
অবশেষে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে খুলেছে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার। দুই দেশের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সব খাতের শ্রমিকদের জন্য মালয়েশিয়ায় যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন।
বৃহস্পতিবার (স্থানীয় সময়) বেলা ৩টায় কুয়ালালামপুরে অবস্থিত বাংলাদেশ হাইকমিশনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা জানান। মাহদী আমিন আরও বলেন, আমরা বাস্তবসম্মত একটি লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি, আগামী মাসের (আগস্ট) শেষ সপ্তাহ থেকেই মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশি শ্রমিকদের যাওয়া শুরু হবে।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন, শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী।দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর মালয়েশিয়ায় ফের শ্রমবাজার খুললো। শ্রমবাজার দ্রুত উন্মুক্ত করার পদক্ষেপে মালয়েশিয়া সরকারের প্রতি আন্তরিক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম, মানবসম্পদ মন্ত্রী সেরি আর রামানান এবং সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত সকলের সহযোগিতায় এই অগ্রগতি সম্ভব হয়েছে।‘সবার আগে বাংলাদেশ’-এই নীতিকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে দেশের বিপুল জনগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষায় এই প্রচেষ্টা চালানো হয়েছে উল্লেখ করে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন, আগামী এক মাসের মধ্যে কর্মী যাওয়া শুরু হলে তা দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে বড় ভূমিকা রাখবে।
মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত প্রবাসী শ্রমিকদের জীবনমানের সার্বিক উন্নয়ন ও কাজের সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে বর্তমান নির্বাচিত ও গণতান্ত্রিক সরকার সর্বোচ্চ আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা। তিনি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, যেহেতু আমাদের শ্রমবাজার খুলে যাচ্ছে এবং আমরা আশা করছি আগামী এক মাসের মধ্যে বেশ কিছু শ্রমিক ভাই-বোন এখানে এসে কাজ শুরু করবেন, তাই আপনারা সকলে ধৈর্য ধারণ করবেন এবং সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন।
দালাল ও অসাধু চক্রের প্রতারণা থেকে সাধারণ মানুষকে রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, দেশে ফিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হবে, যেন কেউ কোনো ধরনের ভোগান্তির শিকার না হন। একইসঙ্গে এই প্রতারক চক্রের বিষয়ে সবাইকে বিশেষভাবে সচেতন থাকার আহ্বান জানান তিনি।
কারিগরি কার্যক্রম ও দুই দেশের যৌথ উদ্যোগের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা জানান, খুব শিগগিরই টেকনিক্যাল পর্যায়ে কাজ শুরু হতে যাচ্ছে। মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশ হাই কমিশন এবং ঢাকায় মালয়েশিয়ান হাই কমিশন যৌথভাবে এই কাজ এগিয়ে নেবে। এছাড়া মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের যৌথ সিদ্ধান্তে প্রক্রিয়াগুলোকে আরও গতিশীল ও স্বচ্ছ করা হচ্ছে।
প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র বলেন, মালয়েশিয়া সরকার খুব শিগগিরই তাদের কাজের পদ্ধতির বিষয়ে আপডেট জানাবে এবং আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগুলো জানানো হবে। মালয়েশিয়ার বাংলাদেশের হাইকমিশনকে আরও জনবান্ধব করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে জানিয়ে মাহদী আমিন বলেন, বাংলাদেশ হাইকমিশন যেন সাধারণ কর্মীদের আস্থার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়, সেই ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
প্রথম ধাপের কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা মালয়েশিয়া সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছি যেন প্রথম ধাপের নিয়োগ প্রক্রিয়াটি বোয়েসেলের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে আনা, দক্ষতা বৃদ্ধি এবং সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় দক্ষ জনশক্তিকে মালয়েশিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ করে দেওয়াই বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার বলে সংবাদ সম্মেলনে স্পষ্ট করেন প্রধানমন্ত্রীর এই উপদেষ্টা।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আমলে মালয়েশিয়া সরকারের কাছে পাঠানো ৪২৩টি রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকার প্রসঙ্গ টেনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত বহাল থাকা বর্তমান সমঝোতা স্মারকের ভিত্তিতে মালয়েশিয়া নিজস্ব যাচাই-বাছাই ও কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে এজেন্সির চূড়ান্ত সংখ্যা নির্ধারণ করবে। বাংলাদেশ থেকে সবচেয়ে বেশি কর্মী মালয়েশিয়ায় যান, এই বিষয়টি বিবেচনায় রেখে সর্বোচ্চসংখ্যক রিক্রুটিং এজেন্সিকে এর অন্তর্ভুক্ত করার জন্য তারা মালয়েশিয়া সরকারকে বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন বলে জানান তিনি।
