শেষভাগে নিয়মিত ক্ষমা প্রার্থনা করত। পবিত্র সুরা যারিয়াত নামক সূরার ১৭ থেকে ১৮ নম্বর আয়াতে অত্যন্ত সুন্দরভাবে এই কথাটি বলা হয়েছে।
পবিত্র কোরআনের অপর একটি বরকতময় আয়াতে আল্লাহ তাআলা মহাংশেই এরশাদ করেছেন যে, আর রাতের সর্বশেষ সাহ্রির বরকতময় সময়টিতে তারা আল্লাহর দরবারে অত্যন্ত বিনীতভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করত। সুরা আলে ইমরান নামক পবিত্র সুরার ১৭ নম্বর আয়াতে এই বর্ণনাটি পাওয়া যায়।
পবিত্র এই আয়াতগুলোতে মূলত রাতের একেবারে শেষ সময়ে নিয়মিত ইস্তিগফার বা ক্ষমা প্রার্থনা পাঠ করার অত্যন্ত বিশেষ মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্বকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরা হয়েছে।
মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) রাতের শেষভাগে পবিত্র ঘুম থেকে জেগে ওঠার পর সবার আগে মহান আল্লাহর পবিত্র স্মরণে পুরোপুরি মশগুল হয়ে যেতেন।
ইসলামের নির্ভরযোগ্য হাদিসে বর্ণিত আছে যে, রাতের বেলা ঘুম থেকে জেগে ওঠার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি প্রথমে গভীর রাতে আকাশের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকাতেন এবং পবিত্র সুরা আলে ইমরানের শেষ ১০টি বরকতময় আয়াত তেলাওয়াত করতেন। এরপর তিনি পবিত্র অজু সম্পন্ন করে অত্যন্ত মনোযোগের সঙ্গে নামাজ আদায় করতেন। এই তথ্যটি সহিহ বুখারি শরিফের ১৮৩ নম্বর হাদিস থেকে জানা যায়।
ঘুম থেকে জেগে ওঠার একেবারে পরপরই নিজের পুরো সত্তাকে আল্লাহর পবিত্র স্মরণে নিয়োজিত করা প্রিয়নবী (সা.)-এর একটি সুমহান সুন্নত। মানুষের জীবনের দিনের শুরুটা যেমন একমাত্র আল্লাহর নিখাদ আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে করা উচিত, ঠিক তেমনিভাবে রাতের বেলা ঘুম ভেঙে জেগে ওঠার এই পবিত্র মুহূর্তটিকেও জিকির ও ইবাদতের মাধ্যমে সুন্দর ও অর্থবহ করে তোলা সম্ভব।
মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) নিজে যেমন ব্যক্তিগতভাবে রাতের এই দীর্ঘ ইবাদতের প্রতি অত্যন্ত বেশি যত্নবান ছিলেন, ঠিক তেমনিভাবে তাঁর নিজ পরিবার-পরিজনদেরকেও এই মহান ইবাদতে অংশগ্রহণ করার জন্য বিশেষভাবে বলতেন। বিশেষ করে বরকতময় পবিত্র রমজান মাসের শেষ দশকের প্রতিটি রাতে তিনি নিজে জেগে ইবাদত করতেন এবং পরিবারের সকল সদস্যকে ঘুম থেকে জাগিয়ে তুলতেন ও ইবাদতের প্রতি বিশেষভাবে মনোযোগী করে তুলতেন। এই চমৎকার তথ্যটি সহিহ বুখারি শরিফের ২০২৪ নম্বর হাদিস থেকে সংগৃহীত হয়েছে।
পবিত্র হাদিসে মূলত রমজানের শেষ দশকের বিশেষ কিছু আমলের কথা বিশদভাবে আলোচনা করা হলেও, পরিশেষে পরিবার-পরিজনকে সব ধরনের ইবাদতে উৎসাহিত করার যে মহান শিক্ষার কথা বলা হয়েছে, তা মূলত অন্য যেকোনো সাধারণ সময়ের জন্যও অত্যন্ত বেশি প্রাসঙ্গিক ও তাৎপর্যপূর্ণ।
এই পুরো আলোচনার শেষাংশে এটি স্পষ্ট যে রাতের শেষভাগের আমল মুমিনের জীবনকে আলোকিত করে। এই সংকলনটির লেখক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন ফয়জুল্লাহ রিয়াদ, যিনি জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকার একজন সম্মানিত শিক্ষক।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।