
নিজস্ব প্রতিবেদক মুক্ত কণ্ঠস্বর
সাধারণ মানুষের মাঝে দীর্ঘদিনের একটি পরিচিত ধারণা প্রচলিত রয়েছে যে, কেবল বয়স্ক ব্যক্তিরাই সাধারণত টাইপ-২ ডায়াবেটিসের শিকার হয়ে থাকেন। অন্যদিকে, অপ্রাপ্তবয়স্ক শিশুরা সাধারণত টাইপ-১ ডায়াবেটিসে ভুগে থাকে এবং চিকিৎসাবিজ্ঞানের তথ্য অনুযায়ী এই হার বেশ কম। তবে বর্তমান সময়ে এসে বিশ্ববাসীর জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে যে, শিশু ও কিশোর-কিশোরী বয়সিদের মধ্যেও টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার প্রাদুর্ভাব ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। ঠিক কী কারণে কম বয়সিদের মধ্যে এই রোগটি বাড়ছে, তা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের দীর্ঘ পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ রয়েছে।
বর্তমান সময়ে সারাবিশ্বের শিশু এবং কিশোর-কিশোরীদের শারীরিক গঠন ও স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণে অতিরিক্ত ওজন বা স্থূলতা বৃদ্ধি পাওয়ার একটি স্পষ্ট প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মানবদেহের অতিরিক্ত এই ওজন, বিশেষ করে শরীরের ভেতরের অঙ্গে জমা হওয়া অতিরিক্ত চর্বি বা ভিসারাল ফ্যাট ইনসুলিনের স্বাভাবিক সংবেদনশীলতা প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে তোলে। চিকিৎসাবিজ্ঞান অনুযায়ী, এই ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স বা প্রতিরোধ ব্যবস্থার তৈরি হওয়াই হলো টাইপ-২ ডায়াবেটিস রোগটি হওয়ার অন্যতম প্রধান ও মূল কারণ হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
আধুনিক যুগে শিশু-কিশোরদের দৈনন্দিন জীবনে শারীরিক পরিশ্রম কিংবা মাঠে খেলাধুলা করার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যহারে হ্রাস পেয়েছে। তাদের অধিকাংশ সময় এখন মূলত মোবাইল ফোন, কম্পিউটার কিংবা টেলিভিশনের স্ক্রিনের সামনে বসে সময় কাটানোর মাঝেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে। এই ধরনের শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা মানবদেহের অভ্যন্তরে স্বাভাবিক মাত্রায় গ্লুকোজ ভেঙে শক্তি উৎপন্ন করার জৈবিক প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করে এবং এর ফলে ইনসুলিনের সংবেদনশীলতার মাত্রা আরও কমে যায়।
খাদ্যাভ্যাসের ক্ষেত্রে বর্তমান প্রজন্মের অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, বিভিন্ন ধরনের ফাস্ট ফুড, পরিশোধিত শর্করা এবং অতিরিক্ত চিনি কিংবা কর্ন-সিরাপযুক্ত মিষ্টি পানীয়র ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা তৈরি হয়েছে। এই ধরনের অস্বাস্থ্যকর খাবার গ্রহণের ফলে শরীরে অতিরিক্ত ওজন বৃদ্ধির পাশাপাশি অগ্ন্যাশয়ের ওপর তীব্র বিপাকীয় চাপ সৃষ্টি হওয়ার পেছনে এটি সরাসরি বড় ধরনের ভূমিকা পালন করে থাকে।
মানবদেহের বয়ঃসন্ধিকালের স্বাভাবিক ও প্রাকৃতিক শারীরিক পরিবর্তনের কারণে এ সময় ইনসুলিনের কার্যকারিতা সাময়িকভাবে কিছুটা হ্রাস পায়। যখন এই স্বাভাবিক হরমোনগত পরিবর্তনের সঙ্গে অতিরিক্ত শরীরের ওজন কিংবা অন্যান্য স্বাস্থ্যঝুঁকির বিষয়গুলো যুক্ত হয়, তখন শিশু-কিশোরদের শরীরে টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা বহুগুণে বৃদ্ধি পেয়ে যায়।
টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হওয়া শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের একটি বিশাল অংশের পরিবারের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, তাদের মা-বাবা কিংবা কোনো ঘনিষ্ঠ আত্মীয়ের এই রোগটি আগে থেকেই রয়েছে। এর পাশাপাশি, গর্ভকালীন সময়ে মায়ের শরীরে ডায়াবেটিস থাকার কোনো পূর্ব ইতিহাস থাকলে সন্তান জন্ম নেওয়ার পর তার এই মারাত্মক রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি আরও অনেক বেশি বেড়ে যায়।
সমাজের কিছু নির্দিষ্ট সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মানুষদের মধ্যে এই রোগটিতে আক্রান্ত হওয়ার অসম ও অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ হার দেখতে পাওয়া যায়। স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপন করার পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা ও সচেতনতার অভাব, খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা এবং নিরাপদ উপায়ে বিনোদনমূলক বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগের অভাবের সঙ্গে এই পরিস্থিতির সরাসরি গভীর সম্পর্ক রয়েছে।
তবে এই উদ্বেগের মাঝেও একটি বড় আশার কথা শুনিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা যে, শিশুদের টাইপ-১ ডায়াবেটিস রোগটি সাধারণত সেভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব না হলেও শিশু-কিশোরদের টাইপ-২ ডায়াবেটিস খুব সহজেই ঠেকানো সম্ভব। শিশু ও কিশোর-কিশোরীদের জন্য স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাত্রা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে সামগ্রিক সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা এবং সঠিক জ্ঞানচর্চা করার মাধ্যমে এই সমস্ত স্বাস্থ্যঝুঁকি অনেকাংশেই কমিয়ে আনা সম্ভবপর হতে পারে।
এই পুরো বিষয়টির বিশদ ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট, শেরেবাংলা নগর, ঢাকার শিশু হরমোন রোগবিশেষজ্ঞ, অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান।
সূত্র: জাতীয় দৈনিক আমার সকাল টিম।