‘ফ্যাসিবাদ’ ও দুর্নীতিতে জড়িতদের বাদ দেওয়ার বিষয়ে স্পষ্ট বার্তা দিয়ে মাহদী আমিন বলেন, ইতোমধ্যে বাংলাদেশের প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় থেকে বিগত ফ্যাসিবাদের সাথে জড়িত, বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতি এবং অনৈতিক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত ব্যক্তিবর্গের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। সুতরাং আমরা মালয়েশিয়া সরকারের কাছে আমাদের স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছি যে, যারা ফ্যাসিবাদী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে যুক্ত ছিল কিংবা সিন্ডিকেটের অংশ হিসেবে দুর্নীতি করেছে, তাদের কেউই নতুন তালিকায় স্থান পাবেন না। মালয়েশিয়ান কর্তৃপক্ষ অল্প কিছুদিনের মধ্যেই বিষয়টি নিশ্চিত করবে বলে জানান তিনি।
মাহদী আমিন বলেন, নিয়মতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে আনা, দক্ষতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং অভিবাসন ব্যয় কমিয়ে দ্রুততম সময়ের মধ্যে মালয়েশিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি পুনরায় শুরু করাই তাঁদের মূল লক্ষ্য।
শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে প্রবাসে কর্মসংস্থানের সূচনা এবং দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার হাত ধরে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানের যাত্রা শুরুর কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, প্রবাসীরা ভোটাধিকার প্রয়োগ করেছেন এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্বাচনী ইশতেহারেও তাদের কল্যাণের প্রতিশ্রুতি ছিল। বিএনপি সবসময় একটি প্রবাসীবান্ধব দল হিসেবে প্রবাসীদের স্বার্থ, আকাঙ্ক্ষা ও প্রত্যাশাকে সর্বোচ্চ মূল্যায়ন করবে।
মালয়েশিয়ার সাথে দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক সম্পর্কের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন বলেন, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের হাত ধরে এই সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল এবং পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার আমল তা এক ভিন্ন মাত্রায় উন্নীত হয়। সেই ধারাবাহিকতা রক্ষা করেই নির্বাচিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তার প্রথম বিদেশ সফর হিসেবে মালয়েশিয়াকে বেছে নিয়েছিলেন।
জ্বালানি খাতের সহযোগিতার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে যে গ্যাস সংকট রয়েছে, তা নিরসনে মালয়েশিয়ার সরকারি জ্বালানি জায়ান্ট পেট্রোনাস কীভাবে দ্রুততম সময়ে গ্যাস সরবরাহ করতে পারে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে। এছাড়া দক্ষ জনশক্তির বিশাল বাজার হিসেবে মালয়েশিয়ায় মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত ও ফলপ্রসূ আলোচনা হচ্ছে।
প্রবাসী শ্রমিকদের অবদান ও শ্রমবাজার বন্ধের পেছনের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়ার বহুমাত্রিক সম্পর্কের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হলো আমাদের প্রবাসী শ্রমিক ভাই-বোনেরা। তাদের শ্রম ও নিষ্ঠা যেমন মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে, তেমনি তাদের প্রেরিত রেমিট্যান্স বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকেও গতিশীল রেখেছে।
গত দুই দিনের বৈঠকের বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরে মাহদী আমিন জানান, মালয়েশিয়ার মানবসম্পদ মন্ত্রী, মন্ত্রণালয়ের সচিব, সহকারী সচিব এবং সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের সাথে অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার মূল নীতি ছিল দেশের স্বার্থ রক্ষা করা, এ কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমাদের এই আলোচনার মূল ভিত্তিই ছিল ‘সবার আগে বাংলাদেশ’, অর্থাৎ বাংলাদেশের সার্বিক স্বার্থ রক্ষা করা।
বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রার কথা উল্লেখ করে মাহদী আমিন বলেন, আমরা দ্বিপাক্ষিক ঐকমত্যের মাধ্যমে একটি বাস্তবসম্মত লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি, যেন আগামী আগস্ট মাসের শেষ সপ্তাহ নাগাদ বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো শুরু হতে পারে।
তিন দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মালয়েশিয়ায় অবস্থান করছেন বাংলাদেশের শ্রম ও কর্মসংস্থান এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন। আগামীকাল শুক্রবার ভোরে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে মন্ত্রী-উপদেষ্টার।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের হাইকমিশনার মঞ্জুরুল করিম খান চৌধুরীসহ হাইকমিশনের কর্মকর্তারা।